বাক্সে বন্দী পুতুল জীবন (শাশ্বতী বিপ্লবের ছোট গল্প)

0

শাশ্বতী বিপ্লব:

১.

নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রহিমা হিসাব মেলানোর চেষ্টা করে। মানুষের দুইটা হাত কী কাজে লাগে? আপনজনকেই যদি ধরে রাখতে না পারে, বিপদে শঙ্কায় ভরসা দিতে না পারে, তাহলে এই নিষ্ফলা হাত দিয়ে সে কী করবে? জীবনে কত কাজে লেগেছে এই হাত। আর আজ সেই হাত দুইটারেই নিজের শত্রু মনে হয় কেন তার? শাড়ীর আঁচলে বারবার হাতটা মোছে রহিমা, কিন্তু তাতে লেগে থাকা অসহায় এক স্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। যে হাতের এতটুকু ক্ষমতা নাই, যে হাত নিজের বুকের ধনকে আগলে রাখতে পারে না, সেই হাত কেন তার শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায় না? কেন বেহায়ার মতো এঁটে থাকে শরীরের সাথে, কাজ করে, মুখে খাবার তুলে দেয়? মানুষের হাত কী শুধুই নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য!

ফাল্গুনের রোদে এখনও শীতের আমেজ। বাতাসে আমের বোল আর কাঠালের মুচির মাতাল করা ঘ্রাণ। সবমিলিয়ে প্রকৃতিতে সুখ সুখ গন্ধ। রহিমার মনেও সুখই ছিল। মেয়েকে সুপাত্রে বিয়ে দিতে পারার সুখ, সাথে নির্ভার হওয়ার স্বস্তি। কিন্তু এক ভীষণ অপরাধবোধ রহিমার মনের সেই সুখটাকে গলা টিপে ধরতে চাইছে আজ। নিজের হাতের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে রহিমা। এখনো মায়াবতীর স্পর্শ লেগে আছে হাতটায়। মায়াবতী তার সবটুকু শক্তি দিয়ে ধরেছিলো এই হাতটা, আশ্রয় খুঁজেছিলো তার কাছে, ভরসা চেয়েছিলোরহিমাও ধরেই থাকতে চেয়েছিলো, ছাড়তে চায়নি মোটেও। কিন্তু চাইলেই ধরে রাখতে পারে এমন শক্তি বা ক্ষমতা রহিমার হাতের কোনদিনও ছিলো না।  

২.

গল্পটা গোড়াতে সুখেরই ছিলোরোদ ঝলমলে দিনের আর ছায়াঢাকা মাটির গল্প। মাথার সিঁথির মতো মেঠো পথ আর সবুজ শ্যামল গাঁয়ের গল্প। শ্যামল গাঁয়ের শ্যামলিমা দিয়ে গড়া কিশোরী মায়াবতী আর তার মা রহিমার গল্প। গাঁয়ের মেয়ে হিসেবে মায়াবতী নামটা একটু বেমানান ঠেকে বটে, কিন্তু পৃথিবীর সকল মায়া যেন বাসা বেঁধেছে মায়াবতীর দুটি চোখে। যতই বেমানান শোনাক, ওর চোখের দিকে তাকালে যে কারো এই নামটাই মনে আসবে। অন্য কোন নাম ওকে মানাবেই না। তাই ওকে আমরা মায়াবতী বলেই ডাকি।

মায়ের সাথে মায়াবতীর খুব ভাব। সব মেয়েরই থাকে, তবে মায়ের সাথে মায়াবতীর সখ্যতা একটু বেশি। মায়াবতীর একবার খুব অসুখ করেছিলো ছোটবেলায়, প্রায় মরে মরে অবস্থা। সেই থেকে মায়াবতীর প্রতি রহিমার টানটা একটু বেশি; আর মায়ের উপর মায়াবতীর নির্ভরতাও। সবকিছুতেই মায়াবতীর জন্য রহিমার বাড়তি সতর্কতামেয়েটাকে সে আগলে রাখে সবসময়। তাদের পরিবার তেমন অবস্থাপন্ন নয় যদিও, তবুও যতটা পারে চেষ্টা করে রহিমা।  

মায়াবতী কিন্তু মোটেও ডানপিটে নয়। বেশ শান্তশিষ্ট লক্ষীমন্ত মেয়ে। সে গাছে ওঠে না, গোল্লাছুট বা বউচির মতো দৌড়ঝাঁপের খেলা খেলে না। বেশিরভাগ সময় মায়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করে। মাকে বেশিক্ষণ না দেখে মায়াবতী থাকতেই পারে না। বাইরেও তেমন কোথাও যায় না সে। শুধু সকালে একবার স্কুলে যায়, ব্যাস এই পর্যন্তই। মাঝে মাঝে একমাত্র বান্ধবী জবা এলে পুতুল খেলে। পুতুল খেলতে মায়াবতী ভালোবাসে। রঙিন কাপড়ে মোড়ানো কাপড়ের পুতুলগুলো তার খুব প্রিয়। শক্ত একটা জুতার বাক্স তার পুতুলদের ঘর। সেখান থেকে ওদেরকে নামিয়ে খেলা শেষে আবার সাজিয়ে রাখে যত্ন করে।

মা রহিমা, বাবা রমিজ আর ছোটবোন ছায়াকে নিয়ে এইতো মায়াবতীর নিশ্চিন্ত সুখের জীবন।

৩.

সেই মায়াবতীর হঠাৎই বিয়ে হয়ে গেলো ধুমধাম করে। মায়াবতীর বাবার অতো আয়োজন করার সামর্থ্য নেই, তবু বিরাট আয়োজন হলো। সেই আয়োজনের বাড়াবাড়ি দেখে গ্রামের সবাই বললো, “বড় কপাল নিয়া আসছে তুমার মাইয়া রমিজ। মাইয়ার উছিলায় তুমার কপালও কেমুন খুইলা গেলো দেহো। এমুন বড় বাড়ীত মাইয়া বিয়া দেওনের কতা ভাবছনি কুনদিন? সবই আল্লাহর ইচ্ছা, বুঝলা মিয়া।”

রমিজ মনে মনে সেইটা স্বীকার করে নেয়। হ, আল্লাহ এইবার মুখ তুইলা চাইছে। নাইলে কাশেম নিজে এই বিয়ার প্রস্তাব নিয়া আসে! রমিজের মনে স্বস্তি আর আনন্দের অনুভুতি খেলা করে। কাশেম ভালো ছেলে। তারউপর মেম্বারের ছেলে, অবস্থাপন্ন ঘর। এই বিয়েটা দিয়ে সেওতো এইবার ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যেতে পারবে। বিয়াইয়ের ক্ষমতার গুনে তার দাপটও কী বাড়বে না? নিজে সারাটা জীবন সাধারণ বর্গাচাষী ছিলো, তাতে কী? ক্ষমতাবান বিয়াই তো পাবে এবার। এই জামানায় ক্ষমতা আর দাপট খুব দরকারী জিনিস, এটাতো বলদেও বোঝে। আর এইযে নতুন আত্মীয়তা হলো, সেই কারণে ছোটমেয়ে ছায়াকেও বিয়ে দিতে কত সুবিধা হবে তার। বুক ফুরিয়ে বলতে পারবে, মেম্বর সাব আমার বিয়াই লাগে। মায়াবতীকে এই বিয়েটা দিয়ে সবদিক থেকেই তার লাভ হলো।  

তাছাড়া মায়াবতীও কি কম সুখী হবে? টাকা পয়সার স্বচ্ছলতার মধ্যে থাকবে এইবার মেয়েটা। টাকা পয়সা না থাকলে কী আর সুখ হয়? এতোকিছুর পরও রমিজের মনটা যে একটু খুঁতখুঁত করে না তা না। মায়াবতীর বয়সটা একটু কম, এই যা একটু সমস্যা। ঠিক বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। মাত্র বারো পেরিয়ে তেরোতে পরেছে, হাতে পায়েও খুব একটা বাড়ন্ত নয়।

তাহোক, রমিজ খুঁতখুঁতানিটাকে পাত্তা দেয় না। সে জানে মেয়ে তার সুখেই থাকবে। একবার বিয়েটা হয়ে গেলে ঠিক সয়ে যাবে। রহিমারও তো এইরকম বয়সেই বিয়ে হয়েছিলো, দিব্যি টিকে আছে এখনো, তাহলে? খালি বিয়েটা রেজিস্ট্রি করার সময় একটু ঝামেলা হতে পারে এই যা দুশ্চিন্তাঅবশ্য কাজী সাহেবকে ম্যানেজ করা কাশেমের দায়িত্ব। কাশেম বলেছে এটা কোন ব্যাপারই না। বয়সটা একটু চুরি করতে হবে আরকি। কাজী সাহেবকে একটু খুশী করে দিলেই হবে। সব মিলিয়ে বিয়েটা দিতে পেরে বাবা মা হিসেবে তাদের ভলোই লাগে।

৪.

কাশেম নিজেই যখন প্রস্তাব নিয়ে আসে বিয়ের, রমিজ প্রথমে রাজী হতে চায় না। বলে, “এইটুকুন মাইয়ারে বিয়া দিতাম, কও কি তুমি কাশেম? মাইয়ার তো বিয়ার বয়সই হইসেনা অহনো।”

কাশেম অভদ্র বা বেয়াদপ নয়। হেসে বলে, “এইডা একটা কতা কইলাইন কাকা? মেয়েছেলের আবার বিয়ার বয়স কীতা? কাকীরে যখন বিয়া করছিলাইন তহন কাকীর বয়স কত আছিল?”

রমিজ একটু বিব্রত হয়ে বলে, “তবুও বাজান। অহনতো সময় বদলাইসে, দ্যাশে আইন কানুন আছে। তাছাড়া মাইয়াডাও ইশকুলে যায়। তুমার কাকী তো আর লেখাপড়া করছইন না।”

কাশেম: কাকা, মায়াবতী কিন্তুক ডাঙ্গরই হইসে, তারউপরে চেহারা ছবি ভালো। আপনে খেয়াল করছইন না মনে হয়, গেরামের ছ্যাড়াইনরা কুনজর দেয়। ইশকুলের রাস্তাত খাড়াইয়া থাহে। কুনদিন কুন দুর্ঘটনা গটায়ালবো, টেরও পাইতাইন না। তহন খালি কপাল চাপড়াইবাইন। বিয়া তো দূরের আলাপ, তারে নিয়া কই যাইবাইন, কার বাড়ীত লুকাইবাইন হেইডা খুঁইজা মইরবাইন। কেউ জায়গা দিতোনা তহন।

কথাটা যে একদম ফেলে দেয়ার মতো নয়, রমিজ সেটা বোঝে। তারও যে একদম দুশ্চিন্তা হয় না তাও নয়। তাই বলে এইটুকুন মেয়েকে বিয়ে দিতে তার মন সায় দিতে চায় না প্রথমে। আবার কাশেমের প্রস্তাব ফেলেও দিতে পারে না। বলে, আইচ্ছা, ভাইবা দেহি। আমরারে একটু সময় দেও বাজান।

কাশেম: অতো ভাবনের কী আছে বুঝতাম পারি না কাকা। আমি কি ছেলে খারাপ?

রমিজ: না না, সেই কতা না। তুমি খারাপ হইতা ক্যারে?

কাশেম: তাইলে, আপনের আপত্তিডা কুনহানো?

রমিজ: খালি তুমি কইলেই তো হইতো না বাজান। তুমার মা-বাপ আছে, তারার মতটাও তো জানন দরকার। তিনারা কি রাজী হবেন?

কাশেম: হুনইন কাকা, আমি তারার একমাত্র ছেলে। অবশ্যই রাজী হবে। আমি তারারে বুঝাইয়া কইলেই হবে। আপনে এইডা নিয়া দুশ্চিন্তা করইন না যে।

রমিজ: না, আমরার আর দুশ্চিন্তা কী। তুমরা বড়লুক মানুষ, তুমার বাপ গেরামের মেম্বর। এইডাতো আমরার লাগি সৌভাগ্যই। তুমি তুমার বাপ মারে নিয়া আইসো তাইলে বাজান। আমি তুমার কাকীর লগেও আলাপটা পারি। সে মাইয়ার মা, তারওতো মত নেওনের দরকার, কি কও?

৫.

সুখের গল্পটা এভাবেই একটা পরিণতি পেতে থাকে। কাশেমের পরিবারও খুব একটা আপত্তি করে না বিয়েতে। মায়াবতীরা তাদের তুলনায় সামাজিক প্রতিপত্তিতে কম হলেও মায়াবতীকে তাদের পছন্দই হয়। বিশেষ করে মায়াবতীর বয়সটা। এখনো কাঁচা, চোখ ফুটে নাই। শান্তশিষ্ট মেয়ে হিসেবে সুনাম আছে গ্রামে। একে মনের মতো করে গড়েপিঠে নেয়া যাবে। একটু বয়স বেড়ে গেলে বাগে আনা কঠিন হয়ে যায়।

তো, ধুমধাম করে বিয়েটা হয়েই যায় মায়াবতীর। বয়সের কারণে আটকায় না মোটেও। কাজী সাহেব পান চিবাতে চিবাতে বয়স আঠারো লিখে দেয় অবলীলায়। তারপর পেট ভরে খেয়ে, বকশীশ নিয়ে চলে যায়। মায়াবতীও খুশী মনে আনাড়ী হাতে লাল বেনারশী সামলাতে সামলাতে শ্বশুর বাড়ী রওনা হয়। নতুন শাড়ী, নতুন গয়নায় ওকে আরো মায়াবতী লাগে। গত মাসেই তার পুতুলমেয়ের বিয়ে দিয়েছে মায়াবতী, আর আজ তারই বিয়ে হয়ে গেলো! বিশ্বাসই হতে চায় না মায়াবতীর

পুতুল বিয়েতে কত মজা করেছে সে আর জবা মিলে। যদিও তার পুতুল মেয়েটা প্রিয় বান্ধবীর কাছে দিয়ে দেয়ার সময় তার একটু কষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু তাতে কি? সেতো প্রায়ই ওর পুতুল মেয়েকে দেখতে যায়। ওর বাবা মাও ওকে দেখতে যাবে। বেশি দুরে তো যাচ্ছে না। একই গ্রামের মধ্যে বিয়ে।

পাশের বাড়ীর রিতা ভাবী অবশ্য তাকে বলেছে, পুতুল বিয়ে আর সত্যিকারের বিয়ে নাকি এক নয়। আরো কী সব আবোল তাবোল কথা বলেছে। মায়াবতী তার কিছুটা বুঝেছে, কিছুটা বোঝে নি। সে রাগ করে বলেছে, যাও ভাবী, এইসব কিতা কও? দুর!

রিতা ভাবী হেসেই কুল পায় না। বলে, বুঝবিরে ছেড়ি, বুঝবি। বিয়াডাতো হোক, তহন ঠিক বুঝবি আমি কিতা কই।  

মায়াবতী রিতা ভাবীর কথা বোঝার চেষ্টা করেনি, তক্ষুনি ভুলে গেছে। তার কত কিছু চিন্তা করার আছে, বিশেষ করে পুতুলগুলো নিয়ে তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সেকি ওগুলো সাথে নিয়ে যাবে? নাকি ছায়াকে সবগুলো দিয়ে যাবে? নাহ্, ছায়াকেই দিয়ে যাবে। ওতো এখন বড়লোক হয়ে যাবে, নতুন নতুন দামী পুতুল কিনে নিতে পারবে। ওগুলো ছায়ার জন্যই সে রেখে যাবে তাহলে। আর তার মুরগীর নতুন ছানাগুলোর কি হবে? ছায়া কী ঠিকমতো দেখে রাখতে পারবে? ওতো খালি ছুটে বেড়ায়, বড় অস্থির। মোটেও মায়াবতীর মতো নয়। আর তার জানালার পাশে পেয়ারা গাছটায় যে একটা মৌচাক বড় হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে, সেটা কি তার বাবা কেটে ফেলবে? কতটা মধু হবে সেখানে? আর মৌমাছিগুলোই বা কোথায় যাবে তখন? আচ্ছা, বাবা তাকে ডাকবেতো তখন? এই কথাটা বাবাকে অবশ্যই বলে যেতে হবে, তাকে ছাড়া যেন মৌচাক না ভাঙ্গে। মাকেও বলে যাবে যেনো বাবাকে মনে করিয়ে দেয়।

ছোট্ট মাথাটায় এমনি আরো হাজারো চিন্তা নিয়ে মায়াবতী ঢুকে পড়ে এক নতুন জীবনে। যে জীবনের জন্য সে প্রস্তুত ছিলো না বা সেই জীবনটা তার জন্য।

৬.

মায়াবতীর নতুন জীবন কেমন হলো সেটা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে রহিমা। কখন আসবে মেয়েটা। সকাল থেকেই ভীষণ ব্যস্ত আছে সে, নানারকম রান্নার আয়োজন করছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বারবার বাড়ীতে ঢোকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছে মেয়েটা এলো কিনা। নতুন জামাই প্রথম আসবে আজ এই বাড়ীতে, মায়বতীর দিরাগমন। রহিমা আর রমিজের তাই ব্যস্ততার শেষ নেই। মাঝে একদিন মাত্র মেয়েটা কাছে নেই তাদের, তাতেই মনে হয় কতদিন দেখে না মেয়েটাকে। মায়াবতীকে ছাড়া ঘরগুলো খা খা করে তাদের। ওর বিছানা, কাপড়, পড়ার বই, পুতুলের বাক্স সবকিছুতে মায়াবতীর মায়া জড়ানো।

বেশি অপেক্ষা করতে হয় না তাদের, মায়াবতীকে নিয়ে কাশেম সকাল সকালই চলে আসে। রমিজ কাশেমের সাথে বাড়ীর দাওয়ায় আলাপ করতে বসে। রহিমা এই ফাঁকে মায়াবতীকে নিজের কাছে ডেকে নেয়, একটু আড়ালে। মেয়েটাকে একটু আদর করবে আর শ্বশুর বাড়ী সম্পর্কেও শুনবে। কেমন কাটলো তার ওই বাড়ীতে? আর মায়ের জন্য মন কাঁদে কিনা? এইসব হাবিজাবি।

মেয়েকে টেনে এনে কাছে বসায় রহিমা। মায়াবতী একটু আড়ষ্ট হয়ে থাকে। হাঁটার মাঝেও কেমন জড়তা।

রহিমা: এমুন শক্ত হইয়া আছো কেন গো মা? কেমুন আছো তুমি? মুখটা শুকনা ক্যান? ক্ষিদা লাগছে?

মায়াবতী মাথা নাড়ে। তার ক্ষুধা লাগেনি।

রহিমা: তুমার শাশুড়ী কেমুন লোক? তুমারে আদর করে নি?

মায়াবতী: হুম।

রহিমা: আর তুমার শ্বশুর আব্বা, ননদ তারা কেমুন?

মায়াবতী: হুম।

রহিমা: হুম কিগো মা? হুম কইলে কি কিছু বুঝা যায়? তুমার কুনো অসুবিধা হইতেছে না তো? কুনো অসুবিধা থাকলে আমারে কও মা, তুমার বাজান জামাই বাবাজিরে কইয়া দিবোনে।

মায়াবতী কোনো কথা বলে না। তার চোখেমুখে ভয়। শরীরে এক পৃথিবী আড়ষ্ঠতা আর অসহনীয় ব্যথা। এই ব্যথার কথা মাকে বলা যায় কীনা মায়াবতী বুঝতে পারে না। রিতা ভাবীর বলা সকল না বুঝতে পারা কথা সে একরাতেই বুঝতে পেরেছে। শুধু বোঝেনি তাকে এই কষ্ট দেয়ার জন্য এতো আয়োজন কেন? রিতা ভাবী তাকে এই কষ্টের কথা তো কিছু বলেনি, আদরের কথা বলেছিলো। কাশেমও একই কথা বলেছে তাকে। এ কেমন আদর মায়াবতী বুঝতে পারে না। একে যদি ‘আদর’ বলে তবে অত্যাচার কাকে বলে?  

রহিমার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নেয় যা বোঝার। মেয়ের অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকে। বলার মতো কথা খুঁজে পায় না।

মায়াবতীর চোখের মায়ারা কোথায় যেনো উধাও গয়ে গেছে। সেখানে একরাশ ভয় আর অস্বস্তি ভর করেছে। সে ফিসফিসিয়ে শুধু বললো, “মা, আমি আর ওই বাড়ীত যাইতাম চাই না।

রহিমা: সেইডা কেমুন কইরা হইবো মা? এমুন কতা কইয়ো না, জামাই হুনলে কী কইবো?

মায়াবতীর উত্তর দেয় না, শুধু চোখের পানি তার নতুন শাড়ী ভিজিয়ে দিতে থাকে। চোখ ভিজে ওঠে রহিমারও। মেয়েকে কাছে টেনে নিতে চায়, ব্যাথায় কঁকিয়ে ওঠে মায়াবতী। কুসুমের সারা শরীরে স্বামীর সোহাগের চিহ্ন, জায়গায় জায়গায় রক্তের জমে যাওয়া দাগ।

মায়াবতী: আমারে যাইতে দিও না মা, আমারে লুকায়া রাখো। তুমার কাছে, তুমরার কাছে আমারে রাইখা দেও।

রহিমা: তুমারে লুকায়া রাখি এই ক্ষমতা তো আমার নাই মা। তুমারে যে আমরা বিয়া দিছি। বিয়ার পর স্বামীর বাড়ীই নিজের বাড়ী, স্বামীর কথাই আইন হয় মাগো। তুমারে ধইরা রাখতাম পারি সেই খেমতা আল্লাহ আমরারে দিছইন না।  

রহিমার ডাক পড়ে। জামাইকে খেতে দিতে হবে এখন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়ের কাছ থেকে উঠে যায় সে। খাওয়ার সময় ডাক পড়ে মায়াবতীরও। রহিমা খেয়াল করে সহবাসের অত্যাচারে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও কষ্ট হয় মেয়েটার। হাঁটতে পারে না ঠিকমতো।

রাতে কান পেতে থাকে রহিমা। চোখ দুটো এক করতে পারে না একদম। মেয়েটা তার কাঁদছে, অস্ফুট স্বরে মাকেই ডাকছে সে। যেমন ডেকেছে সারাজীবন যে কোন ব্যাথায়, অসুখে। রহিমা দৌড়ে গেছে সবসময়, বুকে আগলে রেখেছে। কিন্তু আজ আর রহিমার মায়াবতীর কাছে যাওয়ার কোন উপায় নেই। মেয়ে বিয়ে দিলে মায়ের আর অধিকার থাকে না মেয়ের উপর। রহিমা আকুল হয়ে কাঁদে। হতবিহ্বল বসে থাকে রমিজও। কেউ কোন কথা বলে না।

নির্ঘুম রাত কাটিয়ে পরদিন মেয়ে বিদায়ের আয়োজন করতে থাকে রহিমা। মায়াবতীর চোখের দিকে তাকায় না একবারও। মায়াবতীও আর বলে না কিছু। শুধু বিদায় বেলা রহিমার রুক্ষ খসখসে হাতের মাঝে কিশোরী মায়াবতীর কোমল হাতটা ভরসা খুঁজে ফিরে আকুল হয়ে। দ্রুততম গতিতে চলতে থাকা মায়াবতীর হৃৎপিণ্ড হয়ে ওঠে হাতটাওই হাতটাই হয়ে উঠে মায়াবতীর চোখ, মুখ, পুরো অবয়বের প্রতিনিধি। ছোট্ট মেয়েটার সমস্ত অনুভূতি এসে ভীড় করে হাতে, মায়ের হাতটা আঁকড়ে ধরে থাকে শক্ত করে।

ক্রমশঃ মায়াবতীর হাতটা রহিমার হাত থেকে ছুটে যায় (কিংবা রহিমাই ছুটিয়ে দেয়)। মায়াবতী কিছু বলে না, একটি শব্দও না। মায়াবতী বুঝে গেছে কাশেমের সাথে যাওয়াই তার নিয়তি। সেটা আটকানোর ক্ষমতা তার বাবা মায়ের নেই। চলে যায় মায়াবতী, একা, অসহায়। তার জীবনটা আটকা পড়েছে বিয়ে নামক বাক্সে, অনেকটা তার পুতুল মেয়ের মতোই।

ক্ষমতাহীন, ব্যর্থ দুইটা হাত নিয়ে দাওয়ায় নির্বাক বসে থাকে রহিমা। রমিজ শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করে। বলে, শুন, আস্তে আস্তে সইয়া যাইবো। কত মাইয়ারই তো এই বয়সে বিয়া হয়। তারপর ইতস্ততঃ করে আবার বলে, মাইয়া বিয়া দিলে স্বামী তো একটু আদর সোহাগ করবোই। আটকাইবা কেমনে?

আটকানোর কথা রহিমাও ভাবে না। শুধু ভাবে কাশেম যদি একটু অপেক্ষা করতো, যদি সে কাশেমকে একবার বলতে পারতো, মাইয়াডা আমার অহনো তৈরি হয় নাই বাজান। ওরে একটু সময় দেওন যায় না!

রহিমার বলা হয় না কিছুই। শাশুড়ী হয়ে মেয়ের জামাইকে এসব বলা যায় না। ফাল্গুনের মাতাল করা সুখ সুখ ঘ্রাণ রহিমার অসহ্য লাগে, অভিশপ্ত মনে হয়।  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.