মৌলবাদীদের কুকীর্তি

পাপ্পন দাস:

ভারত পাল্টাচ্ছে। সবদিকে শুধু গৈরিক পতাকা উড়তে দেখা যাচ্ছে। ভোটের রঙে রাঙানো মানচিত্র বলে দিচ্ছে যে ভারতে আজ নতুন স্রোত বইছে।
কিন্তু এর মধ্যেও যে উগ্র জাতীয়তাবাদ আর উগ্র মৌলবাদীদের বাড়বাড়ন্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে! কবি ও লেখক শ্রীজাতকে নিয়ে গরম এখন পশ্চিমবঙ্গ। তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। অভিযোগ কী? কারণ তিনি তাঁর কবিতার শেষ লাইনে লিখেছেন,
“আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে”!  আর তাতেই সবার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ। কুশ পুত্তলিকা দাহ হচ্ছে, প্রতিবাদ হচ্ছে। 
তবে শ্রীজাত কিন্তু অনড়। এই প্রসঙ্গে তিনি সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছেন, তিনি তাঁর নিজের বিশ্বাস ও প্রতিবাদের অবস্থান থেকেই এই পোস্টটি করেছিলেন। যা নিয়ে তাঁর কোনও রকম অনুশোচনাই নেই। তিনি বলেন, ‘‘ঘটনাটি দু্র্ভাগ্যজনক এবং হাস্যকর। ধর্ম কি এতটাই ঠুনকো বা সহজ, যে ধর্মকে এত সহজে আঘাত করা যায়?  মনে হয় না। আমার যদি মনে হয় কোনও ঘটনার বিরোধিতা করা জরুরি। তা হলে তা সপাটেই করি। আমার প্রতিবাদের ভাষা কবিতা। সেই কারণে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছি।’’ একই সঙ্গে কবি জানান, ভারতবর্ষের সার্বভৌমত্বের উপর তাঁর আস্থা রয়েছে। সকলেরই গণতান্ত্রিক ভাবে মত প্রকাশের অধিকার আছে বলেও তিনি মনে করেন।
কিছুদিন আগেই কন্নড় ভাষার লেখক যোগেশ মাস্টারের মুখে কালো তেল মাখিয়ে দেয় একদল কট্টর হিন্দু। অবশ্য ভারতে এটা নতুন কিছু নয়। মাঝে মাঝেই শোনা যায়, কারুর লেখা পছন্দ হচ্ছে না, কিংবা কেউ কারুর ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেছেন, তাই তারা তাঁর মুখে কালি মেখে দিচ্ছেন। আজকাল যেন এটা একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন সেদিন যোগেশ মাস্টারের মুখে কালো তেল মেখে দেওয়া হলো? তিনি নাকি তাঁর উপন্যাস ‘দুন্ধি’তে হিন্দু দেবতাকে নিয়ে কিছু একটা লিখেছেন। তাই এরকম একটা কাণ্ড তারা করে বসলো।
মনে পড়ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা। কয়েক বছর আগে একটি একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর খুব ইচ্ছে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবেন। সেই উপন্যাসে অবশ্যই ভগিনী নিবেদিতার প্রসঙ্গও উঠে আসবে। তিনি তাঁর উপন্যাসে স্বামী বিবেকানন্দকে মানুষ হিসেবে দেখাবেন। তাঁর ভুল-ত্রুটিগুলো তুলে ধরবেন। কিন্তু তিনি খুব চিন্তিত যে ভারতের বাঙালিরা কি সেটা নিতে পারবে? প্রকাশকেরা কি তাঁর লেখা ছাপাবে?…যদিও দুর্ভাগ্যবশত তিনি আর সেই উপন্যাসটি লিখে যেতে পারেননি। ছেলেদের রামায়ণ লিখতে লিখতে তিনি মারা যান। তাঁর ইচ্ছে ছিল মহাভারতও লিখবেন। সেটাও আর লিখতে পারেননি তিনি।
ভাগ্যিস তিনি বিবেকানন্দ নিয়ে কিছু বা মহাভারত লিখেননি। নাহলে বাঙালির গর্ব এই লেখকের মুখেও হয়তো কালি মেখে দেওয়া হতো।
এবার আমি মূল প্রসঙ্গে ফিরছি। নাহিদ আফ্রিন। ২০১৫ সালে ‘ইন্ডিয়ান আইডল জুনিয়র, সিজন টু’-তে তাঁর সুরের সুরের মূর্চ্ছনায় গোটা অসমের নাম উজ্জ্বল হয়। রাজ্যের উদালিতে তাঁর এক অনুষ্ঠান করার কথা। কিন্তু এবার তাঁর এই অনুষ্ঠান অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে। কারণ কিছু উগ্র ধার্মিকদের তরফ থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে উদালিতে নাহিদের প্রস্তাবিত অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে তাদের তরফ থেকে অঞ্চলের সাধারণ জনগণের উদ্দেশেও বলা হয়েছে যে, শরিয়ত-বিরোধী এই ধরনের নাচ-গানের অনুষ্ঠানে যাতে কেউ না যান। সেই নির্দেশে তারা লিফলেটও বিতরণ করছেন। আর তাইতো উদালিতে নাহিদের অনুষ্ঠানের ওপর নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। লিফলেটে বলা হয়েছে, ‘অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, আমাদের আপন জনেরা,আমাদের ভাই-বোনেরা এখন শরিয়ত-বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়েছেন। কারণ, জাদু, নাটক, নাচগান, থিয়েটার ইত্যাদি আসলে শরিয়ত-বিরোধী কাজ। তাই এসব দেখে আমরা নিরবে বসে থাকতে পারি না। আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও গতবার উদালি সোনাই বিবি কলেজের মাঠে জাদুর অনুষ্ঠান করা হয়।এ র ফলে শরিয়ত-বিরোধী প্রভাব পড়ে এই অঞ্চলে। আমরা ভেবেছিলাম,
আর ওই কাজ হবে না। কিন্তু তার চেয়েও এগিয়ে গিয়ে এবার একই স্থানে আয়োজন করা হচ্ছে মিউজিক্যাল নাইটের মতো শরিয়ত-বিরোধী অনুষ্ঠান। তাই আমরা–সমাজের আলিম, উলামা এবং সমাজের দায়িত্বশীল লোকরা বাধা না দিলে আগামী দিনে আল্লাহের গজব থেকে রেহাই পাবো না।….’মনে হচ্ছে ইসলামিক সংগঠনের ফতোয়া নাহিদের কণ্ঠরোধের একটা প্রয়াস।
এই ব্যাপারে নাহিদকে প্রশ্ন করা হলে কান্নাভেজা গলায় সে জানায়, ‘আমাকে কী গান ছেড়ে দিতে হবে? গান ছাড়লে আর আমার অস্তিত্ব থাকবে না।’
তাছাড়া বেশ কিছু ইসলামিক সংগঠন,মাদ্রাসা,মসজিদ, জমিয়েত উলেমার কর্মকর্তারা নাহিদের ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। খ্রিং খ্রিং জামে মসজিদ, লংকাজান হাফিজিয়া মাদ্রাসা, তিনআলি আঞ্চলিক জামে মসজিদ, লংকা বানাত মাদ্রাসা, দ্বিনী তামিল বোর্ড, নখুটি হুসেইনিয়া মাদ্রাসা, তিনআলি সিনিয়র মাদ্রাসা, উদালি হুসেনিয়া মাদ্রাসা, ফুলতলি হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উদালিগাঁও এম ই স্কুল, তামিলি তরক্কী বোর্ড এবং আরও কিছু সংগঠনের কর্মকর্তা এবং মওলানারা একজোট হয়ে তাঁর অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেন।
এদিকে, নাহিদের ঘটনা প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে আরও একটা প্রসঙ্গ আমার মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে। সুহানা সৈয়দ। সেও মুসলিম ঘরের সন্তান। সেও কিন্তু ইসলামিক মৌলবাদীদের আগ্রাসী ফতোয়ার শিকার। জিটিভি সারেগামাপা-র(কন্নড়) অনুষ্ঠানে গান গাইছে সে। সেদিন জিটিভি-র সেই মঞ্চে বছর বাইশের সুহানা গান গাইতে ওঠে। বোরখায় সারা শরীর ঢেকে সে হিন্দু ভজন পরিবেশন করে।
কিন্তু উগ্রবাদী চিন্তাধারা পোষণকারী কিছু লোক মনে করেন যে সে নাকি ইসলামের শরিয়তি বিধান লঙ্ঘন করেছে। ‘মেঙ্গালোর মুসলিম’ নামের একটি গ্রুপ থেকে সুহানার নামে একটি পোস্টও ফেসবুকে শেয়ার করা হয়। সেখানে লেখা হয়, ‘সুহানা তুমি মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করেছ। ভগবানের নামে অন্যান্য সম্প্রদায়ের পরপুরুষদের সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শনে গান গেয়ে এমন কিছু কৃতিত্বের কাজ করোনি। তোমার মা-বাবা তোমাকে পাঠিয়েছেন একটি পাপ কাজ করতে।তোমার মা-বাবার স্থান হবে নরকে। কারণ,তোমাকে পাপ করতে পাঠানোয় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না। তুমি বোরখা পরার যোগ্য নও, সেটা খুলে ফেল।’
ভাবতে অবাক লাগছে, আজ আমরা বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে দাঁড়িয়ে আছি। এই তো কিছুদিন আগে একসঙ্গে ১০৪ টি উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয় গোটা দেশ। আর এই দেশেই এখনও কিছু লোক আছেন যারা আজও ধর্মকে সিঁড়ি বানিয়ে সমাজের অগ্রগতির বুকে পেরেক বিঁধে দিচ্ছেন। আর এ জায়গায় যদি নারী জাতির কেউ তাদের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়, তাহলে একে তো আর এগিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। যেভাবেই হোক তার পথ আগলে দাঁড়াতে হবে। সে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, তারা এটা চায় না। তারা চায় না,ধর্মের বন্ধনের ঊর্ধ্বে উঠে কোন মেয়ে নিজের মতো করে হাঁটুক। ধর্মান্ধরাও থাকবে, আর স্বাধীনতাও থাকবে (বিশেষ করে নারী স্বাধীনতা) তা কখনও হতে পারে না। আসলে এরকম যারা ভাবে তার সম্পূর্ণ ভুল।
আচ্ছা,সবশেষে কিছু সত্যি কথা বলছি। মৌলবাদীরা কতটুকু শক্তিশালী হলে প্রকাশ্যে কারুর মুখে কালি মেখে দেওয়া যায়, মৌলবাদী ফতোয়াবাজরা কতটুকু শক্তিশালী হলে তারা এভাবে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান বন্ধের হুমকি দিতে পারেন—এই ব্যাপারটা কি কেউ ভেবে দেখেছেন? আজ যদি তাদের না থামানো যায়,তাহলে অদূর ভবিষ্যতে তারা কোথায় গিয়ে থামবে, তা কি কেউ ভেবে দেখেছেন? সত্যিকার অর্থে কিন্তু ভেবে দেখার সময় হয়েছে।
সরিষা,করিমগঞ্জ,অসম।
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.