নো ওয়ান কিলড মল্লিকা

উৎপল চক্রবর্ত্তী:

আমার এই বান্ধবীটি, আমার খুব কাছের মানুষ -বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। সে মেসেঞ্জারে একটি ফেসবুক লেখা’র লিংক পাঠিয়েছে। আমি পড়তে শুরু করলাম –  

“আমি খুব একটা অর্ণামেন্টস পড়ি না। নাকফুল, কানেরদুল, গলার মালা হাবিজাবি কিছুই পড়িনা। তবে আমার দুইটা জিনিসে খুব দুর্বলতা……খুউব   এক আংটি আর দুই পায়েল। এই দুইটা অর্ণামেন্টস কেন জানিনা, খুব পছন্দ আমার। পায়েল সবসময় না পড়লেও, আংটি পড়ি……”

বই আমরা ‘পড়ি’ কিন্তু গায়ে যখন কোন কিছু ধারণ করি , বস্ত্র গয়না জুতো , অর্থাৎ তা আমরা পরিধান করি অর্থাৎ ‘পরি’। যাক পড়ি/পরি জনিত ভুলটি মাইনর ভুল হিসাবে ইগ্নোর করেই  আমি পড়তে পড়তে আমি চলে এসেছি লেখাটির শেষাংশে-

“আমাদের প্রেম হবার পরে ও আমাকে যা কিছু দিয়েছে, হোক সেটা গোলাপ অথবা সরিষা ফুল, আমি প্রত্যেকটা জিনিস খুব যত্ন করে রাখতাম, রাখি এখনো। এমনকি একটা গোলাপের পাঁপড়িও হারাতে দেইনি। গল্পটা অসম্পূর্ণ। শেষ করতে পারিনি। 
ডিলিট করতে ইচ্ছা করলো না। তাই এটুকুই পোস্ট করলাম”…

উৎপল চক্রবর্ত্তী

যতটুকু বোঝা গেল , অতি সাধারণ প্রেম বিষয়ক লেখা । দুজন প্রেমিক প্রেমিকার নানামুখী আলাপচারিতা, কিছু কল্পনা, ঘটনার বর্ণনা, রোমান্স কিংবা বিরহকথা। উল্লেখ করার মতো তেমন কোন ক্লাইম্যাক্স কিংবা নতুন কোনো গল্প, তেমন কিছুই পেলাম না আমি। যে মেয়েটি লিখেছে, তার ফেসবুক প্রোফাইল ছবি থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমার বড় মেয়েটির চেয়ে বয়সে বড় হবে সে। এলেবেলে টাইপ এই লেখাটিতে লাইক পড়েছে 1.2 K হতে পারে মেয়েটি সেলেব্রিটি কিংবা হতে পারে তার লেখার হাত ভালো, এটি তার একটি পচা লেখা; সে যাই হোক আমি আর জানতে চাইলাম না, মেয়েটি কি সেলিব্রেটি? কত ফলোয়ার? তার টাইম লাইন’টি ঘুরে দেখা হলো না আমার। ঢাকায় এখনও গরম পড়েনি তেমন, তবুও  নিজেই যেন  নিজেকে বললাম ‘যা দিনকাল পড়ছে ,আর বলবেন না –যার যা খুশি লিখছে, লাইক হাততালি পড়ছে, অসহ্য! দিনটি ছিল মার্চ মাসের ১৬ তারিখ।  

আমার বান্ধবীটি মেসেঞ্জারে সাধারণত ফালতু কিছু পাঠায় না , তাই এই  রকম একটি গুরুত্বহীন লেখা পাঠানোর কারণে আমি তার উপর বিরক্ত হলাম , এবং আমি সেদিন ইচ্ছে করেই –মেসেঞ্জারে প্রতি উত্তরে আর কিছু লিখলাম না । পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় , বিশ্বব্যাপী বলার মতো কী কী ঘটেছে, আর না বলার মতোই বা কী কী ঘটেছে এই মুহূর্তে আমার মনে নেই। মনে আছে ছোট মেয়েটি এসে বলেছিল,

–বাবা, কী হতে চাই বলতে পারবে?

-হ্যাঁ একদম ঠিক ঠিক বলতে পারবো।

-বলো তো কী হতে চাই?

-একদিন বলেছিলে তুমি, মনে আছে আমার।

-কোনটা বলো তো?

-তোমার ইচ্ছা পুতুলের ফ্যাশন ডিজাইনার হবে তুমি।

-না বাবা।

-ও স্যরি, মনে পড়েছে তুমি লাস্ট বলেছো , তুমি ট্রেনের পাইলট হতে চাও।   

-বাবা আমি এসব কিচ্ছু হবো না, আমি মোবাইল ফোন হতে চাই।

-হা হা , কিন্তু সেটা তো কোনো প্রফেশন হলো না, তুমি জীব থেকে কেন জড়পদার্থ হবে?

-তাহলে অন্তত তোমাকে তো পাবো, তুমি যে মোবাইল ভালবাসো বাবা!  বলেই দৌড়ে চলে গিয়েছিল মেয়েটি ।

পাখি হতে চায়নি সে, ঘুড়ি কিংবা প্রজাপতি। আপনারা জানেন বোধ করি …

“ইশকুলে আমরা একসাথে পড়তাম
রোজ দেরী করে ক্লাসে আসত, পড়া পারত না।
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে এমন অবাক হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত যে
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।

আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমল কান্তি সেসব কিছুই হতে চায়নি
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে, অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল উকিল হলেও তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
অথচ সকলের ইচ্ছে পূরণ হল, এক অমল কান্তি ছাড়া।”

আত্মহননকারী তাসমিয়া শান্তা

অধিক মোবাইল আসক্তিতে ভোগা বাবা’রা সাধারণত ছোট-খাটো সেন্টিম্যান্ট বোঝে না ঠিকঠাক, আমি জানি । তবুও মেয়ের কথাগুলো শুনে  খুব অসহায় লাগছিল আমার। তথাপি আমি কিঞ্চিৎ খুশি হলাম – যাক সেন্টিমেন্ট বেঁচে আছে আমার, সেটাই বা কম কী! কিন্তু এরই মধ্যে মেজাজ’টা আরও একটু গরম হয়ে গেল- যখন মোবাইলে বেজে উঠলো – মেসেঞ্জারে বিপ্‌ বিপ্‌ শব্দ! অনায়াসে অভ্যাস বশত মোবাইলটা খুলতে না চেয়েও খুলে দিলাম।

আমার সেই আমেরিকা প্রবাসী বান্ধবীটি প্রশ্ন করেছে – আজ দুই দিন মেয়েটি সুইসাইড করেছে, তুমি কিছু বললে না যে?সুইসাইড মানে আত্মহত্যা ! অর্থাৎ নিজে নিজে মরে যাওয়া , ইচ্ছামৃত্যু শব্দটিও কিন্তু ব্যবহার করা যেতে পারে। ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছিল এইরকম কোনো একটি ঘটনা, কোথায় যেন পড়েও ছিলাম ! এই খবরে বাজার কিন্তু গরম হচ্ছিল না , খবরটি তেমন আমলে নিচ্ছিল না কেউ! এই মেয়েটি’র কথাই কী চলছিল?  তাহলে বোধ করি  দেশ তখন অন্য হাওয়ায় দুলছিল!

ধরা যাক সেই মেয়েটির  ‘চন্দ্রমল্লিকা’ নাম ছিল। প্রতিউত্তরে কোন কিছুই না লিখে, দ্রুত ক্লিক করলাম –বান্ধবীর পাঠানো সেই লিংক’টিতে। ভেসে উঠলো মেয়েটি’র সেই লেখাটি , যা অনাদরে অবহেলায় আমি পড়েছিলাম। মেয়েটির প্রোফাইলে  চাপ দেয়া মাত্রই সেখানে লেখা নাম:  Remembering চন্দ্রমল্লিকা

দেখলাম  সবার উপরে ফেসবুকের একটি লেটেস্ট নোটিফিকেশন। সেখানে ফেসবুক দেখাচ্ছে -একটি ডাঁটিতে একটি ফুল একটি কলি এবং একটি পাতা । মহামান্য ফেসবুক সেখানে জানিয়ে দিচ্ছেঃ   

“Remembering‘চন্দ্রমল্লিকা’ We hope people who love ‘চন্দ্রমল্লিকা will find comfort in visiting her profile to remember and celebrate her life. Learn more about the legacy contact setting and memorialized accounts on Facebook.

আমরা আশা করছি আপনারা যারা চন্দ্রমল্লিকা’কে ভালবাসেন, এই প্রোফাইল আপনারা তাঁকে স্মরণ এবং তাঁর জীবন’কে উদযাপন করতে এসে  স্বস্তি লাভ করবেন। আরও অধিক জানতে ফেসবুকের ‘উত্তরাধিকার যোগাযোগ ব্যবস্থা’ এবং ‘স্মৃতি সংরক্ষণ’ সুবিধাটি দেখে আসুন।  

অর্থাৎ শুধু বেঁচে থাকলেই জীবনের উদযাপন হয়, ব্যাপার তা নয়। মৃত্যুর পরেও আপনি উদযাপিত হোন, কী সমস্যা ! মৃত্যু সংবাদ  জানার সাথে –আপনার দাফন-কাফন কিংবা দাহ কর্মের আগেই ফেসবুক আপনাকে মরণোত্তর সম্মানে ভূষিত করে দেবে। আপনার নামের আগে ব্রিগেডিয়ার, জেনারেল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অমুক তমুক, বসুক না বসুক বসে যাবে ‘রিমেম্বারিং’ উপাধি। তখন আপনার পাসওয়ার্ডটি অন্য কারো জানা থাকলেও, আপনার একাউন্ট’টি  আর চালাতে পারবে না কেউই!

তবে আপনার টাইম লাইনে বন্ধুরা আপনাকে নিয়ে শোক গাঁথা রচনা করতে পারবেন , দু একজন বন্ধু যদি প্রতিপক্ষ হয়ে থাকেন- তাহলে এই চান্সে তারা আপনার চৌদ্দ-গুষ্ঠি’কে সমূলে উদ্ধারও  করে দিতে পারবেন, অবশ্য আপনার তাতে কী টেনশন? আপনি তো তখন কেবল’ই ছবি ! তাই আপনি চাইলে জীবিতাবস্থায় কাউকে দিয়ে যেতে পারেন পাওয়ার অব এটর্নি , যিনি  স্বল্প সুবিধায় আপনি মৃত তথাপি আপনাকে সচল রাখবেন। আপনার মৃত্যুর পর ফেসবুক একাউন্ট’টি কীভাবে চলবে –সেই বিষয়ে জানান দিতেই ফেসবুকের এই নোটিফিকেশন!

আমি চন্দ্রমল্লিকার টাইম লাইন ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম , সেখানে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছে, প্রায় সত্তুর’টির মতো পোস্ট। পড়তে পড়তে একসময় আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ততক্ষণে বুকে জমে গিয়েছিল এতো এতো কান্না, আমি বুঝতে পারিনি হায়! আর কী আশ্চর্য ! আমি এখন দেখছি সেখানে ‘চন্দ্রমল্লিকা’ নামটি নেই, আমি চোখ মুছে আবার ভালভাবে খেয়াল করে দেখলাম- স্পষ্ট অক্ষরে লেখা নাম, আমার ছোট মেয়ের নাম: Remembering  চন্দ্রমল্লিকা চক্রবর্ত্তী

রাজস্থান উদয়পুর , ঘটনা জানুয়ারি ২০১৭

মেয়েটি মেডিক্যাল সেকেন্ড ইয়ারের মেধাবী ছাত্রী। সে ক্লাসে বসে আছে তার মাথা অবনত, স্যারের লেকচারে কোন মনোযোগ নেই, লজ্জা আর ঘৃণায় কেমন করে মাথা তুলবে, ভাবতে  পারছে না মেয়েটি ! ক্লাসের সবাই  আড়চোখে তাকিয়ে দেখছে শুধু তাকেই! সেখানে শত শত উৎসাহী চোখ! মেয়েটি বুঝে গেছে এবং জেনেও গেছে সব। বাড়ি ফিরে, এই মুখ কেমন করে দেখাবে, হায়রে মেয়েটি একবার ভাবে আকাশ, একবার ভাবে পাতাল! এবং ক্লাস চলাকালীনই অনিবার্য সেই কল’টি এসে হাজির হয়, কলেজ প্রিন্সিপাল স্যার তাকে ডেকেছেন।

এই মেয়েটি’র নাম আমরা এখন অনায়াসেই বলতে পারি ‘চন্দ্রমল্লিকা’ ! প্রিন্সিপাল ডেকে নিয়ে -তাকে ইচ্ছা মতন শাসালেন আর বলে দিলেন–তোমার বাবা’কে আসতে বলবে ,আমার এই কলেজের মান সম্মান আমি চাই না নষ্ট হোক, আর এখন এই মুহূর্তে তুমি চলে যাবে , এই কলেজের ত্রিসীমানায় আমি যেন না দেখি তুমি এবং তোমার ছায়া ! চন্দ্রমল্লিকা বলতে চেয়েছিল  – স্যার প্লিজ লিসেন মি , স্যার প্লিজ লিসেন মি … , কিন্তু বলতে পারলো না । টানতে টানতে চন্দ্রমল্লিকাকে রুম থেকে বের করে নিয়ে গেল সিকিউরিটি।

ছাত্রী’রা সবাই ঘটনা’টি দেখছে, তাদের কণ্ঠে প্রতিবাদ নেই, তাদের মনে গভীর বিষণ্ণতা বিরাজমান। স্থানে স্থানে জট পাকিয়ে ছাত্র’রা মোবাইলে দেখছে, দেখে দেখে হাসছে, রগড় কোন এক কাহিনী ! ধীর পায়ে কলেজ গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে চন্দ্রমল্লিকা। যাবার আগে মুখ তুলে ছাত্রদের চোখে তাকিয়ে দেখলো- ঠিক যেমনটি সে ভেবেছে, তেমনটি চলছে! ছাত্রদের দেখে বিষণ্ণ মনে হলো না কাউকেই, তাদের কণ্ঠে প্রতিবাদ নেই সত্য, কিন্তু তারা গভীর উদযাপনে নিমগ্ন।

আজ সকালেই কলেজ ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে –চন্দ্রমল্লিকা’র একটি অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও’র খবর, মুখে মুখে এখন ছড়িয়ে পড়েছে সেই গল্প। চন্দ্রমল্লিকাকে সরাসরি তাঁর কোন বান্ধবীরা কিছুই বলেনি , কিন্তু তাঁর কানে এসে পৌঁছে গেছে সেই খবর, তা যেমন করেই হোক!  ‘ছি ছি ছি ! দেখে মনে হয় ভাঁজা মাছ’টি উল্টে খেতে জানে না , তলে তলে এই অবস্থা! সংখ্যায় অতি নগণ্য দুই কী একজন বলতে চেয়েছিল – তোরা ভুল করছিস , এটা মল্লিকা নয় রে!  একজন বান্ধবী চেঁচিয়ে উঠে কনফার্ম করে দিল  –আমি সেন্ট পারসেন্ট শিওর সি ইজ মল্লিকা, খোলা পিঠে এই দাগটি আমি চিনি, মল্লিকার জন্ম দাগ।

রাজস্থানের উদয়পুর শহ’টি পর্যটকদের জন্য খুব বিখ্যাত। মল্লিকা’র বাবার ছিল হোটেল বিজনেস।  প্রিন্সিপাল সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন মল্লিকার বাবা’কে  –আপনার মেয়ে’র জন্য আমার কলেজ ঐতিহ্য ধুলোয় মিশে যাবে, আমি তা হতে দেব না!  প্রিন্সিপাল , মল্লিকার বাবাকে ভিডিও’টি দেখালেন। পিতার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল !

অবিশ্বাস্য ব্যাপার , সত্যি সত্যি এ যে আমাদের ‘চন্দ্রমল্লিকা’! উদয়পুর শহরে ততক্ষণে, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবার হাতে হাতে সেই ভিডিওটি , রগড়ের নাম ব্রেকিং নিউজ। হায়রে যা কোন দিন দুঃস্বপ্নেও ভাবে নি তিনি, মেয়ে মল্লিকার কারণে আজ এত বড় সর্বনাশ !

মল্লিকার বাবা ও বড় ভাই চরম মাথা গরম অবস্থায় বাসায় ফিরে আসলেন। ‘মল্লিকা’  ‘মল্লিকা’  গগন বিদারী চিৎকারে ভয় পেয়ে গেলেন মল্লিকার মা। বাপ বেটা  মল্লিকা’র উপর প্রচণ্ড আক্রোশে চড়াও হলেন, অকথ্য গালিগালাজ সাথে শুরু হ ফিজিক্যাল টর্চার। মা’ এসে স্বামী আর সন্তানকে বোঝাতে চাচ্ছিলেন ! কিন্তু কে শোনে কার কথা ! মল্লিকা প্রিন্সিপাল’কে বলতে চেয়েছিল  –স্যার প্লিজ লিসেন মি , প্লিজ স্যার , প্রিন্সিপাল কর্ণপাত করে নি। পিতাকেও বলতে চাইছিল সে – বাবা, প্লিজ আমার কথাটি শোনো , বাবা প্লিজ আমার কথা …

বাবা বলে দিলেন – কী শুনবো, আমি নিজের চোখকে কীভাবে অবিশ্বাস করি?

মা বললেন – মাঝে মাঝে আমাদের চোখও ভুল দেখতে পার , মল্লিকার বাবা, তুমি শান্ত হও। আমি আমার মেয়েকে তো চিনি! এই কাজ মল্লিকা করতেই পারে না !

-তুমি কী আমাকে অবিশ্বাস করছো মল্লিকার মা?

-যে বাবা তার মেয়েকে এভাবে মারতে পারে, তাকে আমি এখন আর বিশ্বাস করছি না।

-কী বললে তুমি?

-আমি এক বর্ণ ভুল বলিনি !

এক বান্ধবী এসে মল্লিকাকে তার বাসায় নিয়ে গেল। কিন্তু এই নষ্টা মেয়ে এখন সমাজের কাঁটা, তাঁকে কোনো অভিভাবক এবং সমাজ কেউই আর মেনে নিতে পারছিল না যেন! পাড়ায় পাড়ায় বার্তাটি রটে গেল। মল্লিকার বাবা আর ভাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন –বরং ওকে মেরে ফেলাটাই বেটার !  

সমাজ অধিপতি বললেন – তথাস্তু, এ মেয়ে রাখার চাইতে ফেলে দিলেই বরং বেশি লাভ। বাবা আর ভাই মিলে এবার নিয়োজিত হলেন, একটু সময় বাদেই চূড়ান্তভাবে স্তব্ধ হয়ে যাবে মল্লিকা। লাঠির আঘাতে আঘাতে মল্লিকা শায়িত হলো,  রক্তে লাল হয়ে গেল ঘরের মেঝে। মল্লিকার মা পুলিশকে খবর দিলেন। পুলিশ আসবার পর দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো মল্লিকাকে। হাসপাতালের কাঁচ ঘেরা আইসিইউ-তে মুখে অক্সিজেন লাগানো পাইপ, মল্লিকার মা গ্লাসের অপর পাশ থেকে দেখছিলেন, আর  অশ্রু ফেলছিলেন নীরবে । ডাক্তার এসে জানালেন –এখনও মরেনি, বেঁচে আছে মল্লিকা।

পুলিশ জোর তদন্ত শুরু করে দিলেন এই ঘটনার। ভিডিওর শুরু, দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে পেছন থেকে-  ধীরে ধীরে শরীরের ঊর্ধ্বাংশ খুলে যাচ্ছে শরীর থেকে, আস্তে আস্তে উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে পিঠ, পেছনের ব্রা’র হুক খুলে যেতেই, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে  মল্লিকার জন্ম দাগ এবং এক পর্যায়ে মল্লিকা যখন শায়িত হচ্ছে বিছানায় তখনই শুধু মুখাবয়বটি দেখা যাচ্ছে তার। স্পেশাল ব্রাঞ্চের এক্সপার্ট টিম একপর্যায়ে উদঘাটন করতে সমর্থ হলেন -মেয়েটির শরীরের গঠন ও মুখ দেখতে মল্লিকার মতো – কিন্তু এই ভিডিওর মেয়েটি মল্লিকা নয়। একজন ধুরন্ধর লোক নিদারুণ মুনশিয়ানায় এই কাজটি করেছেন।

জানা গেল মল্লিকার বাবা ক’দিন আগে তার হোটেলে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হবার কারণে এক যুবককে হোটেল থেকে পিটিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। সেই যুবক বেরিয়ে যাবার সময় বলে গেছে – এর প্রতিশোধ কড়ায় গণ্ডায় সে বুঝিয়ে দেবে একদিন।  পরবর্তীতে সেই যুবক মল্লিকার পিতার উপর প্রতিশোধ তোলার জন্য বেছে নিয়েছিল মল্লিকাকে। কৌশলে এক বান্ধবী’র কাছ থেকে সে জেনে নিয়েছিল –মল্লিকার পিঠের সেই দাগটির খবর।

পুলিশ এই খবর জানানোর পর বাপ-বেটা দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে –হায় ঈশ্বর, এ কী করলাম ! হায় ঈশ্বর ! তারা দুজন দৌড়ে গেলেন হাসপাতালে। সেখানে মেয়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে মা, অতন্দ্রপ্রহরী। পিতা-পুত্র জোড় হাতে ক্ষমা চাইলেন, মল্লিকার মা বলে দিলেন – কাছে আসবে না তোমরা কেউ , কোন ক্ষমা নেই, গেট আউট।

আজ হাসপাতালে মল্লিকার  দশম দিবস। মল্লিকার বাবা তখন তার হোটেলে, কৃত কর্মের অনুশোচনায় দগ্ধ। মহল্লার সবচেয়ে মেধাবী মেয়েটিই  ছিল তার মেয়ে, সবাই খুব ভালবাসতো, ছিল সবার খুব প্রি । কেউ এসে কোনদিন কোনো অভিযোগ করেনি, সোনার মেয়ে ছিল চন্দ্রমল্লিকা। ছেলে হাসপাতাল থেকে ফোন করেছে , পিতা বলছেন …

– হ্যাঁ বেটা বোল , হ্যাঁ বেটা বোল ………

মোবাইলের অন্যপ্রান্তে ভেউ ভেউ করে কাঁদছে ভাইটি –বাবা,  শি ইজ নো মোর।

(উৎপল চক্রবর্ত্তী , ২০ মার্চ ২০১৭)  

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.