নারী তুমি সাহসী হও, ঘুরে দাঁড়াও, আস্থা রাখো

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

সৃষ্টির আদি থেকেই সৃষ্টিকে পরিপূর্ণতা দিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শুধু তাই নয়, সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নারীরা মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন যুগে এই নারীরাই ছিল সমাজ ও সভ্যতার কর্ণধার। তাদের হাত ধরেই হয়েছিল কৃষিকর্মের উৎপত্তি। সমাজের পুরুষেরা যখন পশু শিকার করতে বনে জঙ্গলে যেত, তখন নারীরা তাদের সন্তান ধারণ ও পালনের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি কাজকর্ম করতো, যা ছিল সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান।

মানুষ যখন নিজ প্রয়োজনে ধর্ম ও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের প্রচলন শুরু করলো,  মূলত তখনই নারীদের পায়ে বেড়ি দেয়া শুরু হলো। সমাজপতিরা দেখলো সমাজ ও সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানব শিশুর। আর মানব সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা আছে একমাত্র নারীদের। তাই তারা নিজ স্বার্থে নারীদের উপর ধর্মের নামে বেড়ি পরিয়ে দিতে শুরু করলো। নারীরাও তাদের শারীরিক দুর্বলতা ও জ্ঞানের অভাবে ঐ বেড়ি তথা বাধা নিষেধ মেনে নিতে থাকে।

যে নারীদের সৃষ্টিকর্তা সর্বোচ্চ ক্ষমতা দান করেছিলেন, যে নারীরা ছিল মানব সভ্যতার কাণ্ডারী, যুগে যুগে সমাজ সেই জন্মদাত্রী নারীদের বানিয়েছে দাসী! সন্তান জন্মদান যেখানে নারীর জন্য গর্বের বিষয় ছিল, সমাজ সেই গর্ভধারণকেই নারীর দুর্বলতা বানিয়েছে।

নারীদের দাস বানাতে গিয়ে সমাজপতিরা চালু করেছে বিভিন্ন বিষ মন্ত্র। এই বিষ মন্ত্রে নারীদের জীবন শুধুই বিষময়। আত্মত্যাগের মন ভোলানো কথা বলে বলে নারীদের করেছে দুর্বল। নারীদের মহিমান্বিত করার জন্য তাদের বানিয়েছে মায়ের জাতি, বোনের জাতি। তাদের বাধ্য করছে আত্মত্যাগ করতে। ধর্মের দোহাই দিয়ে করেছে নির্যাতন। করেছে ধর্ষণ। কখনও আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। কখন জন্ম নেয়ার আগেই হত্যা করেছে।  

হাজার বছর ধরে সমাজ নারীদের শিখিয়েছে যে, নারী তুমি ছোটো, স্বামীর পায়ের নিচে তোমার স্থান। পরিবার তোমার জন্য স্বর্গ। স্বামীর সুখ তোমার সুখ। কিন্তু পুরুষ’কে কখনো কেউ বলেনি স্ত্রীর সুখ তোমার সুখ।

নারী যখন ঘরসংসার করে তখন সমাজ নারীদের বলে, স্বামীর অনুগত হও। মানিয়ে নাও। সবাইকে খুশি রাখো। কিন্তু সেই দেবতুল্য স্বামী’কে কখনও বলে না স্ত্রীকে খুশি রাখো। তোমার সকল কিছুতে স্ত্রীর পরিপূর্ণ অধিকার আছে।

নারী যদি স্বাবলম্বী হতে কাজ করতে বাইরে যায়, তখন বলবে, কী দরকার আছে কাজ করার? টাকার কি অভাব? কাজ করতে হলে ঘরসংসার সামলিয়ে কাজে যাও। একদল আছে যারা ঐ কর্মজীবী নারীর চরিত্র, পোশাক, চালচলন আরও কতকিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আবার বলবে, দুই পয়সা ইনকাম করে ঢং কতো?

নারী যা আয় করবে তাতেও তার অধিকার নেই। তার অর্জিত অর্থে থাকে স্বামীর অধিকার। অথচ সারা জীবন সংসার করেও স্বামীর টাকা কখনও স্ত্রীর হয় না।  

নারী যখন ঘরে থাকে, তখন তাকে বলবে সে তো কিছুই করে না! আর যখন সেই নারী কাজে যাবে তখন বলবে, ঘর সংসার দেখে না! ঘরের কাজে তার কোনো মূল্যায়ন নেই। বাইরের কাজে তার কোনো স্বীকৃতি নেই।

সমাজে অনেক নারী স্বামীর সেবা করতে করতে থামেন না। স্বামীও স্ত্রীর সেবা যত্ন পেয়ে অত্যন্ত খুশি হয়, বৌয়ের জন্য উপহার কিনে, বৌয়ের প্রশংসা করেন। বৌটিও তার প্রতিবেশীদের সামনে নিজ স্বামীকে নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন। একদিন ঐ স্ত্রীর বয়স হয়, শরীরে আর বল থাকে না। সন্তান জন্মদানে তার শরীরে ভাঁজ পড়ে। দেখতে খারাপ হয়। তখন যদি একদিন তরকারিতে লবন কম পড়ে বা  ডালে একদিন পানি বেশি হয়ে যায়, তখন আর স্ত্রীকে ভালো লাগে না।

স্ত্রী যদি অসুস্থ হয় তখন দেবতুল্য স্বামী ঠিকই বাইরে থেকে খেয়ে আসবেন, কখনও বলবে না তোমাকে রান্না করতে হবে না, আজ রান্না আমি করবো। প্রাণপ্রিয় দেবতুল্য স্বামীর আসল চেহারা দেখবেন বয়স হলে, অসুস্থ হলে। যতদিন যৌবন আছে, ততদিন স্বামী আপনার প্রিয়তমা বলেই ডাকবেন।

স্বামীর সংসারে নারীর অসুখ হতে মানা। অসুখ হলে সংসার দেখবে কে?  তাদের বাচ্চা দেখবে কে? নারীর শরীর বুড়া হতেও মানা, তাহলে স্বামীর সেবা করবে কে? তাই না?

যুগে যুগে ধর্ম নারীদের কিছু মনভোলানো কথা শুনিয়েছে। ইসলাম বলে পৃথিবীর বুকে একমাত্র বেহেস্ত বা স্বর্গের মালিক এই নারীরা। আরও বলা হয়েছে, বেহেস্তে সর্বপ্রথম প্রবেশ করবে একজন নারী। রোজ হাশরের ময়দানে মা ফাতেমার আঁচল হবে বেহেস্তি মানুষের আশ্রয় স্থল। হিন্দুধর্মে নারীকে শক্তিরুপ হিসাবে মা-কালী’কে ভাবা হয়। আবার মা দূর্গা হলেন দুষ্টুর দমনকারিনী। ‘মা-লক্ষী’ ঘরের সুখ শান্তির প্রতীক। বিদ্যার জন্য দেবী সরস্বতী। প্রাচীন গ্রিক মিথলজিতেও দেবি হিসেবে নারীর জয়-জয়কার।

একদিকে ধর্ম নারীকে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করেছে, অন্যদিকে সমাজ সেই ধর্ম জালে নারী’কেই বন্দী করেছে। শাসন করছে। শোষণ করছে। ধর্মের নামে যত নারী বন্দী মন্ত্র পাঠ করা হয়েছে, ততটা পুরুষ বন্দী মন্ত্র উচ্চারিত হয়নি। পুরুষের স্বাধীনতা খর্ব হয় ঐসব ধর্মীয় বাণী কেউ কখন প্রচার করেনি। সমাজে সর্বত্র নারীর বন্দীর সকল মন্ত্র গৃহীত এবং স্বীকৃত।

অথচ সৃষ্টিকর্তা আমাদের আলাদা শারীরিক গঠন দিলেও আলাদা করেননি মোটেও। আর তাই আত্মত্যাগ নারী-পুরুষ সকলের জন্যে সমান হওয়া উচিত। কারণ তাদের সামাজিক দায়িত্ব যে সমান।

কিন্তু সমাজ তার নিজ স্বার্থে নারীদের দাস বানিয়েছে। কারণ নারী ছাড়া সভ্যতা সংস্কৃতি অচল। নারীরা হল অর্থনীতির মূলে আর তাই নারীর উপর আধিপত্য মানে সভ্যতা সংস্কৃতি বাণিজ্য সবকিছুর উপর আধিপত্য।

যুগে যুগে সচেতন নারীরা সমাজের এই ধান্দা ঠিকই ধরতে পেরেছিল। আর তখন তারা অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করেছে। কিন্তু সমাজ তাদের এই আন্দোলন  থামিয়ে দিয়েছে,  কখনও তাদের আগুনে পুড়িয়ে চুপ করিয়েছে, কখন মাটিতে পুঁতে, পাথর ছুঁড়ে হত্যা করে বা দোররা মেরে। কখনও চোখ ফোটার আগেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এসবই নারীকে দমনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া মাত্র। নারীর মর্দিনী রূপে এতো ভয়!

এদিকে সংসারের প্রয়োজনে নারী যখন সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলো, তখনও তাদের বৈষম্যর শিকার হতে হয়েছে। এর প্রতিবাদেই এলো নারী দিবস।
অনেকেই ভাবেন নারী দিবসের কী প্রয়োজন? অনেকে আবার নারী অধিকার নিয়ে হাসি তামাশা করেন। অনেকে নারী দিবসে শুধুমাত্র কিছু বিখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত নারীদের স্মৃতিচারণ করে নারীদের প্রতি সম্মান দেখান।

আচ্ছা বিখ্যাত নারীদের জীবনই কী কেবলমাত্র সংগ্রামী জীবন? যে নারীটি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সন্তানকে পেটে বেঁধে নির্মাণ কাজে যুক্ত হয় দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার আশায়, যে নারীটি তার সমস্ত চাওয়া- পাওয়া ভুলে সন্তান লালনপালন  করে, যে নারীটি তার শরীরের সৌন্দর্য নষ্ট করে সন্তান পেটে ধরেছিল, যে দরিদ্র নারীরা বাসাবাড়িতে কাজ করে, গর্ভাবস্থায় মাটি কাটে, এইসব সাধারণ নারীদের জীবন কী সংগ্রামী জীবন না? তাদের আত্মত্যাগের কী কোনো মূল্য নেই? তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতি না দিয়ে নারী দিবসের তো অর্থই নেই।

এই সব সাধারণ নারীদের কথা কী কেউ কখনও বলেছে?
যেদিন সবাই সব শ্রেণীর নারীদের জীবন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করবে,  যেদিন নারীদের সমমর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত হবে, যেদিন নারীদের অধিকারের বিষয়ে সরকার-সমাজ সচেতন হবে, যেদিন সবাই নারীদের শুধুমাত্র একটি শরীর না ভেবে একজন মানুষ ভাবতে শিখবে, যেদিন নারী নিরাপদে চলাফেরার অধিকার পাবে, সেইদিন আর কোনো নারী দিবসের প্রয়োজন হবে না। তার আগ পর্যন্ত নারীদের সংগ্রাম চলবে।

নারী তুমি সাহসী হও , ঘুরে দাঁড়াও , আস্থা রাখো নিজের ওপর।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৭২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.