নারীর পোশাক বনাম ব্যক্তি স্বাধীনতার মন ভোলানো গল্প

শাশ্বতী বিপ্লব:

আমার কয়েকজন পছন্দের মানুষ আছেন যারা হিজাব পরেন। তাতে তাদের সাথে মিশতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। আবার কয়েকজন আছেন বেশিরভাগ ওয়েস্টার্ন পোশাক পরেন, তাদেরও আমার খুব পছন্দ। এরা প্রত্যেকেই মানুষ হিসেবে চমৎকার।

শাশ্বতী বিপ্লব

আমি বিশ্বাস করি, কে কেমন পোশাক পরবেন, সেটা একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। তারপরও বাংলাদেশের মানচিত্র যখন অসংখ্য হিজাবী মস্তকে ছেয়ে যেতে দেখি, আমার মন খারাপ হয়। আমি প্রতিক্রিয়া না লিখে পারি না। আমার হিজাবী বন্ধুরা রাগ করে। বলে “আমি নিজের পছন্দে পরি, এটা আমার ব্যক্তি স্বাধীনতা। তোমার অসুবিধা কেন?”

অনেকে আবার এটাতে ধর্মীয় রং দেয়ার চেষ্টা করেন। কোনো পোশাক ধর্মীয় হতে পারে কিনা, বা সেই নির্দিষ্ট পোশাকটি না পরলেই ধর্ম পতিত হয় কিনা সেটা বিস্তারিত আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের দাবি রাখে। ধর্ম পালন যখন কেবলমাত্র পোশাক বা বাহ্যিক আভরণে এসে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন এর পেছনে শুধু আর ধর্ম থাকে না। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সর্বোপরি রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রপঞ্চ এর সাথে মিলেমিশে যায়। ধর্ম পালন হয়ে ওঠে লোক দেখানোর বিষয়। যেমন, জঙ্গিবাদের পিছনেও কেবল ধর্ম থাকে না। একজন পুরুষ যদি তার পোশাকে পরিবর্তন না এনে দিব্যি ধর্ম পালন করতে পারে, নারী কেন পারবে না?

কিন্তু এসব ছাপিয়েও আমার অসুবিধা হয় নারীর “ব্যক্তি স্বাধীনতার” দাবি নিয়ে। তর্কের খাতিরে “ব্যক্তি স্বাধীনতা” বা “আমার পছন্দ” টাইপের গালভরা শব্দগুলো যতোই ব্যবহার করি না কেন, একজন নারী হিসেবে আমি এবং আমরা কখনই সত্যিকার অর্থে ব্যক্তি স্বাধীনতা ভোগ করি না। আর করি না বলেই সুকৌশলে বাঙ্গালী মুসলমানের উপর চেপে বসা এই হিজাবী সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাকে ব্যথিত করে।

নারীর পোশাক নারী নিজে আবার কবে নির্বাচন করেছে? হোক সে আপাদমস্তক আবৃত পোশাক বা বিকিনির মতো স্বল্পবসন। কজন নারী সেটা নিজের ইচ্ছা বা পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিতে পেরেছে! বরং লিঙ্গীয় রাজনীতির ছায়াতলে বসে পরিবার, সমাজ, ধর্ম এবং রাষ্ট্র অত্যন্ত চতুরতার সাথে নারীর উপর তার পোশাক ভাবনা চাপিয়ে দিয়েছে। সে তার প্রয়োজন অনুযায়ী নারীকে একগাদা অপ্রয়োজনীয় কাপড়ে ঢেকে দিয়েছে  বা গা থেকে কাপড় খুলে নিয়েছে। নারীও সেটাকে নিজের পছন্দ মনে করে কখনও পর্দানসীন গৃহবাসী হয়েছে, তো কখনো স্বল্পবসনা বারবনিতা। সেখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, পোশাকের কর্ম উপযোগিতা বা স্বাচ্ছন্দ্য কোনটাই বিবেচনা করা হয়নি।

ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। যেমন ধরুন, পকেট ছেলেদের পোশাকের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। হোক সেটা শার্ট-প্যান্ট বা পাঞ্জাবী-কুর্তা। পকেট ছাড়া ছেলেদের পোশাক ভাবতে পারেন কি? আর মেয়েদের পোশাকে পকেট কোথায়?  যদিওবা থাকে, সেটাও অধিকাংশ ক্ষত্রেই মূলত ফ্যাশন হিসেবে। খুব একটা কাজে আসে না। তাই যেকোনো কাজে বাইরে যেতে হলে এমনকি নিছক কিছু টাকা এবং মোবাইলটা নিতে চাইলেও নারীকে একটা অতিরিক্ত ব্যাগ বহন করতেই হয়। এখন কেউ যদি দাবি করেন, সে নিজের ইচ্ছায় একটা অতিরিক্ত ব্যাগ বহন করেন, কেউ তাকে বাধ্য করেনি। সেক্ষেত্রে তাকে বলবো, আরেকবার ভেবে দেখবেন কি?

আপনারা যারা নিজেদের “ব্যক্তি স্বাধীনতার” কথা বলেন, তারা বুকে হাত রেখে বলুন তো, আপনি কি কখনো সত্যিই একজন পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন? আপনার ব্যক্তিগত জীবনে, আপনার পরিবারে, সমাজে বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে? আপনার শৈশবে আপনি কি আপনার ভাইটির সমান ব্যক্তি ছিলেন? কৈশোরে খেলাধুলায়, বন্ধুদের সাথে আড্ডায়, তারুণ্যে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানোয় বা বৈবাহিক জীবনে বা তারো পরে কর্ম জীবনে? সন্তানের অভিভাবকত্ব, তালাক দেয়ার অধিকার, সম্পত্তির মালিকানায় বা উত্তরাধিকারের প্রশ্নে, আপনার যৌন জীবনে, কোথায় আপনাকে ব্যক্তি হিসেবে দেখেছে এই সমাজ, সংসার, ধর্ম বা রাষ্ট্র?

আপনি চাইলেই কি রাতে একা কোন প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারেন আপনার পরিবারের পুরুষ সদস্যটির মতো? নিজের পছন্দমতো উচ্চতর শিক্ষা বা পেশা বেছে নিতে পারেন? আপনি চিকিৎসক হোন কী গবেষক, প্রকৌশলী কী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা – আপনি কি পুরুষ সহকর্মীর সমান স্বাধীনতা ভোগ করেন? আপনার সহপাঠী ছেলেটির মতো আপনিও কি সমান স্বাধীনতায় চলাফেরা বা মত প্রকাশ করতে পারেন? পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আপনার পূর্ণ স্বাধীনতা কি আছে? যদি না থাকে, তবে আপনি যে ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলেন, নিজের পছন্দের কথা বলেন, সেটার অস্তিত্ব কোথায়? শুধুমাত্র হিজাব পরার ক্ষেত্রে? আপনি ভেবে বলছেন তো?

একজন মানুষ কেমন পোশাক পরবেন সেটা নিঃসন্দেহে তার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হওয়া উচিত। যেমন তার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হওয়া উচিত সে কেবল ঘরকন্না করবে না চাকরি, কিংবা দুটোই। সে বিয়ে করবেন কিনা, সন্তান ধারণ করবেন কিনা, বিয়ের পরেও লেখাপড়া চালিয়ে যাবে কিনা, চরম অসম্মানের মুখেও সংসারটা আঁকড়ে ধরে থাকবে কিনা, নিজের উপার্জন নিজের প্রয়োজনে খরচ করতে পারবেন কিনা,  নাচ গান নাটকের মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন কিনা, এমনি আরো হাজারো সিদ্ধান্তের বা পছন্দের বেলায় নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা কতটুকু? যে সত্ত্বাটি ব্যক্তি হিসেবেই স্বীকৃতি পায়নি, তার আবার ব্যক্তি স্বাধীনতা কী?

তাই হঠাৎ শত শত নারীকে যখন নিজেকে আপাদমস্তক জুবুথুবু কাপড়ে পেঁচিয়ে রাখতে দেখি, আমার মন খারাপ হয়। তিন বছরের শিশুর শৈশবকে যখন এই কাপড়ের প্যাকেটে ঢুকে যেতে দেখি, তখন আমার মন খারাপ হয়। আপনার পছন্দকে আমি সম্মান করি, কিন্তু তারও আগে আমি দেখতে চাই, বুঝতে চাই আপনি ব্যক্তি হিসেবে সত্যিই স্বাধীন। এই সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র আপনাকে একজন ব্যক্তি হিসেবেই মেনে নিয়েছে। এবং আপনি আপনার জীবনে  গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীনভাবে নিতে পারেন। এবং আপনার পোশাক এই জীবনের রূপ রস গন্ধ আহরণে কোথাও আপনার স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে না।

নারীর “ব্যক্তি স্বাধীনতার” পিছনের ব্যক্তিটাকে আমি হন্যে হয়ে খুঁজি। কোথায় সেই ব্যক্তি সত্ত্বাটির বাস? আমি খুঁজে পাই না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.