সংসারের চৌহদ্দিতে নারী ভুলে যায় নিজেকে

মেহেরুন্নেছা রোজী:

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নারীদের কথা আমি জানি না। আমি জানি বাংলার এক শ্রেণির নারীর কথা। জানি তাদের মর্মবেদনার কথা। জানি তাদের তিলে তিলে অস্তিত্বহীন হয়ে যাবার কথা। যুগল জীবনের শুরুতে মেধামননশীলতায় সমকক্ষ দুজন নারী পুরুষ ঘর বাঁধে। তখন নারীর প্রতি পুরুষের মুগ্ধতা থাকে আকাশসম বিশাল, পাহাড় সম অটল। তারপর ধীরে ধীরে সংসারের পরিধি বাড়ে। কিংবা অন্য অনুষঙ্গ। সকল অনুষঙ্গের কাছে নারীর চিন্তা, চেতনা, মেধা, মননশীলতা, জ্ঞান, দক্ষতা সবকিছু গৌণ হয়ে পড়ে।

সে সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে বাধ্য হয়ে সংসার নামক চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর তার সমকক্ষ স্বামী নামক বস্তুটি তরতর করে উঠে যায় সমাজের উঁচুতে, আরো উঁচুতে। সেখান থেকে স্ত্রী নামক বস্তুটির চেতনা, মেধা, মননশীলতা, জ্ঞান, দক্ষতা সবকিছু ভুলে যাওয়া কতটা সহজ ।

ভুলতে ভুলতে এমনই অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় যে সে তখন তার চোখে কেবলই আটপৌড়ে নারী। তার চোখে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হতে হতে এমন অবস্থা যেন Lewis Carrol এর Alice এর মত (Drink করে যে অতি ক্ষুদ্র হয়ে গিয়েছিল)। তখন সে যেন কখনো কখনো দায়িত্ব আর কর্তব্যের উপকরণ মাত্র। তার পরিচয় হয়ে ওঠে অলিখিত Midwive, কখনো housemaid, কখনো বা housekeeperএত কিছুর আড়ালে যদি কোন ভালোবাসা টিকে থাকে, তবে তা যেন Ibsen এর Doll’s House এর Nora এর মত পুতুল পুতুল ভালোবাসা।” এই পুতুল পুতুল ভালোবাসা নিয়ে বাংলার Nora রা সুখে শান্তিতে দিন গুজরান করতে হয়তো বা দ্বিধা করে না। কিন্তু এর মাঝেও কখনও কখনও লুকিয়ে থকে আরেক ট্রাজেডি।
জীবন সঙ্গীর কর্মস্থলে, সামাজিক পরিমন্ডলে ঘিরে থাকা অন্যান্য সফল নারীদের প্রতি স্বামীর মুগ্ধতা একসময় নারীটিকে আহত করে। কখনও কখনও তার বিলীন সত্ত্বার কাছে সে অপরাধী হয়ে পড়ে। অপরাধী হয় নিজের Ego এর কাছে, নিজের অহমের কাছে।”
সে ভুলতে বসে আর দশ জনের মত মেধা ও মননশীলতায় সে হতে পারতো একজন বৈশ্বিক নাগরিক। তার মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় ছাড়িয়ে যেতে পারত হাজারও নারী পুরুষকে। তার প্রতি মুগ্ধতা আর সমীহ তৈরি হতো হাজারও মানুষের।

কিন্তু যেদিন যায় সেদিন কি আর ফিরে আসে? আসে না। এভাবে বাংলার মেধাবী নারীরা সংসারের চৌহদ্দিতে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জীবনপাত করে। ভুলে যায় আপন সত্ত্বাকে। হত্যা করে আপন সত্ত্বাকে। কিন্তু এ সমাজে এমন পুরুষ কি খুব বেশি আছে একবার স্বীকৃতি দিবে তার স্ত্রীকে এই বলিদানটুকুর জন্য? কখনই নয়। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী হলো যৌনতা আধার, মানবী নয়; সন্তান জন্মদানের আধার, মানসী নয়; সংসার সামলানোর যন্ত্র,মানুষ নয়।

যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীকেই কেন এই বলিদান দিতে হবে? পুরুষ কেন এগিয়ে এসে নারীর হাত ধরতে পারবে না? সংসারের দায়ভার কেন পুরুষেরও সমান নয়?

শেয়ার করুন:
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.