মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ, অমানুষের উপর নয়

0

শান্তা মারিয়া:

গুরুদেবকে প্রায় প্রতিনিয়তই প্রশ্ন করি, তুমি যে বলেছিলে ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ’, কিন্তু মানুষ কী করছে রে বাপ! তিনি আমাকে বলেন, ‘ওরে আমি মানুষের উপর বিশ্বাস রাখতে বলেছি, অমানুষের কথা তো বলিনি’। কিন্তু হায় গুরুকে কিভাবে বুঝাই যে, অমানুষগুলোকে দেখতে তো মানুষের মতোই লাগে। বুঝবো কিভাবে, কে অমানুষ আর কে মানুষ?

বুঝতে পারেননি ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুন্নেছা আরিফা। বিশ্বাস করেছিলেন ফখরুল ইসলাম রবিন নামে একটা অমানুষ পিশাচকে। তাই জীবন দিয়ে সেই বিশ্বাসের মূল্য পরিশোধ করতে হলো তাকে। অনেক খবরের চাপে আরিফার খবরটি মিডিয়ায় সেভাবে মনোযোগ পায়নি। কিন্তু এই খবরটি হলো এমন একজন মানুষের মৃত্যুর যে বিশ্বাস করেছিল ভালোবাসায়। আরিফা ভালোবেসে বিয়ে করেন রবিনকে। ভালোবেসে বিয়ে করার পর রবিনের নির্যাতনের শিকার হন তিনি। রবিন ছিল মাদকাসক্ত। বেশ কিছুদিন সংসারের নামে চরম নির্যাতন সহ্য করে অবশেষে পাঁচমাস আগে রবিনকে ডিভোর্স দেন আরিফা। পরে রবিন আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করে, আবার সংসার করতে চায়। আরিফা তাকে আবারও বিশ্বাস করেন। এইবার রবিন তাকে খুনই করে ফেলে।

প্রশ্ন হলো রবিনের চরম হিংস্র রূপ দেখার পরও আরিফা আবার তাকে বিশ্বাস করতে গেলেন কেন? এর পিছনে কী কাজ করেছিল নারীর এবং অবধারিতভাবে সমাজে সেই সনাতন মনোভঙ্গি, বিয়ে যখন একবার হয়েই গেছে দেখি না চেষ্টা করে তাকে সুপথে আনা যায় কিনা।

প্রসঙ্গক্রমে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি। সবগুলো আমার নিজের চোখে দেখা। নামগুলো শুধু বদলে দিলাম সামাজিক কারণে।

ঘটনা ১

রেখার সঙ্গে সালামের প্রেম উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকে। সালাম মাদকাসক্ত। পারিবারিকভাবে অনেক চেষ্টা হয় সে যেন ড্রাগস ছেড়ে দেয়। কিন্তু সে ছাড়তে পারেনি। রেখা একসময় মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। সালামের পরিবার রেখার সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়। কিন্তু রেখা বিয়ে করতে অস্বীকার করে। এটা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয় আত্মীয় পরিচিত মহলে। বলা হয় ‘সব সম্পর্ক’ হয়ে যাওয়ার পর রেখা কেন বিয়ে করছে না। সে একটা জঘন্য মেয়ে ইত্যাদি। কিন্তু রেখা বলে, মাদকাসক্তের সঙ্গে জড়িয়ে আমি নিজের জীবন নষ্ট করব না। রেখা পরবর্তিতে অন্য একজনকে বিয়ে করে। সে এখন বেশ ভালো অবস্থায় আছে। ক্যারিয়ারেও উন্নতি করেছে।

এই ঘটনায় একটি পয়েন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো সমাজের বলা ‘সব সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার পর’। এই ‘সব সম্পর্ক’ শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে শারীরিক সম্পর্ক। এই ভাবনাটা অনেক মেয়ের মধ্যেও কাজ করে। মনে করে যেহেতু কোনো পুরুষের সঙ্গে তার শারিরীক সম্পর্ক হয়েছে অতএব তাকেই বিয়ে করতে হবে, তার সাথেই সংসার করতে হবে। সে লোকটি চরম অপদার্থ হলেও। একই চিন্তা থেকে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করা হয় গ্রাম্য সালিশে। মনে করা হয় একটি নারীর দৈহিক সম্পর্ক শুধু একজন পুরুষের সঙ্গেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। সম্প্রতি বিতর্কিত বাল্যবিবাহ আইনেও এই বিষয়টি উলেøখ করা হয়েছে। ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের মতো একটি কুৎসিত চিন্তাকে সরকারীভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে এর মাধ্যমে।

প্রকৃতপক্ষে বিয়ে এবং শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। বিয়ে হতে হবে এমন দুজন মানুষের মধ্যে, যাদের চিন্তা চেতনা মতাদর্শে মিল রয়েছে। যারা পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল। পারস্পরিক মানসিক আকর্ষণ ও একত্রে জীবনসংগ্রাম করার ইচ্ছা থেকেই বিয়েটা হওয়া দরকার।

শান্তা মারিয়া

শুধু দৈহিক আকর্ষণ যে বিয়ের মূল ভিত্তি সেটা খুবই নড়বড়ে হতে বাধ্য। কারণ মনের মিল না থাকলে শুধু শারিরীক আকর্ষণ নিয়ে একটি সম্পর্ক বেশিদিন টিকতে পারে না, বেশিদূর যেতেও পারে না। এই ‘ভাঙা’ সম্পর্কগুলো তখন জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয় শুধুমাত্র ওই চিন্তা থেকে যে, ‘বিয়ে যখন হয়েই গেছে’ তখন এটাকে ধরে রাখতেই হবে যেকোনো মূল্যে। কখনও কখনও সেই মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে। যেমন দিলেন আরিফা। যেমন দিয়েছেন আরও আরও অনেক নারী।

আমাদের সমাজে ভার্জিনিটির সঙ্গে প্রেম, বিয়ে ইত্যাদিকে এমনভাবে গুলিয়ে ফেলা হয় যে সব সম্পর্কগুলো, চিন্তাভাবনাগুলো গোল পাকিয়ে যায়। আবার অনেক সময় ভার্জিনিটিকে ‘নারীর পরম সম্পদ’, ‘সর্বস্ব’ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করে তাকে এই চিন্তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয় যে, একবার কারও সঙ্গে বিয়ে বা শারিরীক সম্পর্ক হলে সেই সম্পর্কটি যেকোনো ভাবে হোক টেনে নিয়ে যেতে হবে। অন্য কখনও এ নিয়ে বিস্তারিত লিখব। রেখাকে সাধুবাদ জানাতে হয় ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তটি নেওয়ার কারণে।

ঘটনা ২

জসিম মাদকে আসক্ত। তাকে ভালোবেসে বিয়ে করার পর একথা জানতে পারেন মিনা। জসিমের মা বিয়ের পরদিনই মিনাকে বলেন ‘ওকে নেশা ছাড়ানোর দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে মা’। মিনা নিজেও মনে করে সে জসিমকে ‘ভালোবেসে’ ‘নেশা ছাড়াবে’। অনেক চেষ্টা করে মিনা। সেই চেষ্টায় তার জীবনের ২৬টি বছর ব্যয় হয়। উপযুক্ত চিকিৎসা ছাড়া কখনও কোনো ধরনের নেশা যে ছাড়ানো সম্ভব নয় সেটা দাম্পত্য জীবনের শেষ দিন অবধি বুঝতে পারেনি সে। জসিমের মৃত্যুর পরও অনেক আত্মীয় স্বজন মিনাকে বলে, তুমি যদি ওর নেশাটা ছাড়াতে পারতে তাহলে এত তাড়াতাড়ি মরতো না। মিনা নিজেও নিজেকে দোষী ভাবে।

সেদিন এক জায়গায় একটি মন্তব্য শুনলাম। এক ধূমপায়ীর স্ত্রীকে বলা হচ্ছে, ‘ভাবী, আপনার হাজবেন্ড যে এত সিগারেট খায় আপনি বন্ধ করতে পারেন না?’ যেন লোকটির ধূমপান ছাড়ানোর জিম্মাদার হলেন তার স্ত্রী। চিকিৎসক ব্যতীত আর কেউ যে কাউকে কোনো নেশা ছাড়াতে পারেন না এ তথ্যটি এখনও আমাদের সমাজ স্বীকার করতে চায় না।

প্রেমিক ও স্বামীর উপর অতিরিক্ত বিশ্বাস স্থাপন করে প্রতারিত হওয়া, জীবন হারানো, অঙ্গ হারানো নারীর সংখ্যা কম নয়।   স্বামী বা প্রেমিক তাদের ঘনিষ্ট দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে পরে নানাভাবে বø্যাকমেইল করেছে, কোনো সাইটে ছেড়ে দিয়েছে এমন উদাহরণ অসংখ্য। বিদেশে পাচার করে দেওয়ার ঘটনাও প্রচুর।

একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে স্বামী বা প্রেমিক একবার সহিংস আচরণ করে, সে কিন্তু বারে বারেই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। স্বামীর হাতে খুন হওয়া নারীদের কেসগুলো স্টাডি করলে দেখা যাবে কয়েক দফা নির্যাতিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। শুরু হয় চড় দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। শেষে হত্যা পর্যন্ত গড়ায়। তাই একবার যে সহিংস আচরণ করে তার উপর আর বিশ্বাস স্থাপন করা বুদ্ধির কাজ নয়। সহিংস ব্যক্তিকে চিরতরে ত্যাগ করাই নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন।

আর যারা ভাবেন ‘ভালো হয়ে যাবে’, ‘ও তো বললো আর মারবে না’ ইত্যাদি ইত্যাদি, তারা আসলে নিজেদের মৃত্যুর পথই পরিষ্কার করছেন। যে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর, প্রেমিকার উপর নির্যাতন করে, সে কোনো মানুষের পর্যায়েই পড়ে না। সে অমানুষ।

আর অমানুষের উপর অযথা বিশ্বাস রাখা কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়।

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

লেখাটি ১,৫২৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.