‘মেয়েদের দুর্বলভাবেই গড়ে তোলা হয়’

0
দিনা ফেরদৌস:
আমাদের প্রতিবেশি এক বাড়ির খুব বদনাম ছিল যে, কোনো কারণে তাদের বাড়ির ছেলেদের সাথে কারও মারামারি লাগলে বাড়ির মেয়েরাও হাতের কাছে যা পেত, তাই নিয়ে মারামারিতে যোগ দিত। মেয়েরা ভাইদের সব সময় বাঁচাতো মাইর খাওয়ার হাত থেকে। সবাই ছিল চাচাতো ভাইবোন। বাইরে থেকে দেখে বুঝার উপায় নেই কে কার আপন ভাই-বোন।
বাপ- চাচারা সব সময় তাদের বাড়ির মেয়েদের নিয়ে প্রাউড ফিল করতেন যে বাইরের ছেলেদের আচ্ছামতো ধোলাই দিতে পারে। যদিও এই বাড়ির ছেলেদের যন্ত্রণায় পাড়ার সবাই অস্থির থাকতো। রাতের অন্ধকারে পাড়ার লোকের বাড়ির গাছের আম,কাঁঠাল চুরি করাও বাড়ির ছেলেদের সহজ অভ্যাস ছিল। ওই বাড়ির কোনো মেয়েই স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। বাড়ির সব মেয়েই দেখতে বেশ সুন্দরী। পাড়ার কোনো ছেলে কোনোদিন ওই বাড়ির মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস করেনি। ওদের ভাইরা যে কী পরিমাণ বেজাত, তা সকলে জানতো।

দিনা ফেরদৌস

তাদের সবচেয়ে বড় গুণ ছিলো পরিবারের একতা। পাড়ার ছেলেরা ঠিক করলো মেয়েদের বিয়ের সময়ে খবর হবে। পাড়ায় বরপক্ষ মেয়েদের খোঁজ নিতে আসলে তাড়িয়ে দেবে। সময় গেল, একে একে সব বোনের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের এক সপ্তাহ আগে পাড়ার লোকজন বিয়ের দাওয়াত পেত। এমনকি বিয়ের পাঁচ/ছয় মাসের মধ্যে এক এক করে সব বিদেশে চলেও যেত।

ওই বাড়ির বোনদের প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম, মারামারি করতে ভয় করে না? তারা আমাকে নিয়ে হাসতো। বলতো, আগে একটা বসায়ে দিলেই হয়। ডরাইলে মারামারি হয় না। মনে শক্তি রাখতে হয়। এই রকম কথা বলার সাহস আমার ভিতরে কোন কালেই কাজ করেনি। সাহসী যেমন মানুষ একদিনে হয়ে উঠে না, তেমনি ভীতু হয়ে উঠাও সম্ভব না কোন কারণ ছাড়া।
তাদের মতো আমার কোন বাপ-ভাই ছিল না, যে ঘরের মেয়ে হয়ে বাইরের ছেলেদের সঙ্গে মারামারি করবো, আর আমাকে নিয়ে প্রাউড ফিল করবেন তারা। আমার অভিভাবকরা সম্পূর্ণ উল্টো। তাদের ইজ্জত হচ্ছে  লজ্জাবতী গাছের মতো। শব্দ করে কথা বললে, সিনা টান টান করে হাঁটলে, গা থেকে একটু ওড়না সরে গেলে, ডানে বামে তাকালে, কলেজে ছেলেবন্ধু আছে শুনলে, ইজ্জত নুয়ে পড়ে যেত সঙ্গে সঙ্গে।
বড়রা হাজার ভুল করলেও তাদের মুখের উপর কথা বলা যাবে না। ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে সেকেন্ড ইয়ারের একটি ছেলের সাথে প্রেম হয়। ক্লাসমেট এক ছেলে হুমকি দেয়, সেই ছেলেকে না ছাড়লে আমার যেকোনো একটি ক্ষতি করবে। একদিন সত্যিই আমাকে মারতে চলে আসে। টিনেজ প্রেমিক আর ওর মধ্যে তুমুল মারামারি হয়। এরপর শুনি কলেজে চাউর হয়ে গেছে যে, একটি মেয়েকে নিয়ে ছেলেদের মধ্যে মারামারি হয়েছে। কলেজে যাইনি বহুদিন। বাসায় কাউকে বলতে পারি নাই ঘটনা।
স্বপ্নের মধ্যে দেখতাম সেই ছেলে এসিড হাতে নিয়ে আমাকে দৌড়াচ্ছে। প্রায় মাঝরাতে ঘুম থেকে ভয়ে উঠতাম সেই ভয়ংকর ছেলেটিকে দেখে। শপিং এ যাওয়া, বেড়াতে যাওয়া ছেড়ে দিলাম, যদি রাস্তায় ওই ছেলের সাথে দেখা হয়ে যায় সেই ভয়ে। তার চেয়েও বড় ভয় ছিল আমার অভিভাবকদের নিয়ে। যদি জানতে পারেন, তো আস্ত গিলে খাবেন। কোথায় আমার দোষ ছিল খুঁজে বের করতে চাইবেন। ভয় পেতে পারি এই ভয়ে ভীত থাকতাম সব সময়। টিনেজ প্রেম টিনেজেই শেষ হয়ে গেল। পাড়ার অগা-মগার কাছ থেকেও প্রেমপত্র পেয়েছি। ভয়ে থাকতাম যদি জানাজানি হয়, তো রক্ষা নেই ঘরে। উল্টো মাথা নিচু করে না হাঁটার জন্য চৌদ্দ কথা শুনতে হতো।
অবশেষে নিজের বিয়ের সময় হঠাৎ করে সাহসী হয়ে উঠলাম। বড়দের মুখের উপর কথা বলতে না পারা মেয়ে বলে বসলাম, একজনকে কথা দিয়েছি। ছেলেটি একদিন আম্মার সাথে ফোনে কথা বললো। তার বাসায় একদিন নিয়ে গেল নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে আমায় পরিচয় করিয়ে দিতে। বুঝলাম ছেলেটি সত্যিই আমাকে ভালবাসে। আম্মার ছেলেটিকে পছন্দ হলেও আর কারও মনে ধরেনি। কথাটি ছেলেটিকে জানাতেই বললো, কিচ্ছু লাগবে না সোজা বাসা থেকে নিয়ে চলে আসবো তোমাকে। এই কথাটার মধ্যে এতো শক্তি ছিল যে মনে হয়েছিল আমি সব করতে পারি এই মানুষটার জন্য। সারাক্ষণ মনে হতো কেউ আমার পাশে আছে। অবশেষে মহা ধুমধামে বিয়ে হলো।
নিজের বিয়ের কাহিনী বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে,আমার মতো কথা বলতে না পারা মেয়ে, সেদিন বহু আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের কথা বলতে পেরেছিল। নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানাতে পেরেছিল। তার পিছনে কারো সাপোর্ট ছিল বলেই।
এরপর থেকে জেনে গেছি, সাহস অস্ত্র হাতে নিয়েও দেখানো সম্ভব না। যদি না তা অনুভূতিতে কাজ করে। সাহস মূলত একটা আত্মবিশ্বাসের নাম। সেই যে একবার কথা বলা শুরু করেছিলাম, এখনো বলি। সে নিজের স্বামী অন্যায় করলেও বলি। অনেকে বলেন, নিজের ব্যক্তিগত কথা প্রকাশ করতে নেই। কিন্তু আমি যা প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করি তাই করি। অবশ্যই এতে সাহস লাগে।
সমাজে বসবাস করে সমাজের কোন অনিয়ম চোখে পড়লে আমরা যেমন বলি, তেমনি সংসারও সমাজের একটা অংশ। যারা বলেন ঘরের কথা বলতে নেই, তারা আসলে চুপ থাকতেই বলেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, সংসার করে দুজন মানুষ। সংসার ভাঙ্গলেও ক্ষতি হয় সেই দু’জন মানুষেরই বেশি। আর তা নিয়ে মাথা ব্যাথা হয় জনগণের। তখন’তো কেউ বলে না ওদের সংসার ভাংলে আমাদের কী?
জীবনে বলার সাহস একবার করেছিলাম, আজও বলি। কিছু বলার না থাকলে নিজের কথা বলি। আমার আমিত্বকে প্রকাশ করি। কারো ঠিকা নেইনি যে, এর তার কথা বলতেই হবে আমাকে। যার কথা সেই বলবে। যারা বলেন, আমি নিজের কথা বলি না, তারাও নিজের কথা বলছেন। কী বিষয়ে  বলেন না, তাই বলেন। কৌশলে নিজেকে অন্যের থেকে আলাদাভাবে প্রকাশ করেন। সরাসরি কেউ নিজেকে প্রকাশ করতে দেখলে, তাদের গায়ে ফোসকা পড়ে। এজন্যই সব সময় মেয়েদেরকে নিজের কথা বলতে বলি।
সব ধরনের সাহসেরই যত্নের প্রয়োজন। যেই প্রতিবেশির কাহিনী দিয়ে শুরু করেছিলাম, তারাও একদিনে সাহসী হয়ে উঠেনি। সারা পরিবারের সমর্থন ছিল, উৎসাহ ছিল তাদের সাহসিকতায়। তাদের বাপ-চাচা, ভাইয়েরা কখনো বলেননি ছেলেদের সাথে মেয়েদের মারামারি করতে নেই, বিয়ে হবে না। তাই তারা যখন মারামারি করতো, তখন লজ্জা, দ্বিধা, ভয় কোনটাই তাদের মধ্যে কাজ করতো না। তারা নিজেদের সম্পর্কে জানতো। তারা কখনো হারেনি। মেয়ে বলে বিয়েও আটকায়নি। আমরা শুধু ভয়ের ভয়ে থাকি। কোন মেয়েই দুর্বল হয়ে জন্ম নেয় না। মেয়েদের দুর্বল করে গড়ে তোলা হয়। আর তার জন্য ব্যবহার করা হয় সমাজ, ধর্ম,পারিবারিক রীতিনীতিকে ।

লেখাটি ১,৫১৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.