‘সমকামিতা তো যৌন অভিমুখিতারই একটি দিক’

রোকসানা ইয়াসমিন:

Milk ।Harvey Bernard Milk কে নিয়ে বায়োগ্রাফিক্যাল একটি মুভি। সত্তর দশকে আমেরিকার সানফ্রানসিসকোতে গে, লেসবিয়ানদের মানবাধিকার আন্দোলনের উদ্যোক্তা এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো একজন গে প্রার্থী।গভর্নমেন্ট অফিসের সুপারভাইজার পদে অংশগ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে কতো সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে বেশ কিছু বছর, তারই কাহিনী।

রোকসানা ইয়াসমিন

পাবলিক স্কুল থেকে সমকামী শিক্ষক বহিষ্কারের নীতির বিরোধিতা করেছেন এবং আন্দোলনের মাধ্যমে মানবাধিকারের ভিত্তিতে তাঁদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছিলেন। তাঁর অনেক কাজের মধ্যে এটি একটি। হারভি ১৯৭৭ সালে সানফ্রানসিসকোয় ডিস্ট্রিক্ট-৫ এর একজন বোর্ড অফ সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত হন। Dan White নামে একজন রক্ষণশীল ক্যাথলিক পুলিশ অফিসার ১৯৭৮ সালে ২৭ নভেম্বর তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

কিছুদিন আগে ছবিটি দেখছিলাম। দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো, আমার এক বন্ধু আমাকে একদিন প্রশ্ন করেছিলেন,
-তুমি কি কৃষ্টিকে ভালোবাসতে?
বন্ধুটি বাঙালি। পুরুষ।
-হু, বাসতাম, এখনও বাসি।
-না, মানে একটু অন্যরকম ভাবে?
-মানে? অন্যরকম ভাবে মানে কী?
-মানে, সত্যিকার ভালোবাসা যাকে বলে।
– হুঁ, আমি তো কৃষ্টিকে সত্যি সত্যিই ভালোবাসি।
– না, তুমি বুঝতে পারছো না।
– কী বোঝাতে চাইছো, স্পষ্ট করে বলো, আমি আসলেই বুঝতে পারছি না।
-প্রেম ছিলো তোমাদের?
আমি ‘থ হয়ে থাকি। কী বলবো! হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠতে না পেরে খুব হেসেই জিজ্ঞেস করি,
-কেনো তোমার এমন মনে হলো?
-তোমাদের ছবিগুলো দেখে। তোমাদের চাউনি কেমন যেন একটু অন্যরকম। কেমন করে যেন জড়িয়ে ধরেছো! স্বাভাবিক বলে মনে হয় না।

দুজন মেয়ে অথবা তারও বেশি মেয়েদের একসংগে ছবি তোলার স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা কী?
কোনরকমভাবে দুজন মেয়ে ছবি তুললে, কোন ভঙ্গীতে তুললে, তা শরীরী ভাষায় একজন পুরুষের চোখে স্বাভাবিক বলে মনে হবে! কোন পুরুষের চোখে কতটুকুন “স্বাভাবিকতা” তার মাত্রা কে নিরূপণ করে!

একজন মেয়েবন্ধুর সাথে তোলা আমার একটি ছবি বড় করে বাঁধিয়ে এনেছিলাম দেশ থেকে। আমার এক বন্ধুর দাদার বিয়ের পর ওদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ ছিল। সেই বিয়ের আসরে যথারীতি হাসি ঠাট্টা হচ্ছে, আমরা তখন সবে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী। কিছু কথায় আমি লজ্জা পেয়ে আমার বন্ধুটির কাঁধে মুখ রেখেছিলাম, সেই মুহুর্তের ক্লিক। ছবি যারা বোঝেন, তারা বুঝবেন, কী অসাধারণ সেই মুহূর্ত, কী জীবন্ত স্মৃতি সেই ছবিতে ধরে রাখা! কী অসাধারণ সেই দুই কিশোরীর লাজুক হাসি!

কিন্তু কিছুতেই আমার ঘরের লোকটি সে ছবি দেয়ালে রাখতে দেবে না। কারণ, “লোকে কী বলবে!” আমি অনেক মাস এর কোনো কারণ খুঁজে পাইনি, উত্তর খুঁজে পাইনি ওই “লোকে কী বলবে?” র। ছবিটিকেও তাই দেয়াল থেকে সরাইনি। ভেবেছি, আমি যাদের ভালবাসি, আমার স্বামী সকলকেই অপছন্দ করবার জন্য কোনও না কোনও মনগড়া কারণ তো বের করেই নেয়। এই ব্যাপারটিও হয়তো তাই।

ছবিটা দেয়ালে যেমন ছিল তেমনি আছে দেখে খুব ক্ষেপে গিয়ে একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, “মানুষ কী ভাববে, আমার বন্ধুরা কী ভাববে! কতবার বলেছি ছবিটা নামাতে, এক্ষুণি নামাও। আমি যেন এটা আর কোনদিন দেয়ালে না দেখি।” সেদিনও আমি এরকম ‘থ হয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ।

সেদিনও হেসেই বলেছিলাম,
-কোনো নির্দিষ্ট কারণ তুমি কিন্তু আমাকে দিতে পারলে না। স্পষ্ট করে কিছু বলতেও পারছো না, নাকি তাতেও লজ্জা করছে? তোমারও তো অনেক ছবি দেখেছি তোমার বন্ধুদের সাথে, গলা জড়িয়ে, কাঁধে হাত রেখে। কই, আমি তো ভাবিনি তুমি গে। তুমি যদি গে বা উভকামী হও, তাতেও আমার কোনো কোনো সমস্যা নেই। তোমাকে তোমার পছন্দসই জীবন নিয়ে সুখী হতে বলবো।

আমি যে সমকামী বা উভকামী নই, আমার স্বামীকে তার প্রমাণ দিতে এবং ছবিটি দেয়াল থেকে নামিয়ে ফেলবার যে যুক্তিসংগত কোন কারণ নেই, সে বিষয়ে ওর সাথে তখন কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধছিল।

Homosexuality বা সমপ্রেমিতা বলতে, সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি রোমান্টিক আকর্ষণকে বোঝায়। বিপরীতকামিতা, উভকামিতা এবং সমকামিতা, যৌন অভিমুখিতার তিনটি প্রধান ভাগ। একজন মানুষ যে কোনো যৌন অভিমুখিতা নিয়ে জন্ম নিতে পারে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমপ্রেমিতা কোনো মানসিক রোগ নয়। এতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই।

আমরা মেয়েবন্ধুরা, ছোটবেলা থেকেই সবসময় হাত ধরাধরি করেই হেঁটেছি, জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছি। তখন মেয়ে মেয়েতে প্রেম, বিষয়টি সম্পর্কে আমার বিশদ কোনো ধারণাই ছিল না। এ নিয়ে বেশি কিছু জানবার সময় ও সুযোগ হয়নি সে বয়সে। এখন যখন জানি, ব্যাপারটিকে মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারার বাইরে অবাক করা কিছু বলেও কখনও মনে হয়নি। এ বিষয়ে জ্ঞান হবার পরও ওদের সাথে হাত ধরেই হাঁটি, জড়িয়ে ধরে ছবি তুলি, গালে চুমু খাই। ওদের প্রতি আমার বা আমার প্রতি ওদের কোনো যৌন আকর্ষণ নেই। আমরা ভালবাসি। প্রেম ছাড়াও মেয়েরা মেয়েবন্ধুকে শুধু ভালবাসতে পারে। যেমন ছেলেরা পারে গে না হয়েও ছেলেবন্ধুদের ভালোবাসতে।

আমার কিছু পরিচিত নারী আছেন দেশে, পরে জেনেছি ওরা লেসবিয়ান। কেউ পরিবারের চাপে পড়ে বিয়ে করেছেন, সন্তানের জন্য এখনও সংসার করছেন। কারও ডিভোর্স হয়ে গেছে, পুরুষ স্বামীর সাথে জীবন অসম্ভব তাই। একা খুব ভালো আছেন বলে জানান। কেউ কেউ একাই আছেন। বলেন, বিয়ে করার প্রশ্নই আসে না। সেরকমভাবে অনেক গে-ও আছেন, কেউ কেউ বিয়ে করেননি, অনেকেই করেছেন। সংসার করছেন, কিন্তু তারা খুঁজে নিয়েছেন তাদের গে সঙ্গী। অনলাইনের নিউজ থেকে জানি যে, বাংলাদেশে সমকামিদের কিছু ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ আছে, চ্যাটিং এর মাধ্যমে এখন সমকামিরা সহজেই একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারছেন।

আমাদের নিজেদের ঘরের ছেলেমেয়ে যদি সমকামী বা উভকামী হয়, আমরা যেন লজ্জিত না হয়ে, সামাজিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হবার ভয় কাটিয়ে, তাদের সহজভাবে মেনে নিই। সকল রকম সহযোগিতা দিয়ে সব রকম পরিবেশে চলবার মতোন মন ও মানসিকতা তৈরি করে দিতে সাহায্য করি। স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্যে সাহসী করে তুলতে পারি।

সমকামভীতি ও বিপরীতকামবাদের সমর্থন জনিত কারণে ওদের নিজস্বতা লুকিয়ে রাখতে গিয়ে ওরা যেন হীনমন্যতায় না ভোগে, আত্মবিশ্বাস না হারায়। সমকামিতা যৌন অভিমুখিতার একটি স্বাভাবিক দিক কেবল। এই দিকের পার্থক্য যেন মানুষ হিসেবে তাদের পরিচয়কে আলাদা করে না রাখে।

শেয়ার করুন:
  • 18
  •  
  •  
  •  
  •  
    18
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.