সময়ের প্রয়োজনেই লড়ছি আমরা

মুমিতুল মিম্মা:

বহুবার ইচ্ছে হয়েছে মরে যাই। বহুবার দোতলা বিআরটিসি বাসের চাকা দেখে চকচকে চোখে তাকিয়েছিলাম যদি মাথাটা গুড়িয়ে দিতে পারতো বাসটা আমার, যদি মুহূর্তে চলে যেতে পারি সবটা ছেড়ে! যাওয়া হয়নি, গুড়িয়ে যাওয়া হয়নি। কেন? বলছি সেটা –

২০১৩ থেকে জীবনটা অন্যরকম হওয়া শুরু। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার যন্ত্রণা ছাপিয়ে ভর্তি হলাম শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনে আছে মা যেদিন পোস্ট অপারেটিভ রুম এর বদলে আই সি ইউ তে গেল সেদিন আমার এগ্রিকালচারাল বোটানি পরীক্ষা ছিল।

মুমিতুল মিম্মা

৪টায় পরীক্ষার শুরু হবে, আমি ফোন দিচ্ছিলাম কেউ ফোন ধরছিল না। প্রিয়তিকে বললাম, “প্রিতুষ কেউ ফোন ধরে না!” ও বলল, “সমস্যা নেই, চল পরীক্ষা দিয়ে আসি!” আমি হলে পৌঁছানোর পরে ৩টা ৫০ এ ফোন আসলো মা আইসিইউ’তে। আমি কেমন যেন বোধশূন্য হয়ে গেলাম। কাঁদতে কাঁদতে মাঈনকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আমার না খারাপ লাগছে না, কাঁদছি কারণ আমার কেন খারাপ লাগছে না বুঝে উঠতে পারছি না” মাঈন অভয় দিল সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি জীবনে প্রথম বেকায়দা ধাক্কা খেলাম।

প্রথমবারের মতো জীবনে মনে হলো আমার এই মহিলাটা ছাড়া যাবার কোনো জায়গা নেই। অনেক ধকলের পরে মায়ের জ্ঞান ফিরলো। বিল আসলো বিশাল অংকের। অনেক কাছের মানুষ ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেই দায় সেরেছিলেন। কিন্তু অনেক দূরের মানুষদের দেখা গিয়েছিল আমার আর আমার ছোট ভাইয়ের মাথার উপরে ছায়া হয়ে দাঁড়াতে। আত্মীয় শব্দের প্রকৃত অর্থ প্রথম আবিষ্কার করি আমি – আত্মার সাথে সম্পর্কিত যে সেই আত্মীয়। আত্মীয় হতে হলে রক্তের সম্পর্ক হতেই হবে এর কোন মানে নেই।

আমার পিতা বরাবরের মতই বিপদে পালানো মানুষ। মায়ের জ্ঞান ফিরে বাসায় আসা পর্যন্ত ফোন দিয়ে খবর নেয়া ছাড়া তার কোনো কাজ ছিল না। টাকা দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। এর পরের ইতিহাস আমার উদয়াস্ত পরিশ্রমের ইতিহাস। পাগলের মতো টাকা খুঁজে গেছি আমি। টাকা দিয়ে টেনে আনা পৃথিবী আমাকে তখন এতোটাই ক্লান্ত করে ফেলেছিল যে মাঝে মাঝ প্রচণ্ডভাবে মনে হতো মরে যাই। রাত আড়াইটা অবধি টিউশনি করিয়ে আমার প্রচণ্ড কান্না পেত তখন। মাঈনকে ফোন করে পাগলের মতো কাঁদতাম শুধু। বেচারা তার সাধের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে আমার কান্না শুনতো।

প্রচণ্ড ভারী আমাকে একটা সময় টেনে নিতে না পেরে বেচারা নিজেই সবটা ছেড়ে চলে গেল। তখন আমার অবস্থা কেবলই স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা জন্ম দেয়া মায়ের মতো – ক্লান্ত বিধ্বস্ত। কোনমতে একটু স্থিতিশীল অবস্থায় এসে পৌঁছেছিলাম, মাঈনের অনুপস্থিতি সবটা গুড়িয়ে দিয়ে গেল। সবটা।

পরীক্ষার ফলাফলে সবসময়ে প্রথম সারিতে থাকা আমি ফেইল করা শুরু করলাম। কফি খেতে খেতে আমি আধ পাগল হয়ে গেলাম। দিনে প্রায় ৬-৭ মগ কফির ক্যাফেইন ডোজ আমাকে অসুস্থ বানিয়ে ফেললো পুরো। সারাদিন কাঁদতে কাঁদতে হিক্কা উঠে যাচ্ছে কফি খেতে খেতে। আমি কোথাও তখন মাঈনকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ফেসবুক, স্কাইপ ফোন সবখানে ব্লক করে সে আমার বেঁচে থাকার রসদ প্রায় ফুরিয়ে এনেছিল। আমি শুধু ভাবতাম এই দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে ঘুম ভেঙ্গেই দেখবো সে আমার মাথার কাছে বসে আছে। সবাই পরিবর্তন হতে পারে, মাঈন হবে কেন?

এতো ভরসার জায়গা সে আমার ছিল যে আমি কোনভাবেই মানিয়ে নিতে পারছিলাম না যে, মাঈন আমার দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যেতে পারে। একই ক্যাম্পাসে পড়া আমি চাইলে ওর ক্লাসে গিয়ে খুঁজে বের করতে পারতাম, চাইলে ওকে দেখা করাতে পারতাম জোর করে। কিছুই করিনি। এতোটা নিচে নামতে ইচ্ছে হয়নি। গত সেমিস্টারের খাতা খুঁজে বের করেছিলাম। দেখলাম পাতার পর পাতা ভরে আছে ওকে লেখা চিঠিতে। চিঠিগুলোর ভাষা পড়ে আমার মনে হলো মানুষ এতোটাও পারে কষ্ট পেতে? ল্যাপটপে একট ফোল্ডার আছে ওর জন্যে চিঠি দিয়ে ভরা – ‘প্রেমিকজনের চিঠি’। সেখানে ৪৮টা চিঠি আছে! কষ্ট এখনও লাগে, তবে যুদ্ধটা তো নিজের সাথে। রাত হলেই কেবল মনে হয় তার সাথে কাটানো অফুরন্ত ভালোবাসায় ভরা রাতের কথা। রাত জেগে জেগে থাকা সবদিনে আমার পোষায় না। ছাত্র পড়াতে হয় দিনে। ক্লান্ত থাকলে তখন চলে না। নির্মোহ সত্য হলো – পেটের দায় কখনও হৃদয় নেয় না।  

সে আমার সাথে নেই মানে এই নয় আমার সাথে তার কাটানো দিনগুলো মিথ্যে, আমার সাথে তার ভালোবাসা মিথ্যে! এই বোধটা  আসবে ততই মঙ্গল।

সে অন্য কারও সাথে যদি ভালো থাকে এটা তার ব্যাপার। আমার জায়গা তাই বলে মিথ্যে হয়ে যায় না। কিছুদিন আগেও ওর কপালে অন্য কেউ চুমু খাবে চিন্তা করেই আমার জ্বর এসেছিল। যতবার ভাবি ওর সাথে কাটানো দিনগুলোর কথা শুধু প্রজাপতির মতো উড়তে ইচ্ছে হয়। তবু দিন শেষে সত্য এটাই যে – সে নেই, সে আসবে না। ওর বন্ধু মিনহাজ আমানের উপর আমার খুব হিংসে হয়। মাঈন বেচারাকে যে কী ভালোবাসে! মাঝে মাঝে এখনও মনে হয়, ওর ভালোবাসা পাওয়ার লোভেই শুধু পরের জন্মে আমি ‘মিনহাজ আমান’ হবো।    

পাগলের মত কফি খেয়ে কষ্ট ভুলতে চাওয়া আমি তখন রাত জেগে রক্ত জোগাড় করে দিতাম মানুষের জন্যে। গর্ভবতী মায়ের জন্যে,অথবা দুর্ঘটনায় পড়ে কারও রক্ত লাগবে, সেটা হোক ঢাকা কিংবা সিলেট আমি জোগাড় করে ফেলতাম ল্যাপটপের সামনে বসেই। রাত জেগে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া মেয়েদের সাথে সময় কাটাতাম তাদের কথা শুনে শুনে। তাদের মধ্যে অনেকেই শক্তি পেত আমার সাথে কথা বলে।

সেদিন হঠাৎ কী মনে করে মুক্তা নামের একজনকে নক করে জানলাম ভেঙ্গে পড়া তিনি এখন উঠে দাঁড়িয়ে আরও মেয়েদের উঠে দাঁড়ানোর ইতোমধ্যে পাঁচ পাঁচটি অঞ্চলে তার ট্রেনিং দেয়া শেষ। শুধু তাই-ই না, নিজে একটা রান্নার ট্রেনিং সেন্টার খুলেছেন মেয়েদের জন্যে। তার হাসিমুখ দেখে মনে হলো হাসিটা আমার জন্যেই। হাসিটা আমার কষ্টের উপহার।

শতবার মানুষ মরে শতবার শতভাবে বেঁচে ওঠার জন্যে। বিচ্ছেদ মানুষকে শুধু কষ্ট দেয়, এই বিষয়টা তাই আমি মেনে নিতে রাজি নই। বিচ্ছেদ মানুষকে আরও ভালোবাসতেও শেখায়, নয়তো অচেনা এই মুক্তাকে আমি রাত জেগে উৎসাহ দিতাম কেন? শুধু সময় কাটানোর জন্যেই? নাকি ভালবাসতে চাইতাম বলেও?
 
আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। কতবার ইচ্ছে হয়েছে মরে যাই মাঈনের অবর্তমানে। এখনও আমাকে টানে ডবল ডেকারের চাকার চকচকে মৃত্যু। পারিনি মায়ের জন্যে। আমি মরে গেলে আমার মা-টা না খেয়ে থাকবে। আমার মৃত্যু তবু মেনে নেয়া যায় – মায়ের না খেয়ে থাকা, ছেলেটার (ছোট ভাইয়ের) সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠা রঙিন দিনগুলো মাটি করে দেয়া যায় না। তাই আর মরে যাওয়া হয়নি!
আর এখন? আর মরতে ইচ্ছে হয় না, যাক না জীবন যাচ্ছে যখন …

জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজনে’ ছোট গল্পটা পড়ে আমার একটা অসাধারণ লাইন মনে ধরেছিল, “হয়তো সময়ের প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজন মেটাবার জন্যে লড়ছি আমরা”।

নিউরনে নিরন্তর অনুরণন – “কীসের জন্যে লড়ছি আমরা? হয়তো সময়ের প্রয়োজনে!”

মুমিতুল মিম্মা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.