নারীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কি একান্তই নিজেদের?

ফারজানা আকসা জহুরা:

ফারজানা আকসা জহুরা

প্রায়ই শোনা যায়, মেয়েদের সন্ধ্যার পরে বাড়ির বাইরে যেতে হয় না। ভালো মেয়েরা বাইরে যায় না। আবার কোনো নারী ধর্ষিত হলেই তার পোশাক ও চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বর্তমান সময়ে এই ধরনের কথা শুনলে একটু হাসিই পায়।

আচ্ছা, আমরা কী এমন কোনো স্বর্গে বসবাস করছি, যেই স্বর্গে নারীভিত্তিক কোনো পরিবার নেই? যেই স্বর্গে নারীদের জীবন ধারণের জন্য কোনো চাকরিও করতে হয় না? বেঁচে থাকার জন্য তাদের কোনো অর্থেরও প্রয়োজন হয় না। যেই স্বর্গে নারীর কোনো সন্তান থাকে না!  না বাবা-মা, কিংবা অন্য কেউ থাকে! আর যদি থাকেও, তারা কেউ কখনো রাতে অসুস্থ হয় না বা অসুস্থ হলেও তার আশেপাশে পুরুষ সদস্য থাকেন! যিনি তাদের সাহায্যের জন্য সর্বদা প্রস্তুত? এমন স্বর্গ রাষ্ট্র কোথায় আছে, বলতে পারবেন কী?

প্রতিটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা দেওয়া। যেহেতু আমরা এমন একটা সভ্য রাষ্ট্রে বসবাস করি যে রাষ্ট্র  আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, আর তাই বাধ্য হয়েই আমাদের নিজেরাই সচেতনভাবে চলাফেরা করি, এটা আমাদের সচেতনতা। কিন্তু যখন আমাদের প্রয়োজন হবে রাত-দুপুরে বাড়ির বাইরে যাওয়ার, তখন? তখন আমরা আমাদের নিরাপত্তার জন্য কী করবো? কার কাছে যাবো?

অসুখ- বিসুখ চাকরি বা প্রয়োজন সবকিছু কি সময় ধরে আসে? যে দরিদ্র নারীটি কারখানায় কাজ করে নিজের পরিবার চালায়, সেই নারীটি কী নিরাপত্তার কারণে রাতে কাজ করবে না? আবার রাতে যারা কাজ করে, বা বাড়ির বাইরে যাবে, তারাই ধর্ষিত হবে, এটাই কি সঠিক?

যদি ভাবি রাতে ঔষধ কিনতে যাওয়া, অফিস শেষে বাজার করে বাড়ি ফেরা, কিংবা রাত দুপুরে হাসপাতালে যাওয়া ডাক্তার ডাকা কোনো কিছুই নারীর দরকার নেই। কারণ এতে তার ধর্ষণ হওয়ার ভয় আছে, তাই সে তার সকল প্রয়োজনের জন্য সকালের অপেক্ষা করবে, আর তা না হলে সে নিজের ও তার পরিজনের মৃত্যু অপেক্ষায় থাকবে? যাদের পরিবারে বাহিরের কাজ করে দেওয়ার মতো ১০/২০ টা পুরুষ মানুষ নাই , তাই তারা ঐ ভাবে মরবে! এটাই কী নারী হয়ে জন্ম নেয়ার আজন্ম পাপ ?

এমন বহু ঘটনা আছে, যেখানে নারীর সাথে অঘটনটি ঘটেছে দিনে দুপুরে কখনও বা সবার সামনে। কী করতে পেরেছে সমাজ? তখনও কিন্তু নারীর বাইরে যাওয়াকেই দোষারোপ করেছে সবাই। গত পহেলা বৈশাখে নারীদের শরীর থেকে শাড়ি খুলে ফেলা হলো। এবার হোলিতে করা হলো যৌন হয়রানি।

বলতে পারেন নারীর জন্য কোনো সময়টা নিরাপদ? নারী কি আজীবন ঘরের ভিতর বন্দী থাকবে? তারা কি বাইরে যেতে ইচ্ছে হতে পারবে না? তার কী অধিকার নেই কোন উৎসবে যোগদান করার? কিন্তু কেন?

আমরা যখন একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজে বসবাস করছি। যখন আমরা সব ধরনের আধুনিক সুবিধাও ভোগ করছি।তখন আমাদের অবশ্যই  নারীর সম-অধিকার স্বাধীনতা ও সুযোগ সুবিধা নিয়ে ভাবতে হবে এবং তাদের চলাফেরায় নিরাপত্তাও দিতে হবে। একজন নাগরিক হিসাবে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। হ্যাঁ যদি রাষ্ট্র’টি সভ্য হয়!

অনেকেই আছেন যারা নারীর সম-অধিকারের প্রশ্নে বলেন , নারী সম্মান আর অধিকার নাকি নারীদের নিজ হাতে , অন্যের কাছে চেয়ে কখনো কোনো সম্মান বা স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব না। নারীদের নিজ পায়ে দাড়াতে হবে ইত্যাদি ।

আচ্ছা আমরা যে এখন পড়াশোনা করতে পারছি, চাকরি করতে পারছি, কিংবা সন্তান জন্মদানের জন্য ডাক্তার দেখাতে পারছি, বলতে পারেন আমাদের পূর্বের নারীরা এই সুবিধাগুলি পেয়েছিলেন কিনা? নিজ পায়ে দাঁড়াতে গেলেও কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকতে হয়।

যুগে যুগে নারীরা যদি নিজেদের অধিকারের জন্য আন্দোলন না করতেন, যুগে যুগে তারা যদি অন্য নারীদের স্বাধীনতা ও সমঅধিকার নিয়ে আন্দোলন না করতেন, তাহলে কী আমরা পড়াশোনা করার সুযোগ পেতাম? না আমরা চাকরি করতে পারতাম? চোখ ফোটার আগেই আমাদের বিয়ে হয়ে যেত, আর এই বয়সে এসে আমাদের চার-পাঁচ’টা বাচ্চার মা হয়ে রান্নাঘরে থাকতে হতো। আমরা কেউ আধুনিকতার চেহারা দেখতাম না, না নারীদের সমঅধিকার নিয়ে কিছু লিখতে পারতাম।

আমরা যারা সুযোগ-সুবিধার স্বর্গে বসবাস করছি তারা কী অন্য নারীদের দুঃখ কষ্ট কিংবা তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে তামাশা করতে পারি? নারী সম-অধিকার, নারীর সম্মান শুধুমাত্র আপনার আমার একার ইস্যু না। আমি হয়তো জন্মগতভাবে সকল অধিকার পাচ্ছি, যেটা আমার পূর্ববর্তী নারীদের আন্দোলনের ফসল। কিন্তু এখনও অনেকে আছেন যারা আমাদের মতো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না। আর তাদের প্রতি আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা থেকে যায়। তাই নারীর সম-অধিকার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে আমরা কোনভাবেই হালকা করে দেখতে পারি না। না নিজেদের পাওয়া আর না পাওয়া দিয়ে বিচার বিবেচনা করতে পারি। নারীর সম-অধিকারের আন্দোলন একটি সামগ্রিক বিষয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.