‘আমার কোনো অপরাধবোধ নেই’…

0

ফারহানা আনন্দময়ী:

আত্মহত্যা। আবার আত্মহত্যা। গত সপ্তাহেই মিডিয়ায় দুজন নারীর আত্মহত্যার খবর পড়লাম। বানান করে পড়লে আত্মহত্যাই হয় ঘটনাটি, আসলে কিন্তু সেটা হত্যা। সুন্দর এই পৃথিবীটা কেউই সাধ করে ছেড়ে যেতে চায় না, তাকে একপ্রকার বাধ্য করা হয় ছেড়ে যেতে… আত্মহত্যার চাদরে মুড়িয়ে তাকে হত্যাই করা হয়।

আমরা বলি, তিনি আসলে খুব ভীতু, লড়াকু নন মোটেও, জীবনযুদ্ধ থেকে পালানোর জন্যে  আত্মহত্যা করলেন। আবার কখনো উল্টোটাও বলি, তিনি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী। জীবনটাকে তুচ্ছজ্ঞান করে জীবনকে বুড়ো আঙুল দ্যাখাতে এরকম কে-ই বা পারে। দেখুন, কী দ্বীধাহীনভাবে জীবনের মায়া ছেড়ে আত্মহত্যা করলেন! বিতর্কটা কিন্তু ভয় পাওয়া বা সাহস প্রদর্শন করা নিয়ে নয়, মূল কথাটা হলো, তিনি কি আত্মহত্যা করলেন, নাকি তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হলো? তাকে আসলে হত্যা করা হলো একপ্রকারে।

এদেশে মূলতঃ আত্মহত্যা করেন কারা? কোন নারীরা? কোন্‌ পরিস্থিতির শিকার হয়ে? প্রেমিকের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে বা মানসিক আঘাত পেয়ে, ধর্ষণের শিকার হয়ে সমাজের অমানবিক আচরণে অসহ্য হয়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিয়ে-পরবর্তী জীবনে স্বামী এবং স্বামীর পরিবারের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে নারীরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। এসব ক্ষেত্রে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী বা দৃশ্যমান হত্যাকারী হিসেবে প্রেমিক, ধর্ষক বা স্বামীকেই আমরা দেখতে পাই। কিন্তু আমি যদি বলি, এই সমাজে আত্মহত্যার ঘটনার শতকরা ৯০ভাগের জন্য সেই নারীর নিজ পরিবার এবং তার মা-বাবা সবচেয়ে বেশি দায়ী। খুব কি অন্যায় বলা হবে?

এই মা-বাবাই তো বেড়ে ওঠার বয়স থেকে কন্যাকে পখিপড়ার মতন ক’রে পড়াতে থাকেন, ‘কন্যা হলো পরের আমানত”, “মেয়েকে পেলে-পুষে বড় করছিই তো পরের বাড়ি পাঠানোর জন্য”, “স্বামীর ঘর তোমার পরম আশ্রয়, শেষ আশ্রয়। ভালো মেয়েরা স্বামীর ঘর ছাড়ে না, ভালো মেয়েদের লাশ বেরোয় স্বামীর ঘর থেকে”। অর্থাৎ যতভাবেই তুমি স্বামী দ্বারা নির্যাতিত হও না কেন, তা সে শারীরীক হোক, মানসিক হোক, সহ্য করে যাও। নির্যাতিত হতে হতে মরে যাও, আত্মহত্যা করো, কিংবা তোমাকে হত্যা করা হোক… বিয়ের পরে, মেয়ে, তোমার কোনো ভার আমরা আর নিতে প্রস্তুত নই।

এখানে খুব প্রাসঙ্গিক, সাম্প্রতিককালে টিভিতে দেখানো জুঁই নারিকেল তেল’এর বিজ্ঞাপনটা। দীঘল চুলের অধিকারী নারীটি স্বামীর শারীরীক নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে এসে পার্লারে চুল কেটে ‘বয়কাট’ করছেন, যেন স্বামী তার চুলের মুঠি ধ’রে আর পেটাতে না পারে। ভাবুন, নারীটি চুল কেটে ফেলছেন, অথচ ওই নির্যাতনের প্রতিবাদ করছেন না, নির্যাতক বর্বর স্বামীকে ত্যাগ করতে সাহস করছেন না, মা-বাবার কাছেও আশ্রয় নেয়ার কথা ভাবতে পারছেন না। অর্থাৎ নারীটির কোথাও জানা হয়ে গেছে, আমি অনন্যোপায়, আমি অসহায়, আমার সেই মগজের ধার কিংবা উপার্জনের জোর নেই, আমার নিজ পরিবারে আমার আশ্রয় হবে না… অতএব, চুলটাই মাথা থেকে বাদ দিই, তাতে যদি নির্যাতনের ধার কিছু কমে! আর এই বিজ্ঞাপন দেখে কতজনে হাহাকার করছেন, আহা-উহু করছেন।

বলুন তো,  কতজন মানুষ লজ্জিত হয়েছেন? কতজন পুরুষ? কতজন মা-বাবা আত্মগ্লানিতে ভুগেছেন? কতজন মা-বাবা?

মূল প্রসঙ্গে ফিরি, ওই যে বললাম, আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে নারীটির মা-বাবার কথা, সেটাই বাস্তবতা। এই সমাজে মধ্যবিত্ত বেশিরভাগ মা-বাবারা কন্যাকে সংসারে ভার মনে করেন। কোনোরকমে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু শিক্ষা দেয়ার দায় সেরেই তাকে বিয়ে দিয়ে ভারমুক্ত হতে চান। বিয়ে দিয়েছি তো এরপর থেকে তুমি তোমার নিজবাড়ির অতিথি হয়ে আসবে। সেখানে মেয়েটি যখন দুর্ভাগ্যক্রমে স্বামী বা স্বামীর পরিবার দ্বারা নির্যাতিত হয়, তীব্রভাবে অপমানিত হয়, প্রথমেই সে তার মা-বাবাকে জানায়। আর মা-বা কী করেন? কন্যার আহাজারি তারা আমলে নেন না, সে যে কোনো কারণেই হোক। বলতে থাকেন, “আরেকটু সহ্য কর, মেয়ে। সমাজের দিকে তাকিয়ে সংসারটা ভাঙিস না। সংসার কর, স্বামীর একটু-আধটু পেটানি সহ্য কর।“

ব্যস্‌, মেয়েটা বুঝে যান, সবচেয়ে পরম আশ্রয় যাকে সে জন্মাবধি জেনে এসেছে, সে-ই মা-বাবাই আর তার পাশে থাকতে চাইছেন না। কারো কারো জীবনে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একসময় আত্মহত্যা  অনিবার্য হয়। এখানে মূল প্ররোচনাকারী কে? ভাবুন, বলুন।

প্রেমে প্রতারণা, ধর্ষণ… সেখানেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সমাজ ওদের দিকে আঙুল তুলে কথা বলছে, আত্মীয়-স্বজন ওদেরকে বাঁকা মন্তব্য করছে, মা-বাবা তখন আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, মেয়ে, তুমি আমাদের জন্যে একটা বোঝা হয়ে উঠছো। একজন মনভাঙা নারী প্রেমিকের কাছ যতটা আঘাত পান, একজন ধর্ষিতা ধর্ষকের কাছে যতটা নিপীড়িত হন… আমার ধারণা, তারচেয়ে অনেকগুণ বেশি আহত হন তিনি তার নিজের মা-বাবার আচরণে। যেন নির্যাতিত হয়ে নিপীড়িত হয়ে মেয়েটিই অপরাধ করেছে। এই অপরাধবোধই তাকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। বিশ্বাস করুন, এ বড় আমানবিক! নেয়া যায় না, এক্কেবারে নেয়া যায় না।

অথচ এরকম কিন্তু হওয়ার কথা নয়। এরকম হতো না যদি আপনি মা-বাবা হয়ে নিজের কন্যাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথটা সুগম ক’রে দিতেন। কন্যাকে আত্মনির্ভরশীল ক’রে বড় করতেন, লেখাপড়াটা সার্টিফিকেটের জন্য নয়, ওর স্বনির্ভরতার কাজে লাগবে… এই ভাবনায় যদি তাকে পালন করতেন তাহলে স্বামী বা প্রেমিক দ্বারা নির্যাতিত হয়ে সে আপনার ঘরে বোঝা হয়ে দিন কাটাতো না। হ্যাঁ, হয়তো মানসিক কিছু সান্ত্বনা মা-বাবার কাছে চাইতো, তার বেশি একটুও নয়। কন্যাটি আত্মনির্ভরশীল হলে প্রতারিত হয়েও, নির্যাতিত হয়েও নিজের লড়াইটুকু অন্ততঃ জারী রাখতে পারতো। আপনারা মা-বাবারা তো সেও উপাওটাও রাখেন না। মেয়েগুলোর তখন হত্যা হয়ে যাওয়া  ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।  

এইসব মা-বাবার কাছে বিনীত অনুরোধ, নিজ সন্তানের হত্যাকারী হবেন না। আপনার কন্যাটি যখন পৃথিবীর শেষ আশ্রয় হিসেবে আপনাদেরকে পাশে চাইবে, দয়া ক’রে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। আপনার আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও অন্ততঃ মানসিক আশ্রয় দিন। আপনার কাঁধটি এগিয়ে দিন, মেয়েটি তার সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গায় মাথাটি রেখে কিছুক্ষণ কাঁদুক। মনের ভারটা নামাক। তারপর নির্ভার হয়ে পরবর্তী জীবনযুদ্ধের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করুক। মেয়েটা বাঁচুক।  

বিশ্বাস করুন, মা-বাবা হিসেবে আপনাদেরকে বেশি কিছু করতে হবে না। শুধু কন্যাকে স্বনির্ভর হওয়ার শিক্ষা দিন। মানসিকভাবে শক্ত থাকার শিক্ষা দিন। কন্যার জীবনের কঠিন সময়ে ছায়া দিন, স্নেহের হাতটি মাথায় রাখুন। একবার শুধু বলুন, আমরা আছি, তোমার ভালোয়, তোমার মন্দে আমরা আছি তোমার পাশে।  দমবন্ধ হয়ে আসা মানুষটাকে একবার প্রাণভরে শ্বাস নিতে দিন। দেখবেন আপনার কন্যা, আবার দৌড়ুচ্ছে, উড়ছে। ঘরের সিলিং খুঁজছে না আর, ও খোলা আকাশ স্পর্শ করতে চাইছে।

‘পরমা’ সিনেমাটি যারা দেখেছেন তারা জানবেন, সিনেমার শেষদৃশ্যে পরমা বলছেন, স্থির আর ঋজুকণ্ঠে, “অপরাধবোধ? আমার কোনো অপরাধবোধ নেই।”

কন্যাকে শুধু এইটুকু আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন। প্রতারণা, ধর্ষণ কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়ে নারীরা নিজেকেই যেন অপরাধী, প্রিয়জনের কাছে অবাঞ্চিত না বোধ করে। তাতে ওদের আবার বেঁচে ওঠাটা সহজ হবে, সুন্দর হবে।  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.