কেন নারীকেই আত্মহত্যা করতে হয়

নাসরীন রহমান:

অধ্যাপিকা জলি, মডেল সাবিরা, জ্যাকুলিন, মেধাবী ছাত্রী নাসরিন এর আত্মহত্যার পর তালিকায় সদ্য যে নামটি যুক্ত হলো, ‘শান্তা’। শিক্ষিত নারীদের মাঝে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ছে! আমরা আত্মহত্যার সংখ্যা দেখে যতটা উদ্বিগ্ন হই; প্রতিকারে কি ততটা উদ্যোগী?

তাসমিয়া শান্তা

সাধারণভাবে এটা ধারণা করা হয়, মানসিক রোগই আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে ব্যক্তিকে; কিন্তু এই বিষয়টি আলোচনায় তেমন আসে না যে, নারীদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি কেন? ‘শান্তার ‘ আত্মহত্যা বিষয়ক কোনও সুইসাইড নোট এর কথা যদিও এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি, বা ‘শান্তা’ এ জাতীয় নোট রেখে যাননি, কিন্তু তাঁর ফেসবুক পোস্ট থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা ভুল হবে না যে তিনি তীব্র মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন।

শান্তার ফেসবুক পোস্টে আত্মহত্যার কারণ নিয়ে কিছু স্পষ্ট লেখা না থাকলেও প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি যে মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন তা স্পষ্ট ; আমরা পাঠকেরা সেই কারণটিকে মুখ্য হিসেবে ধরে নিতে পারি যৌক্তিক অবস্থানে থেকে।

অধ্যাপিকা জলির আত্মহত্যার ঘটনার পর আমরা আশা করেছিলাম এটাই যেন হয় শেষ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, কিন্তু তারপরও আমাদের দেখতে হয়েছে মেধাবী ছাত্রী নাসরিন এর আত্মহত্যার খবর। এরপর মডেল জ্যাকুলিন, আর এখন যুক্ত হলো ,’শান্তা’ নামটি। কিন্তু কেন? নারীকেই কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে? নারীর আত্মহত্যা বিষয়ক আলোচনায় কেন নারীকেই আত্মহত্যা করতে হচ্ছে একের পর এক, সেই আলোচনাটাই এখন জরুরি।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর ব্রাক সেন্টারে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি আয়োজিত ‘ নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের ভূমিকা ‘ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে যে ডেটাবাইস প্রকাশ করা হয়, তাতে নারী নির্যাতনের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা এককথায় ভয়াবহ।

নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, নির্যাতন যে নারীকে আত্মহননের পথে টেনে নেয় তা অস্বীকার করার উপায় নেই; নারীর প্রতি এই নির্যাতন তা মানসিক, শারীরিক দুইভাবেই প্রযুক্ত হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে নারী বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ!

আত্মহত্যা নিয়ে গোটা বিশ্বে উদ্বেগ আছে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাবে ১৫-৪৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা৷ ডাব্লিউএইচও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতি বছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন৷ আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবেন কমপক্ষে ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ৷

বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘আত্মহত্যার দু’টি ধরন আছে – পরিকল্পিতভাবে এবং আবেগ তাড়িত হয়ে আত্মহত্যা৷ বাংলাদেশে অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা আবেগ তাড়িত হয়ে ঘটে৷ এ  কারণে তরুণ-তরুণীরাই বেশি আত্মহত্যা করেন৷ তাছাড়া নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার কারণ আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা৷ নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ইত্যাদি৷”

নাসরীন রহমান

আসলে যাঁরা আত্মহত্যা করেন তাঁদের ৯৫ ভাগই কোনো না-কোনো মানসিক রোগে ভোগেন৷ এই মানসিক বোগের সঠিক চিকৎসা করা গেলে আত্মহত্যা কমবে৷ এবং দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে যেহেতু নারীরাই বেশি আত্মহত্যা করেন তার কারণও স্পষ্ট সুতারং নারীর এই আত্মহত্যার প্রবণতা দূর করতে প্রথমেই দূর করতে হবে প্রচলিত কাঠামোগত বৈষম্য যা নারীর প্রতিকূলে।

নারীর আত্মহত্যার কারণ চিহ্নিত করতে যেয়ে অনেকে আবার ‘বায়োলজিক্যাল পার্থক্য’ কে অগ্রাধিকার দেন; কিন্তু ‘বায়োলজিক্যাল পার্থক্য’কে অগ্রাধিকার দিলে আমাদের এও মেনে নিতে হবে যা ঘটে তা তবে স্বাভাবিক? প্রকৃতি প্রদত্ত ?নারীর অধিকার বিষয়ক কথা বলতে যেয়েও অনেকে ‘ ‘বায়োলজিক্যাল ‘ প্রসঙ্গটি তুলেন;বলতে চান নারী কি পুরুষের কাজ করতে পারে, পারেন অতএব ‘পুরুষ’ সেরা!

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলী রীয়াজের বক্তব্য এখানে তুলে ধরতে পারি, তিনি এই প্রসঙ্গে তাঁর একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ”আপনি যদি বায়োলজিক্যাল পার্থক্যকে কারণ বলে মেনে নেন তাহলে আপনি এই যুক্তিকেই মেনে নেবেন যে নারী ‘পুরুষের’ কাজ করতে পারে না; ‘পুরুষের’ কাজ কোনটা? রাজনীতি করা? দেশ চালানো? সম্পদের মালিক হওয়া? তাঁর স্বার্থের অনুকূলে আইন তৈরি? আর বায়োলজিক্যল কারণ যদি চূড়ান্ত হয় তবে সব নারী আত্মহত্যা করছে না কেন? আবার অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নারীরা কেন বেশি আত্মহত্যা করে, মানসিকভাবে অসুস্থ হয়? কেন তুলনামূলকভাবে গ্রামীন নারীরা বেশি আত্মহত্যা করে?

ফলে যখন আপনি এই ‘বায়োলজিক্যাল’ যুক্তির আশ্রয় নিচ্ছেন তখন আপনি কাঠামোর পক্ষেই দাড়াচ্ছেন। তাঁর মানে কি পার্থক্য অস্বীকার করছি? না, তা করছি না। আপনার-আমার পার্থক্য আছে। কিন্ত সেটাকে যখন অসমতার পক্ষের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার হয় – কালো মানুষ, নারী, আদিবাসী সবই তখন ‘যুক্তিপূর্ণ’ মনে হবে। ‘ডিসিপ্লিন’ তৈরির জন্যে যে বাধ্য শরীর (ডসাইল বডি) দরকার তা তো গিডেন্স এবং ফুকো আমাদের ভালো করেই বোঝাতে পেরেছেন।

তাঁর উদাহরণ হচ্ছে – পুরুষ তাঁর শরীর নিয়ে কি করবে এই নিয়ে আইন নেই, কিন্তু নারী গর্ভপাত করাতে পারবে কিনা সেই নিয়ে আইনের অভাব নেই; দেখুন নারী কি পরবে সেটা নিয়ে রাষ্ট্রের মাথাব্যথার শেষ নেই – ‘সেক্যুলারিস্ট’রা বুরকিনি নিষিদ্ধ করে, ইসলামিস্টরা করে বিকিনি/সুইম স্যুট। তাঁর জন্যে আইন, ধর্মের দোহাইয়ের শেষ দেখি না’।

নারীর আত্মহত্যার কারণ বিষয়ে যত তর্ক- বিতর্ক থাক না কেন এটাই বাস্তবতা যে আমাদের এই বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক; শুধু পুরুষতান্ত্রিক বললে কম বলা হবে, প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক। আর এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর কারণেই নারীর উপর প্রযুক্ত হচ্ছে পুরুষের আধিপত্য; যে আধিপত্য প্রায়শই ‘মানসিক নির্যাতনের’ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে; দিনের পর দিন মানসিকভাবে নির্যাতিত নারীরাই বিষণ্ণতায় ভুগতেভুগতে একসময় বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ!

কলাম লেখক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.