প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে ডিমলার চরের নারীদের ভাগ্য

0

উইমেন চ্যাপ্টার:

নিজেদের উদ্যোগ, তাড়না আর একটি স্মার্টফোন বদলে দিয়েছে চর এলাকার প্রান্তিক নারীর ভাগ্য। এসব নারী এখন নিজের কাছেই প্রশ্ন করেন, “আমরা এতোদিন কেন অন্ধকারে ছিলাম? কেন আমরা শুরু করিনি আমাদের সংগ্রাম”?

তারা এখন নিজেদের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আর পিছু ফিরতে রাজি না। তারা এখন সংসার, পরিজন, সমাজ, রাষ্ট্রের কাছে দাবি করছেন, তারাও এ দেশের উন্নয়নে-উৎপাদনের অংশিদার। কাজেই তাদেরকে সম্মান, মর্যাদা, আর্থিক সহযোগিতা দিতে হবে। এটি তাদের অধিকার।

বিস্তৃত চর এলাকার এই নারীদের গলার আওয়াজ এখন অনেকখানিই বলিষ্ঠ আর স্পষ্ট। অধিকারের বিষয়েও সংগঠিত ও সুসংসহত। আর এসবই সম্ভব হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে।

ডিমলা নীলফামারী জেলার একটি উপজেলা। এই উপজেলার একটি গ্রাম দক্ষিণ খড়িবাড়ি। গ্রামটি চর এলাকায়। এখানকার মানুষ খুবই দরিদ্র। এলাকাটি চর অধ্যুুষিত হওয়ায় আয় রোজগারের সুযোগ কম। ফসলের উৎপাদনও কম। এখানে গত পাঁচ বছর যাবত চলছে পল্লীশ্রী সংস্থার উদ্যোগে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীকে আর্থিক কাজে সম্পৃক্ত করা এবং নারীরা যাতে উৎপাদনমুখি কাজ করতে পারে সেই প্রয়াস। যেসব নারী  পল্লীশ্রীর প্রকল্পে আগে থেকেই যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে বেছে বেছে ১০০ জন নারীকে প্রতীক প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। দরিদ্র অসহায় নারীরা এখন নগদ অর্থের মুখ দেখছেন। পরিবার, সমাজে তাদের এখন সম্মান, মর্যাদা বেড়েছে। তারা এখন সহজেই বিভিন্ন সেক্টরে যোগাযোগ করতে পারেন।

চর অধ্যুষিত গ্রামে বসবাসরত মুন্নি আক্তার (শারীরিক প্রতিবন্ধী), লাভলী আক্তার, ফরিদা বেগম, উম্মে কুলসুম ও ময়না বেগমসহ ১০০ নারী তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন করছেন।

পল্লীশ্রী পাঁচ বছর ধরে চরের নারীদের আয়বর্ধকমূলক কর্মসংস্থান তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় অক্সফ্যামের আর্থিক সহযোগিতায় সরকারের প্রাণিসম্পদ, মৎস্য বিভাগ, কৃষি বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দরিদ্র প্রান্তিক নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ‘তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে নারীর অগ্রগতি’ শিরোনামে ‘প্রতিক’ নামের প্রকল্পের কাজ শুরু করে।

Participatory Research and Ownership with Technology Information and Change-PROTIC শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ খড়িবাড়ি গ্রামের চর এলাকায় বসবাসরত ১০০ নারীকে সংগঠিত করে সাতটি দলে ভাগ করে তাদেরকে  বিষয়ভিত্তিক সাতদিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি করে স্মার্ট ফোন। সাথে সাথে এসব নারীকে স্মার্টফোনের ব্যবহারও শিখিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিমাসে তাদের ফোনে কিছু পরিমাণ টাকা রিচার্জ করে দেয়া হয় প্রকল্প থেকে। ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত নারীরা বর্তমানে গরু-ছাগল পালন, সবজি চাষ, মরিচ চাষ, ভুট্টা চাষ, মাছ চাষ, ভুট্টার ব্যবসা করছেন।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ১০০ জন নারী নিজেদের প্রয়োজনে এবং নিজ উদ্যোগে গরু-ছাগল পালন, সবজি চাষ, মরিচ চাষ, ভুট্টা চাষ, মাছ চাষ প্রকল্পের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করছেন। প্রয়োজন মনে করলে তারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ, মৎস্য বিভাগ, কৃষি বিভাগের সাথে স্মার্টফোনে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করে সমস্যার সমাধান করছেন।

যেসব নারী ভুট্টার ব্যবসা করছেন তারা বিভিন্ন এলাকার বাজার ও ব্যবসায়িদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে সর্বশেষ বাজারদরও জেনে নিচ্ছেন। এভাবেই প্রতিনিয়িত তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা ও উদপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কখনও প্রয়োজন পড়লে এসব নারী প্রকল্পের প্রতীক কল সেন্টারে ফোন করেন। কল সেন্টার থেকে তাদের ফোন রিসিভ না করে সেখানে অবস্থানরত বিশেষজ্ঞ টিম তাদের কল ব্যাক করে এসব নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যার কথা শুনে কী পদক্ষেপ নিতে তা হবে ফোনেই বলে দেয়। সে অনুযায়ী তারা সমস্যার সমাধান করেন।

কল সেন্টার ছাড়াও তারা মোবাইল ফোনে উপজেলা মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষিসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান, গবাদিপশু, মাছ, কাঁকড়া ও সবজি ক্ষেতের সমস্যা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

মুন্নি আক্তার (শারীরিক প্রতিবন্ধী):

মুন্নি আক্তার শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও স্বপ্ন দেখেন নিজে স্বাবলম্বী হবেন। সে লক্ষ্যে স্থির থাকতে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় একটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ছেন মুন্নি আক্তার। আর এই পড়ালেখার সাথে সাথে চালিয়ে সচল রাখছেন নিজের স্বপ্নের চাকা। নিজেকে একজন বড় কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা তার স্বপ্ন। সেই ইচ্ছা থেকেই মুন্নি আক্তার প্রতীক প্রকল্পের সদস্য হয়েছেন। প্রকল্প থেকে তাকে প্রশিক্ষণ শেষে দেয়া হয়েছে একটি স্মার্টফোন। যা কিনা তাকে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করছে। বর্তমানে বাবার প্রায় দুই বিঘা জমিতে নিজে গড়ে তুলেছেন কৃষি খামার। সেই খামারে একদিকে উৎপাদন হচ্ছে সবজি, ভুট্টা, ধান, পাট। অরপদিকে ছোট আকারে শুরু করেছেন গরু-ছাগল মোটাতাজাকরণ খামার।

চলতি বছর তিনি দুটি গরু বিক্রি করে নগদে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। সেই টাকা দিয়ে আবারও চারটি গরু কিনবেন। যেগুলো বড় করে আগামী কোরবানির ঈদে বিক্রি করার কথা ভাবছেন। এছাড়া তার খামারে বর্তমানে বেশ কয়েকটি ছাগল আছে। যার মধ্যে দুটি ছাগল এক মাসের মধ্যে বাচ্চা দিবে। মুন্নি আক্তারের সাথে যখন কথা হচ্ছিল জানতে চাইলাম, ‘সামনের দিনগুলো নিয়ে কী ভাবছেন?’। খুব সহজ আর উচ্ছাসের সাথে উত্তর দিলেন, ‘আমি একদিন বড় একটি কৃষি খামারের মালিক হতে চাই। সেই খামারে কাজের সুযোগ পাবে এলাকার অসংখ্য মানুষ। আমার এই খামার তৈরিতে আমি সরকারি-বেসরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা চাই। আমি নারী হিসেবে পিছিয়ে থাকতে চাই না, সেজন্য একই সাথে পড়ালেখা আর এই কৃষি খামার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি’।

মুন্নি আক্তার আরও জানালেন, তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে এখন আর অসহায় মনে হয় না। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে জানালেন, তিনি এখন একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্য স্থির করে সামনে এগিয়ে যেতে চান। গ্রামের লোকজন এখন মুন্নি আক্তারের কাছে আসে পরামর্শ নিতে। তারা জানতে চায় কোথায় গেলে কী পরামর্শ ও সহযোগিতা পাওয়া যাবে। মুন্নি আক্তার হয়ে উঠেছেন ডিমলা উপজেলার অন্যতম কৃষি উদ্যোক্তা নারী। যাকে দেখে এলাকার অন্য নারীরাও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।  

লাভলী আক্তার:

দক্ষিণ খড়িবাড়ি গ্রামের লাভলী আক্তার একজন সাধারণ গৃহবধূ। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসেই তাকে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হচ্ছে কঠিন দরিদ্রতার সাথে। অভাব কাকে বলে লাভলী আক্তার তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। এক সময় মনে মনে পণ করেন এই অভাবের দুষ্টচক্র থেকে বের হতেই হবে তাকে। এক সময় যোগ দিলেন পল্লীশ্রীর প্রাথমিক দলে। পরবর্তীতে সেখান থেকে প্রতীক প্রকল্পে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ আসে লাভলীর। বর্তমানে ১৪ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করছেন তিনি। বছরের বার মাসই তিনি এই জমিতে কোন না কোন ফসল উৎপাদন করছেন। যে জমিটি চরের মধ্যে, সেখানে পেঁয়াজ, রসুন ও মরিচ চাষে লাভলী আক্তারের যথেষ্ট লাভ হচ্ছে। সাথে সাথে তিনি বিভিন্ন জাতের ডালের চাষও করছেন। এলাকায় একজন সফল মরিচ চাষি হিসেবে এরই মধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছেন লাভলী। বাদ যাচ্ছে না আলু চাষও। প্রতি মাসে বড় অংকের টাকা এখন সঞ্চয় করছেন তিনি।

যে সংসারে একসময় তিনবেলা খাবার ছিল না, সেই সংসারেই লাভলী আক্তার মুক্তি পেয়েছেন ঋণ থেকে। তার সাথে এখন সকল কাজে যুক্ত থাকেন তার স্বামী। দু’জনের যৌথ পরিশ্রমে সঞ্চয় বাড়ছে। স্বপ্ন দেখছেন একরের পর একর জমিতে তার কৃষি খামারে ধান, ভুট্টা, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ চাষ হবে। শতাধিক কৃষি শ্রমিক কাজ করবে তাদের খামারে। এসব কথা বলতে বলতে চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে লাভলীর। অভাবের যে দিন গেছে তা তার মনে দাগ কেটে রেখেছে।

লাভলী স্বামীর সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেন যে, তাদের সন্তানদের কোনভাবেই অভাবে বেড়ে উঠতে দেবেন না। তাদেরকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। যেন তাদের মতো অসহায় দিন তাদের পার করতে না হয়। লাভলীর কৃষি খামারটি এলাকায় একটি বড় খামার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রায়ই খোঁজখবর নেন লাভলীর খামারের। এখন আর কোন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করতে বা যেতে লাভলীর সংকোচ লাগে না। এলাকার কৃষকরা তার কাছে আসে পরামর্শ নিতে। কোন সমস্যা সঠিকভাবে লাভলী না বুঝলে সাথে সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে। যা ছিল একসময় তার কাছে স্বপ্নের মতো।

একজন গ্রামীণ অশিক্ষিত গৃহবধূ সরাসরি ফোন করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে বা ইউনিয়ন তথ্য উদ্যোক্তা কেন্দ্রে, বিষয়টি এখন তার কাছে খুবই স্বাভাবিক লাগে। লাভলী আক্তার এখন একজন সফল ভুট্টা ব্যবসায়ি। তিনি এলাকা থেকে ভুট্টা কিনে দূরের মোকামে/বাজারে বিক্রি করেন। ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করে দাম জেনে নেন তিনি স্মার্টফোনের মাধ্যমে।  গ্রামের কৃষকদের নিকট লাভলী আক্তার এখন ভুট্টা বিক্রির নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। এসবই সম্ভব হয়েছে প্রতীক প্রকল্পের প্রশিক্ষণ, একটি স্মার্টফোন আর একজন প্রান্তিক নারীর আত্মপ্রত্যয়ের মাধ্যমেই।

ফরিদা বেগম:

মাছ চাষ করে সংসারের অভাব ঘুচাতে সক্ষম হয়েছেন গৃহবধূ ফরিদা বেগম। এক সময় মাথার উপর ছায়া ছিল না যার, সেই ফরিদা বেগম এখন মাছ চাষের লাভের টাকা দিয়ে টিনের চাল আর পাকা ইটের গাঁথুনি দিয়ে ঘর তৈরি করেছেন। এখন ফরিদার পরিবারে আর কেউ উপোস করে থাকে না। তার সন্তানদের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতে কষ্ট হয় না।

অথচ জাহাঙ্গীর আলমের সাথে বিয়ের পর ফরিদার জীবনে শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। সে সময় ফরিদা চোখে শুধুই অন্ধকার দেখতেন। দিনমজুর স্বামী জাহাঙ্গীরের আয়ে কোনভাবেই সংসার চলে না। একদিকে ঘরে খাবার নেই, অন্যদিকে নিয়মিতই বাড়ছিল ঋণের বোঝা। ফরিদা বেগম সারাক্ষণ চিন্তা করতেন এই নরক যন্ত্রণা থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়। সন্তানদের কীভাবে খাইয়ে-পরে মানুষ করা যায়, লেখাপড়া শেখানো যায়।

যেখানে সংসারে তিনবেলা খাবারই জোটে না, সেখানে বাচ্চাদের কীভাবে পড়াবেন, এরকম ভাবনার মাঝেই একদিন যোগাযোগ হয় পল্লীশ্রীর প্রতীক প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর ফেরদৌস আরা সাথে। তার পরামর্শে তিনি যোগ দিলেন প্রতীক প্রকল্পের সুবিধাভোগি সদস্য হিসেবে। জানা গেল এই প্রকল্প থেকে কোন ঋণ বা আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে না। দেওয়া হবে শুধুমাত্র প্রশিক্ষণ আর একটি স্মার্টফোন। প্রথম দিকে ভাবলেন স্মার্টফোন দিয়ে কী হবে! এটি নিলে তো আবার খরচ বাড়বে।  

তারপরও সবদিক বিবেচনা করে এক সময় সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রকল্পের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করবেন। এই প্রশিক্ষণই তার জীবনের চিত্র বদলে দিল। প্রশিক্ষণ শেষে শুরু করলেন নিজেদের পুকুরে স্বল্প পরিসরে মাছ চাষ। পাশাপাশি পুকুর পাড়ে সবজির আবাদও শুরু করেন। পরবর্তীতে পাঁচ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করলেন ভুট্টার চাষ। সেই ভুট্টা বাজারে বিক্রি করতে করতে শিখে নিলেন ব্যবসা। এলাকায় ভুট্টা ব্যবসায়ী হিসেবে ফরিদাকে সবাই এক নামে চেনে। আগামীতে ফরিদা স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বড় আকারের ভুট্টার আবাদ, মাছ চাষ ও সবজির খামার গড়ে তুলবেন। ব্যবসা ও খামার পরিচালনায় তার মূল অস্ত্রই হচ্ছে প্রতীক প্রকল্পের দেওয়া স্মার্টফোনটি। কোন সমস্যা হলেই সাথে সাথে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, প্রতীক কল সেন্টার এবং ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। সমস্যার সমাধানও হয় সাথে সাথেই। ফরিদার স্বপ্ন এখন বড় ভুট্টা ব্যবসায়ী আর কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার। এজন্য ফরিদা ব্যাংক ঋণ বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্প সুদে আর্থিক সহযোগিতার আশা করছেন- যেখান থেকে তিনি পুঁজি নিয়ে ব্যবসাটাকে আরও বড় করতে পারবেন।

উম্মে কুলসুম:

উম্মে কুলসুম গ্রামের আর দশজন গৃহবধূর মতোই সংসার করছিলেন। চর এলাকার মানুষ খেয়ে না খেয়ে কোনমতে দিন যায়। স্বামীর আয়ে সংসারের চাকা ঠিকমতো ঘোরে না। কিন্তু এখন তার ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে। স্বপ্ন দেখছেন হয়তো একদিন এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। স্বচ্ছলতার মুখ দেখবেন এই আশায় যুক্ত হয়েছেন পল্লীশ্রীর প্রতীক প্রকল্পের প্রাথমিক সুবিধাভোগি সদস্য হিসেবে। তিনিও একটি স্মার্টফোন পেয়েছেন প্রকল্প থেকে। সেটির ব্যবহারও শিখেছেন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আর প্রতীক প্রকল্পের মাধ্যেমে সাত দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে বাড়ির আঙিনায় প্রায় একবছর আগে শুরু করেছেন উন্নত মানের বীজে আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ। নিজের সবজি বাগান থেকে এখন তার পরিবারের সবজির চাহিদা মিটছে। এর বাইরে কিছু পরিমাণ সবজি বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে অন্যান্য মালামাল কিনছেন সংসারের জন্য। মৌসুম অনুযায়ী সবজি চাষের জন্য তিনি উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতা নিয়ে আবাদ করছেন। স্বল্প পরিমাণ জমিতে খুব বেশি সবজি চাষ করা যায় না। তাই চেষ্টা করছেন কিছু পরিমাণ জমি লিজ নিয়ে সেখানে সবজির খামার গড়ে তুলবেন। এ কাজে তার স্বামী এবং পরিবারের সদস্যরাও সহযোগিতা করছেন। পল্লীশ্রীর কর্মীরাও তাকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেন এবং খামারে যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে স্মার্টফোনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে সহযোগিতা ও পরামর্শ পান।

ময়না বেগম:

ময়না বেগম ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ খড়িবাড়ি গ্রামের এক দরিদ্র গৃহবধূ। এক সময় কঠিন সময় পার করে এখন স্বপ্ন বুনছেন সুন্দর আগামীর। স্বপ্ন দেখছেন সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। গ্রামে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা পল্লীশ্রীর প্রতীক প্রকল্পের প্রাথমিক সুবিধাভোগি সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়ে স্মার্টফোন পেয়েছেন তিনিও। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার প্রশিক্ষণ নিয়ে  নিজেদের সামান্য আর কিছু পরিমাণ জমি লিজ নিয়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ জমিতে সবজি, ভুট্টা, ধান চাষ করছেন। মৌসুমে এলাকা থেকে ভুট্টা কিনে বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। এলাকায় এরই মধ্যে ভুট্টা ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে পেরেছেন। তবে প্রান্তিক নারী হিসেবে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন পুঁজি না থাকলে কিছু করা খুব কঠিন। সেজন্য প্রতিনিয়ত অল্প অল্প করে টাকা জমাচ্ছেন বলে জানালেন ময়না।

ময়না বেগম জানালেন, তারা সিবিও’র মাধ্যমে (২৫-৩০ জনের এক একটি গ্রুপ বা দল) প্রতি মাসে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সকলে মিলে সঞ্চয় জমা দিচ্ছেন। এই হিসাবে বেশি পরিমাণ টাকা জমা হলে তারা সেখান থেকে ঋণ নিয়ে নিজেরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবেন।

ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির আলাপকালে জানালেন, তিনি প্রতীক প্রকল্পের সুফলভোগি নারীদের বিভিন্ন কৃষি উদ্যোক্তা প্রকল্পে নিয়মিতই যাতায়াত করেন। তাদেরকে নানান পরামর্শ দেন, উদ্যোক্তারা সমস্যার বিষয়ে তাকে ফোন করলে বা তার অফিসে এলে তিনি সহযোগিতা করেন। এবং তার অধীনে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও এসব কৃষি খামারের খোঁজখবর নেন নিয়মিত। তাছাড়া সরকারি কোন সুযোগ-সুবিধা এলে তিনি চেষ্টা করেন সবার আগে এসব নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের মাঝে দেওয়ার।

তিনি আরও বলেন, একটি স্মার্টফোন ও প্রশিক্ষণ এসব অসহায় নারীদের জীবনমান বদলে দিয়েছে। এখন তাদেরকে পুঁজি সরবরাহ করা গেলে তারা এক একজন বড় কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদেরকে আরও বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

ডিমলা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শফিউল ইসলাম জানালেন, সরকারের কয়েকটি দপ্তরের সাথে যুক্ত আছে প্রতীক প্রকল্পটি। সে কারণে তার দপ্তর থেকে নারী উদ্যোক্তাদের সকল প্রকার সহযোগিতা করা হয়। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ খড়িবাড়ি গ্রামের ১০০ জন প্রান্তিক নারীকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। প্রান্তিক নারীরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে আগামীতে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে আরও ভূমিকা রাখবেন এবং নিজেরা স্বাবলম্বী হবেন এমনটাই তিনি আশা করছেন।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে তারা জানালেন, পল্লীশ্রী বাস্তবায়িত প্রতীক প্রকল্পটিতে সরকারি দপ্তর হিসেবে তারা সম্পৃক্ত রয়েছেন, এবং এসব প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছেন। প্রযুক্তির সহায়তায় আগামীতে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে এই নারীরা আরও ভূমিকা রাখবেন বলেই তার বিশ্বাস।

প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর ফেরদৌস আরা বলেন, তিনি প্রতীক প্রকল্পের ১০০ নারীর সাথে বিগত এক বছর কাজ করছেন। প্রত্যেকটি দলের সদস্যরা মাসে একবার নিজেদের মধ্যে সভায় অংশগ্রহণ করে। সেখানে তারা নিজেদের এবং খামারের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। সমস্যা মোকাবেলায় কি ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে,  তা নিজেরাই ঠিক করেন। তিনি এই ১০০ নারীকে নিয়ে গঠিত বিভিন্ন দলের সাথে মাসে একবার সভা করেন। এছাড়া প্রতিদিন তিনি কোন কোন সদস্যের বাড়িতে যান তাদের খামার দেখতে। বিভিন্ন সময় সদস্য নারীরা তার কাছে ফোন করেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। তখন তিনি তাদেরকে যোগাযোগ করিয়ে দেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে।

ফেরদৌস আরা আরও জানালেন, নিভৃত পল্লীর নারীরা প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর এখন তারা মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেও তথ্য সংগ্রহ করতে শিখেছে। তারা আত্মবিশ্বাসী হতে শিখেছে। এখন এসব নারী আর নিজেদেরকে অবলা মনে করে না। তারা সঞ্চয় করে নিজ নিজ সংসারে অবদান রাখছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পটি একটি মডেল হতে পারে প্রান্তিক নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যম হিসেবে।

প্রকল্পের প্রোগ্রাম অফিসার মাকিম চৌধুরী বলেন, উদ্যোক্তা হিসেবে এই নারীরা ইতোমধ্যে নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছেন এবং আশা জাগিয়েছেন যে, তারা আগামীতে বড় উদ্যোক্তা হওয়ার মতো মেধা, বুদ্ধি ও শক্তি তাদের আছে। এসব নারী উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিচ্ছে প্রকল্পের প্রতীক কল সেন্টার, ইউনিয়ন তথ্য উদ্যোক্তা, স্থানীয় উপজেলা কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, বিভাগ। এই গ্রামের ১০০ নারী বাংলাদেশে রোল মডেল হয়ে উঠবে, এরকম আশাবাদ ব্যক্ত করেন মকিম চৌধুরী।

তিনি আরও জানান, ১০০ নারীকে কয়েকটি গ্রুপে/দলে ভাগ করে দল গঠন করা হয়েছে। মাসে তারা একবার সভায় মিলিত হয়। প্রতি মাসে দলের সদস্যর মাধ্যমে সঞ্চয় জমা করছে। এটি একটি সমবায় ভিত্তিক সঞ্চয়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলাকায় সিবিও আকারে প্রতিষ্ঠিত হবে। “এসব নারীকে এলাকায় আমারা এক একজন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আশা করছি প্রকল্পটির শেষে দরিদ্র এসব নারীরা এলাকায় বড় কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবেন”।

প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছেন ফারুক রহমান

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ৩৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.