আত্মহত্যা করতে চাওয়া মানুষকে নিয়ে বিদ্রুপ নয়

অনামিকা রুমি:
ফেইসবুকের হোম পেজে একজনার একটা স্ট্যাটাসে নজর পড়লো, সেখানে তিনি গায়ে আগুন লাগিয়ে সুইসাইড করার কথা লিখেছেন। স্ট্যাটাসটা যতটা না ভয়াবহ, তার থেকেও ভয়াবহ হচ্ছে ওইখানে করা কিছু মন্তব্য। একজন লিখেছেন “এইটাই আপনার করা উচিত”। আরেকজন আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে লিখেছেন “দারুণ আইডিয়া।তো শুভ(!) কাজটি কবে সম্পন্ন করছেন?”
আরেকজন অতি উৎসাহিত হয়ে সুইসাইড করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিটিকে হেল্প করতে কেরোসিন তেল লাগাবে কিনা জানতে চাইলেন। একজনের মন্তব্যে দেখলাম  আর কী কী উপায়ে কত সহজে সুইসাইড করা যায় তার পদ্ধতিগুলো লিখে দিলেন। কমেন্ট দেখে মনে হলো, সেই ব্যক্তিটি নিজে একজন সুইসাইড বিশেষজ্ঞ। আমার দেখা পর্যন্ত শেষ কমেন্টটা ছিল “প্লিজ, গো এহেড”।
অনামিকা দেব রায়

এই লেখাগুলো দেখার পর থেকেই কোনো কিছুতে মন বসছে না। ভাবছি, আমাদের মন মানসিকতা কতটুকু বিকৃত হলে একজন মেন্টালি আনস্টেবল একজন মানুষকে এইভাবে টিটকারি দিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে পারি? ভাবটা এমন”যা পারলে মরে দেখা”। আমরা বুঝি না কিংবা বোধ করি বুঝতে চাই না যে, আমাদের  কাছে যেটা নিছক ই ‘মজা’ করা , সেটাই অন্য কারও জীবন নেওয়ার কারন হতে পারে।

সোস্যাল মিডিয়াতে নানা বয়সের লোকজন আছে,ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার মানুষ আছে।সবাই মেন্টালি স্ট্রং হয় না।ওই পোস্টের কমেন্টগুলো পড়ে আমি নিজেও আরও কত সহজ সহজ উপায়ে সুইসাইড করা যায় সে ব্যাপারে ব্যাপক জ্ঞান আহরণ করেছি।আমার মত আরও অনেকে পড়েছে এবং জেনেছে।আপনি কি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবেন,কোন এক অসতর্ক মূহুর্তে প্রচন্ড কষ্টের সময় কেউ আপনার দেওয়া কোন পদ্ধতির চেষ্টা করবে না? তার দায় কি তখন আপনি এড়াতে পারবেন? 
আপনার কাছে যা ফাজলামি আর ন্যাকামি লাগে সেই ব্যক্তির কাছে হয়ত সেটাই তার জীবন মরন সমস্যা।অনেক আগে পত্রিকাতে একটা নিউজ পড়েছিলাম।খুব সম্ভবত অস্ট্রেলীয়া অথবা কানাডার ঘটনা। এক মহিলাকে গ্রেফতার করা হয় ফেইসবুক ইনবক্সে একজনকে সুইসাইডে উৎসাহিত  করার জন্যে।চারপাশে যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে আমাদেরও এটা নিয়ে ভাবা উচিত।মনের ইচ্ছে মত যেখানে খুশি যা ইচ্ছে লেখা থেকে বিরত থাকা উচিত। 
আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি, যারা এভাবে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে লেখেন যে তিনি সুইসাইড করতে চান, সেই ব্যক্তিটি আসলে মরতে চায় না। সে চায় তার এই কষ্টগুলো তার প্রিয় মানুষগুলো দেখুক, কেউ বলুক “আমি পাশে আছি, চিন্তা নাই”।হয়ত তার কষ্টের কথা কাছের কোন মানুষের সাথে শেয়ার করতে না পেরে ভার্চুয়াল এই দুনিয়াতে অচেনা মানুষের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে চায়। তার মনের কোথাও না কোথাও একটা ক্ষীণ আশা থাকে, কেউ না কেউ বলবে “তোমার এই পৃথিবীতে থাকা না থাকাটা আসলেই মেটার করে, এই পৃথিবীতে তুমি আসলেই স্পেশাল “। তার মনের এই ক্ষীণ আশাটা যদি বাঁচিয়ে রাখতে না পারেন, ঠিক আছে, কিন্তু দয়া করে এইভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা লিখে অন্যের কষ্ট নিয়ে হাসিতামাশা করে এই ক্ষীণ আশাটুকু নিভিয়ে দিবেন না।
এই পৃথিবীতে এমন অনেকেই আছেন যারা ইমোশন সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। কষ্টগুলো মনের মধ্যে চেপে রেখে হাসিমুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ান। আপনার চারপাশেই আছে, আপনি হয়তো নিজেই জানেন না। মাঝে মাঝে যখন আমরা শুনি আমাদেরই আশেপাশের সদা হাসি খুশি থাকা কেউ একজন এই মারাত্মক ভুল কাজটা করে আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যায়, তখন কি অনুশোচনা হয় না কেন আগে থেকে তার একটু খোঁজ নেওয়া হয়নি? অভিমান হয় না, কেন সে কাউকে কিছু বলেনি? কেন তার কষ্ট গুলো শেয়ার না করে এইভাবে চলে গেল? 
কারো ভাল করতে চান না সেটা আপনার ব্যাপার, দয়া করে কারো ক্ষতির কারণ হবেন না। একজন মানুষের কষ্টে তার পাশে দাঁড়াতে না পারেন,তাকে সান্ত্বনা দিতে না পারেন,সাহস দিতে না পারেন, তবে তার কষ্ট নিয়ে মজা করার কোন অধিকার আপনার নেই। শুধু কথা বলাটা শিখলেই হয় না,কোথায় কোন কথা বলা যায় না সেটাও জানতে হয়। কাউকে দুইটা ভাল কথা বলতে কোন টাকার খরচ করতে হয় না, দরকার শুধু একটু মানবিকতার। এই মানবিকতাটুকু যদি আপনার মধ্যে না থাকে, কারো কষ্ট যদি শেয়ার করে নিতে না পারেন তাহলে অন্তত সেই কষ্ট বাড়িয়ে দিবেন না। আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার কাজটা এইবার অন্তত বন্ধ করুন। 
খুব ইমোশনাল কোন মানুষ যদি তাদের কষ্টগুলো আপনার সাথে শেয়ার করে অথবা কারো আবেগের দুর্বলতম মুহূর্তের প্রকাশ যদি আপনার সামনে ঘটেই যায় তাহলে আপনি তার কষ্টের ভাগিদার হতে না চাইলে এড়িয়ে যান তাও ভালো  কিন্তু দোয়া করে  সেটা নিয়ে মজা করবেন না। তাকে বিদ্রুপাত্মক কথা বলে চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দেবেন না। তার ইমোশনের সম্মান করতে না পারেন,নিদেনপক্ষে, অসম্মান করা থেকে বিরত থাকুন। 
চলুন না মরতে চাওয়া মানুষগুলোকে জীবনের আহবান দেই আমরা , নতুন করে বাঁচার আশা যোগাই। এই ইট-পাথরের হৃদয়হীন পৃথিবীতে চলুন না আমরা হয়ে উঠি এক একজন হৃদয়বান মানুষ। 
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.