আত্মহত্যা মানে মুক্তি নয়, শান্তা!

ফাহমি ইলা:

আবারও একটি আত্মহত্যা! আবারও মরে গিয়ে বাঁচতে চেয়েছে একজন মানুষ! একজন মানুষ কখন ঠিক কী কী কারণে আত্মহত্যা করতে চাইতে পারে? শান্তাদের আমার ‘খুব কাছের অথচ কত দূরের’ মানুষ মনে হয়।

ফাহমি ইলা

বছর চারেক আগে এই আমিও (বর্তমান আমি নই, অতীত আমি) মরে গিয়ে মুক্তি চেয়েছিলাম জীবনের কাছ থেকে। আমার বর্তমান কাছের মানুষ যারা আমায় চেনেন, তারা আঁতকে উঠে বলতে পারেন- ‘ইলা, তুমি!!’ হ্যাঁ,  আমি, মরে গিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কী ভীষণ একাকি, হতাশ, অপমানিত একজন ‘আমিসত্ত্বা’ মরে যেতে চায়, সেটা সুস্থ মানুষেরা বুঝতে পারবেন না! কারণ আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হওয়া একটি মানসিক সমস্যা বা রোগ। সেদিন মরে গেলে আজ হয়তো শান্তাদের জন্য কি-বোর্ডে শব্দের ঝড় তুলতে পারতাম না। অনেকের মতো আমি কিন্তু সেই স্মৃতি ভুলে যেতে চাই না, কারণ সেই স্মৃতি আজো বেঁচে থাকার জন্য মুখের চোয়াল শক্ত করে আমাকে সামনে চলতে উৎসাহিত করে।

শান্তারা মরে গিয়ে কি আসলেই বেঁচে যায়? নাকি জীবনের কাছে, এ সমাজের কাছে আর কিছুই পাবার নেই ভেবে তারা মরে যায়? নাকি তারা বাঁচার মত বাঁচতে পারবে না বলে মরে যায়? নাকি তারা একগাদা বিশেষণে বিশেষায়িত হতে চায় না বলে মরে যায়? নাকি তারা অভিমানী আত্মা হয়ে সেই মানুষগুলোর আশপাশেই থাকতে চায় যারা তাদের সাথে প্রতারণা করেছিলো, দূরে ঠেলে দিয়েছিলো?

শান্তার জন্য এ লেখা লিখতে বসেছি। নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া সেদিনের ঘটনা আজ বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সেদিন আমি নিপাট ভালো মানুষের মত সারাদিন ঘুরেছি ক্যাম্পাসে, হাসিমুখে খাওয়া-দাওয়া করেছি আর ভেতরে ভেতরে ভয়ানক মৃত্যু পরিকল্পনা চেপে রেখেছি, কাউকে টের পেতে দেইনি। শান্তাও কি তাই করেছিলো? সে কি অনেকদিন ধরেই মরে যেতে চাইছিলো? অনেকদিন ধরেই কি সে মৃত্যুর ছক তৈরি করছিলো? আমি সেদিন মাঝরাতে পুরানো ডায়েরিগুলো, ছবিগুলো কিছুক্ষণ ঘেঁটে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত মুখে আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করি। পরবর্তীতে বন্ধুরা খবর পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায় বলে সে যাত্রায় বেঁচে যাই , আরো ভালো করে বললে আত্মহত্যা নামক খুনি শব্দটার হাত থেকে আজীবনের জন্য বেঁচে যাই।

আমি জানি, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতে ওই পথে চেতনে হোক বা অবচেতনে হোক আমাকে আর হাঁটানো সম্ভব না। সেসময় আমার প্রাণপ্রিয় শিক্ষক আমার কাউন্সেলিং করান, বন্ধুরা পাশে ছিলো সবসময়, মা ছিলেন সবচেয়ে বড় বন্ধু। কিছুটা সময় যাবার পর আমি আস্তে আস্তে বাস্তব দুনিয়ায় আসতে থাকি, যে দুনিয়ায় প্রাণ আছে, ভালোবাসা আছে, বেঁচে থাকার একশ একটা কারণ আছে! কিন্তু যখন আমি আত্মহত্যার বেড়াজালে মোহগ্রস্ত ছিলাম, তখন এসব আমাকে বোঝানো যায়নি, কাউকেই বোঝানো যায় না আসলে।

‘আত্মহত্যা কী? আত্মহত্যা হচ্ছে একজন মানুষ কর্তৃক স্বেচ্ছামৃত্যু বা বলা যায় স্বেচ্ছায় প্রাণ নাশ করা। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা বলছে- প্রতিবছর যেসব কারণে সারাবিশ্বে মানুষের মৃত্যু ঘটে, আত্মহত্যা তার মধ্যে দশম প্রধান কারণ। কিশোর-কিশোরী এবং যাদের বয়স পঁয়ত্রিশের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা।

বলা হচ্ছে- মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭% থেকে ৯৮% আত্মহত্যা সংঘটিত হয়। এছাড়াও, আত্মহত্যাজনিত ঝুঁকির মধ্যে অন্যান্য কারণও আছে। যেমন – নেশায় আসক্তি, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া, মানসিক আঘাত অথবা অতীতের মাথায় আঘাত অন্যতম প্রধান উপাদান।

আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা, গৃহহীনতার মত বিষয়গুলো আত্মহত্যায় উৎসাহিত করে থাকে। যদিও দারিদ্র্যতা সরাসরি আত্মহত্যার সাথে জড়িত নয় কিন্তু, এটি বৃদ্ধির ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগের ফলে একটা পর্যায়ে গিয়ে ব্যক্তি  আত্মহত্যার প্রবণতার চরমস্তরে অবস্থান করে। এছাড়া শৈশবের নেতিবাচক স্মৃতি, মানসিক শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতন, মাত্রাতিরিক্ত মানসিক অবসাদ অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত হওয়া প্রভৃতি কারণও আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিবেচিত।‘

এইসব বইয়ের ভাষা দিয়ে হয়তো আত্মহত্যার কারণ জানা যায়, মুক্তিলাভের উপায় জানা যায় কিন্তু শান্তাদের যে তীব্র মানসিক কষ্ট যে কষ্ট তাকে আত্মহত্যার দিকে তাড়িত করেছে সেটা বোঝা যায় না। অনেকেই হয়তো বড় বড় গালভরা কথা বলছেন- ‘আত্মহত্যা করবে কেনো, নিজের প্রতি ভালোবাসা নেই?’ ‘আত্মহত্যা করে কাপুরুষেরা!’, ‘আত্মহত্যা করবার মত অবস্থা পর্যন্ত গেলো কেনো?’ আপনাদের কাছে অনুরোধ, প্রশ্ন আর নিন্দার ঝুড়ি নিয়ে না বসে একটু ভাবুন, একটু উপলব্ধি করবার চেষ্টা করুন।

সমাজের মানুষ ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী, লিঙ্গ দ্বারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। একেকজনের বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট, অভিজ্ঞতা একেকরকম। নিজেকে দিয়ে যাচাই না করে যৌক্তিক মানুষের মত কারণগুলো বের করার চেষ্টা করলেই বোঝা যাবে শান্তারা কেনো মরে যায়। আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত একজন সুস্থ মানুষ কখনোই নিতে পারে না। ভালো ভাবে বললে, মানসিকভাবে চরম ভারসম্যহীন না হলে কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

আমাদের দেশে মানসিক অসুস্থতাকে এখনো পাগলের উপসর্গ হিসেবে দেখা হয়। একজন মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কিংবা ধর্মীয় যেকোন কারনেই মানসিকভাবে অসুস্থ হতে পারে। কিন্তু এজন্য তারা চিকিৎসা নিতে চান না পাছে মানুষ হাসাহাসি করে, পাগল ভাবে। একজন মানুষ যখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয় তখন সে বা তার আশপাশের মানুষ এটাকে গুরুত্ব দেয় না এবং দিলেও প্রকাশ না করে চেপে যায় স্টিগমাটাইজ হবার ভয়ে। অথচ সে সময় চিকিৎসার পাশাপাশি বন্ধুবৎসল মানুষের প্রয়োজন হয় যারা তাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দেবে, ভালোবাসবে, বোঝাবে। শান্তারা এত এত মানুষের ভীড়ে তেমন কাউকে পায়নি বলেই কি আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে? শান্তাদের মৃত্যু কি আমাদের কোনভাবে অপরাধী করে না?

আপনার আশপাশে অবসাদগ্রস্ত মানুষগুলোর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিন। বাবা,মা, ভাই, বোন কিংবা বন্ধুরা পাশে থাকুন, তাঁকে বুঝতে চেষ্টা করুন, বোঝাতে চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষটির সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন সঙ্গ।

শান্তারা ভালো থাকুক সকল মানসিক অবসাদ, কষ্ট, অভিমান কাটিয়ে; নিজেকে ভালোবাসুক সবার আগে। প্রতিটি শান্তাকে বলতে চাই- ‘মরে যাওয়া মানে মুক্তি নয়। তুমি বেঁচে থাকো তোমার স্বপ্নে, তুমি বেঁচে থাকো তোমার কর্মে, তোমার চেতনায়। এ পৃথিবীকে এখনো তোমার অনেককিছু দেবার আছে।’

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.