লুকানো ডায়েরি থেকে- ১৪

0

চেনা অপরিচিতা:

দু’দিন পর ফের গেলাম হাসপাতালে। ভাবলাম, অপমান করলে করুক, যা খুশি বলে বলুক তবু যাবোই। কেবিনে ঢোকার আগে বাসার কাজের মেয়ের কাছে জানলাম, আমার ভাইয়ের স্ত্রী এসেছে। আমাকে কেউ জানাতে চায়নি তার বিয়ের খবর। এমনকি আমার ভাইও নয়। আমি খুব ঘৃণ্য তাদের কাছে, আর বড্ড বেশি অপাঙক্তেয়, তাই আবার বুকে বিঁধলো, নতুন করে।

সত্যি বলতে, আমার ভাইয়ের বিয়ের খবর পেয়েছিলাম এক আত্মীয়ের কাছ থেকে। বড্ড বেশি লজ্জার ছিল সেই তথ্য পরিবারের বাইরের একজনের মুখ থেকে জানা। সেই আত্মীয় বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে আমি জানি না। সে যাই হোক, সব রকম অপমান আর মাকে কিভাবে দেখবো সেই শঙ্কা নিয়ে কেবিনে ঢুকলাম।

সন্তান হিসেবে আমি খুব ঈর্ষা পরায়ণ। আমি দেখলাম আমার মায়ের উপর ঝুঁকে যে মেয়েটি, যে কিছুদিন আগ পর্যন্ত আমার ভাইয়ের জন্য পাগলামো করে আমাকে যোগাযোগ করতো, সে আমার মায়ের সাথে কথা বলে সান্ত্বনামূলক একটা কিছু বলছে, হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

আমার মার চোখের দৃষ্টিতে তাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচার অসহায়ত্ব। আমি বসলাম। ওরা দেখলো। আমার মা সেই মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, “একে চেনো?” আমি বললাম, “ভাইয়ার পরিচিত।“ আম্মা তখন বললো, “এটা তোমার ভাইয়ার বউ।” আমি ভাবলেশহীন গলায় শূন্য দৃষ্টিতে বললাম, “ও আচ্ছা।“

আমার খুব কান্না পাচ্ছিলো। আমি চেষ্টা করেও কান্না আড়াল করতে পারছিলাম না। চোখ দিয়ে অবিরত জল ঝরছিল। একসময় থাকতে না পেরে কেবিনের বাইরে চলে এলাম। সবাই আমার কান্না দেখুক, আমার মা যেন না দেখে। যখন আবার কেবিনে ঢুকলাম আমার বাবা এলো প্রেসক্রিপশন নিয়ে। সেই প্রেসক্রিপশন আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে দিল। আমি হাত বাড়িয়ে বললাম, “আমি নিয়ে আসছি।“ আমাকে মিনমিন করে আমার বাবা-মা বললেন, “ না, তোমার কষ্ট করতে হবে না। “

উত্তর দিলাম, “কষ্ট কিসের?” অপমানটা তখনও বুঝিনি পুরোপুরি। টাকা বাড়িয়ে দিলেন আমার বাবা। আমি না নিয়ে ঘুরে চলে গেলাম নিচে, ওষুধের দোকানে। অপমান ছাড়লো না। কাজের লোক টাকা নিয়ে আমাকে সাধতে লাগলো। আর পারলাম না। রাগে চিৎকার করে কেঁদে ফেললাম।

ওষুধ নিয়ে যখন মায়ের কাছে গেলাম, মা আফসোস আর করুণার মিশেল দৃষ্টিতে আমাকে বললেন, “শুধু শুধু টাকা খরচ করলা, এগুলা তোমার দরকারে লাগতো।“

আমি এই ছোট করা বুঝি। আমার স্বামীর কাছে গিয়ে আমি অভাবের তাড়নায় খেতে পাই না, কষ্ট করে চলি, ইত্যাকার কথা আমি শুনেছি। সর্ব সাকুল্যে ১০০০ টাকা খরচ হয়েছিল। এক হাজার টাকা আমি চাকরি করে মায়ের জন্য খরচ করতে পারবো না, এতোটা কাঙ্গাল আমি নই। আমি প্রতিবাদ করলাম। কিভাবে করেছিলাম মনে নেই। তবে তারা যা বিশ্বাস করতো সেখান থেকে কখনই এক চুল সরাতে পারিনি কখনও। নাটক- সিরিয়ালে এক পক্ষ কথা বলে, আরেক পক্ষ শোনে। আমার কথা কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি। আমার আবেগ পাথরে মাথা ঠুকে নিঃশেষ হয়ে গেছে।  

মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গতার চরম যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তে মাকে চিঠি লিখেছি। দু’একবার মা ফোন করে কথা বলেছে, কেঁদেছে, কিন্তু গ্রহণ করতে পারেননি। আমার মায়ের বুকের জন্য হাহাকার তাদের ব্যক্তিগত ইগো’র চেয়ে বড় হয়ে ওঠেনি কখনও।

একদিন পর কাজের লোক কাঁদতে কাঁদতে খবর দিল। সেদিন আমার বাচ্চাও অসুস্থ। বাচ্চার বাবাও কেমন যেন যেতে দিতে চাইছিল না মনে হচ্ছিল। যে যার সন্তান নিয়ে চিন্তিত। তখন আমি কেঁদে ফেললাম। বললাম, তোমার বাচ্চার খাবার আমি রেখে যাচ্ছি। তার কোনো অসুবিধা হবে না। আমি শুধু আমার মাকে দেখেই চলে আসব। এভাবে কেন কেঁদে খবর দিল, হয়ত কিছু হয়েছে। আমার স্বামী হয়ত লজ্জিত হল। আমার শাশুড়িও বললেন তাকে সাথে যেতে। কিন্তু আমি তো তাকে নেব না। সেও জানে, তার যাওয়া উচিত হবে না।

আমি হাসপাতালে ছুটে গেলাম।

আম্মাকে দুজন নার্স পায়খানা হওয়ার জন্য ফ্লুয়িড দিতে এলো। কিন্তু তাতে রক্ত বেরুলো। পায়খানা হলো না। আম্মা সারাজীবন শাড়ি পরেছে। কিন্তু এসময় শাড়ি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। আমি আম্মাকে যে কাজের মেয়েটি দেখভাল করছিল, তার কাছ থেকে সব জেনে ম্যাক্সি ,সাবান আর টুকিটাকি কেনার জন্য মার্কেট চলে গেলাম। দুটো নরম ম্যাক্সি কিনে এনে মেয়েটিকে বললাম, “আমার কথা বইলো না, যদি না পরে”। আমি আমার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে জানলার বাইরে চোখ গেল। সেখানে পেয়ারা মাখা বিক্রি করছে। আমি আম্মাকে বললাম, “ খাবা?” আম্মা খেতে চাইলো। আমি পেয়ারা আর আমড়া আনিয়ে দিলাম। একসময় আমার মা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি যাও, বাচ্চা একা আছে”।

আমার মায়ের চোখে মমতা ছিল। আমার অসহায়ত্ব আমার মা বুঝতে পারছিলো। আমি চলে যাবার আগে মাকে গভীর করে জড়িয়ে ধরলাম। ফিরে যেতে যেতে পিছন ফিরে একবার দেখলাম। দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল সারা পথ আঁকড়ে ছিল আমায়। তখন ভাবতেও পারিনি আমার আর কখনও মাকে জড়িয়ে ধরা হবে না।   

(চলবে…)

লেখাটি ২,৭৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.