শান্তা মেয়েটিও চলে গেল- কিন্তু কেন গেল!

সুপ্রীতি ধর:

ফেসবুক আমাদের অনেক কিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় প্রতিমুহূর্তে। মন খারাপের ভাগই বেশি সেখানে। এখন বাংলাদেশে দুপুর। মাত্র কিছুক্ষণ আগেই এক সহযোদ্ধার স্ট্যাটাস থেকে মেয়েটির নাম জানতে পারলাম। এও জানলাম, মেয়েটি আর নেই। মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। সাথে সাথেই মেয়েটির প্রোফাইলে ঢুকে দেখলাম নিজের সম্পর্কে লিখে রেখেছে, “তীব্র প্রেমরোধী বিরহ প্রকোষ্ঠের এক অস্পৃশ্য মানবী আমি, একাকীত্বের নির্লজ্জ প্রেমিকা, অন্ধকারের জননী”।

বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, গভীর বিষন্নতায় ভুগছিল সে, কিন্তু কেউ তার সেই বিষন্নতাকে ছুঁয়ে দেখেনি, বা দেখতে চায়নি। হয়তো সে লিখে গেছে তার কথা, কিন্তু যারা বন্ধু ছিল, তারা কেউ গায়ে লাগায়নি। প্রেম ভেঙে গেছে, আবার প্রেম হবে-এরকম সহমর্মিতা হয়তো জানিয়েছে অনেকে। কেউ একটিবারও তার হাতটা ধরতে চায়নি। চারদিকে আজকাল এমন খবর অনেক। বন্ধুরা যারা আছো একে-অন্যের, কেউ কি একটিবার দাঁড়াবে তোমার বন্ধুটির পাশে? কাঁধে হাতটি রেখে অভয় দিয়ে বলবে যে, এই তো আমি আছি, খুলে বল সবকিছু, বলবে কেউ? যে ছেলেটি তার প্রেমিক ছিল, সেও কী জানতো না মেয়েটি কষ্ট পাচ্ছে! জানলেও সে কেন এড়িয়ে গেল ওকে? জীবন তো একটাই রে বাবা, পাশে থাকো বা না থাকো, বন্ধুর হাতটি কেন ছেড়ে দাও? ছেড়ো না আর প্লিজ।

মেয়েটির নাম তাসমিয়া শান্তা সুপ্তিকা। ওর ফেসবুক পোস্ট থেকেতিনটি লেখা তুলে দিলাম হুবহু (কিছু বানান ভুল আছে, তারপরও)। দুটো গত ১১ মার্চে লেখা আর একদম শেষেরটি গত বছর মার্চে লেখা। 

তাসমিয়া শান্তা

তাসমিয়া শান্তা (১)

আমি খুব একটা অর্নামেন্টস পরি না। নাকফুল, কানেরদুল, গলার মালা হাবিজাবি কিছুই পরি না।
তবে আমার দুইটা জিনিসে খুব দুর্বলতা..খুউব।
এক আংটি আর দুই পায়েল। এই দুইটা অর্নামেন্টস কেন জানিনা, খুব পছন্দ আমার। পায়েল সবসময় না পরলেও, আংটি পরি।
.
সিএনজিতে বসে আছি আমি। আমার পাশে বসে আছে অর্ক, আমার প্রেমিক। আমার হাতে অনেক পছন্দের একটা আংটি। হাত মুঠো পাকিয়ে আংটিটার দিকে তাকিয়ে আছি আমি। আংটিটা সম্ভবত রবিউল মার্কেটের কোন একটা দোকান থেকে কেনা।
অর্ক আমাকে বললো, ‘আংটিটা তো সুন্দর! কবে কিনছো?’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, অনেকদিন! সম্ভবত রোজার ঈদের আগে।
ও এটা শুনে আর কিছু বললো না। চুপ করে রইলো।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমিই বললাম, আমাকে একটা আংটি কিনে দিবা, হুম?
ও কেমন যেন, হঠাৎ করে খুব কঠিন হয়ে গেল।
চোখ-মুখ শক্ত করে বললো, ‘না, আমি কখনো তোমাকে আংটি কিনে দেবো না। কক্ষনো না। এমনকি আমাদের বিয়ের সময়ও না। তুমি আমার প্রথম আংটি ভেঙে ফেলছিলা, মনে আছে আমার’
আমার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। কেমন যেন অদ্ভুত রকমের কষ্ট হচ্ছিল। ও আমার সাথে এমন করে কথা বললো কেন?
আমি প্রচণ্ড কষ্টে আর অভিমানে, হাতের আঙুল থেকে আংটিটা খুলে চলন্ত সিএনজির মধ্যে থেকে ছুঁড়ে ফেললাম বাইরে। সেই সাথে বললাম, ‘আমি আর কখনো আংটি পরবো না।’
আচ্ছা, মানুষের অভিমানও কি এত কঠিন হয় কখনো, আমার মত?’
অর্ক আমার দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত হা করে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব অবাক হবার মত মুখভঙ্গি করে বললো, ‘আংটিটা ফেলে দিলে তুমি?’
আমি আস্তে করে বললাম, ‘হ্যাঁ’
তারপর ওর কাধে মাথা দিয়ে ঘুমের ভান করে বললাম, ‘আমার খুব ঘুম পাচ্ছে’
.
বছর তিনেক আগের কথা। আমাদের প্রেমের বয়স প্রায় বছর গড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা তখন দু’জনই ছোট। সবে স্কুলের গন্ডি পার করেছি।
আমাদের তুমুল প্রেম চলছিল। প্রচন্ড আবেগ।
ওই বয়সে যা হয় আরকি…
ছেলেটা এমনিতে অগোছালো টাইপ..বোকাসোকা।
ছুটির সময়গুলোতে সারাদিন বাসার সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করতো সাইকেল নিয়ে। একটু আধটু দেখা হতো। কখনো জানালা দিয়ে মুখ বের করে, কখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। কখনো দু-একটা গোলাপ ছুঁড়ে দিত। মাঝেমাঝে আবার সাহস করে এগিয়ে যেতাম। সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু-চারটা কথা বলতাম।
তারপর রাস্তায় পরিচিত কাউকে দেখলেই, দে ছুট…
.
এরমধ্যে আমার জন্মদিন এসে গেল।
ও আমার জন্মদিন নিয়ে খুব এক্সাইটেড। কিভাবে সেলিব্রেট করবে, কোথায় করবে, কত পাউন্ডের কেক অর্ডার করবে, কে কে থাকবে ইত্যাদি। প্রেম হওয়ার পর প্রথম জন্মদিন বলে কথা! এক্সাইটমেন্ট একটু বেশিই।
এরপরে সব প্লান ভেস্তে দিয়ে জন্মদিনের আগে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে গেলাম আমি। ওই অসুস্থ শরীর নিয়ে আম্মু আমাকে আর বের হতে দিলনা।
সে আগের মতই বাড়ির সামনে দিয়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরতেছিল। সন্ধ্যার পর মোবাইলে ম্যাসেজ দিয়ে জানালো, আমি যেন একটু রাস্তায় যাই!
আমি সাথে আরেকজনকে নিয়ে রাস্তায় গেলাম।
ও সাইকেল থামিয়ে দাঁড়াল। আমার বাম হাতটা টেনে নিয়ে একটা আংটি পড়িয়ে দিলো। তারপর কিছু বুঝে উঠার আগেই, ওর দুইহাত আমার দুই গালে রেখে টুপ করে একটা চুমু খেলো! এই চুমুর অনুভূতি ব্যাখ্যা করার মতন শব্দ নেই আমার অভিধানে।
.
আমাদের প্রেম হবার পরে ও আমাকে যা কিছু দিয়েছে, হোক সেটা গোলাপ অথবা সরিষা ফুল, আমি প্রত্যেকটা জিনিস খুব যত্ন করে রাখতাম, রাখি এখনো। এমনকি একটা গোলাপের পাঁপড়িও হারাতে দেইনি।.

(গল্পটা অসম্পূর্ণ। শেষ করতে পারিনি।
ডিলেট করতে ইচ্ছা করলো না। তাই এটুকুই পোস্ট করলাম)

তাসমিয়া শান্তা (২)

ছেলেটা আর মেয়েটা হাঁটছে পাশাপাশি। একজনের হাতের ফাঁকে আরেকজনের হাত।
মেয়েটা চুপচাপ। কথা বলছে না একদম। প্রচণ্ড কষ্টে কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আছে। চাইলেও কথা বলতে পারছে না। শরীর জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু বুনো কষ্ট।
ওদিকে ছেলেটা একটু পরপর কথা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মেয়েটার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আনাড়ি প্রেমিকের মতন অভিমান ভাঙাতে একটু-আধটু কথা বলে যাচ্ছে। ছেলেটা মেয়েটার সামনে বোকাসোকা। কিছু বলতে পারে না। রাগ, অভিমান কোনটাই ভাঙাতে পারে না। সবার সাথে এমন না হলেও, মেয়েটার সাথে এমন।
মেয়েটা অবশ্য রাগ করেনি, অভিমানও না।
কষ্ট হচ্ছে তার, সত্যিকারের পাঁজর ভাঙা কষ্ট!
.
মেয়েটা আর ছেলেটা এখনো পাশাপাশি হাঁটছে..হাঁটছেই।
রাস্তার পাশে একটা প্রাইভেট কার দাঁড় করানো আছে। একটা কাপল ঘুরতে আসছে ওই গাড়ি নিয়ে। মেয়েটা আনমনে তাকিয়ে ছিল ওদিকটায়।
ছেলেটা বললো, “আমাদেরও একদিন এরকম একটা গাড়ি হবে। আমরাও গাড়ি নিয়ে এভাবে একসাথে ঘুরতে আসবো।”
মেয়েটা মুচকি হাসলো। মেয়েটা আসলে ওদিকে তাকিয়ে কিছুই দেখছিলো না। গাড়িটা তার নজরেই আসেনি। মেয়েটা ভাবছিল অন্যকিছু।
মেয়েটা মনে মনে বললো, “আমাদের গাড়ি লাগবে না। আমরা দু’জন বরং টাকা জমিয়ে দু’টো সাইকেল কিনবো। তারপর এরকম এক বসন্তের সন্ধ্যায় এই আবছা আলো-আধারের মধ্যে পাশাপাশি সাইকেল চালাবো স্লো মশানে। আর ওইসব কর্পোরেট সুখী মানুষদের ভীড়ে আমরা দু’জন সত্যিকারের সুখী মানুষ হবো। ”
.
অনুগল্প : সত্যিকারের সুখী মানুষ

তাসমিয়া শান্তা (৩)

প্রিয় অন্ধকার,
প্রথমবার যখন তোমার প্রেমে পড়েছিলাম তখন তোমাকে ঠিক অতটা বুঝিনি। তোমার যে কী মায়া!
তোমার তখনকার মায়াজালের কোথাও একটু ফুটো ছিলো মনে হয়।আর সেই ফুটোর আয়তনের তুলনায় আমি নিতান্তই নগন্য। তাই তো অনায়াসেই বেরিয়ে পড়ছি। তা না হলে কি এও সম্ভব বলো? আমি তখন শুধু শুধুই তোমার প্রেমে পড়ছিলাম।
সে প্রেমে কোন মুগ্ধতা ছিলনা। ছিলনা মগ্নতাও।সেখানে একরাশ হাহাকার, দীর্ঘশ্বাস, বিষণ্নতা আর শংঙ্কা’রা গাদাগাদি করে বাসা বেধেছিল। আর তাইতো আমি অমন আকুলি বিকুলি করে এদিক সেদিক দিবালোকের খোঁজে ছুটতাম। জানো?আমি আবারো প্রতারিত হয়েছি। ব্যস্ত শহরের সোডিয়াম আলোরা নিজেদের ‘দিবালোক’ বলে আমায় কাছে ডেকেছিল।আমিও বোকার মত ‘মেকি দিবালোক’র প্রেমে পড়েছিলাম।প্রতারিত হয়েছি। তাতে কি?আমার বরং ভালই হইছে। তা না হলে তো তোমাকে চিনতে পারতাম না। তোমার আমাকে মুগ্ধ করার ‘অসহ্য ক্ষমতা’ মুখোশের আড়ালেই ঢাকা পড়তো। আমি এমন মায়াময় একটা প্রেমিক পেতাম না। মুগ্ধতাকে ‘একঘেয়েমি’র চাদরে জরিয়েই আমার একজীবন কেটে যেত মুগ্ধতা হীনতায়।
আমি আরো শত-সহস্র কোটিবার প্রতারিত হতে চাই, শুধু তোমার একটুখানি মুগ্ধতার লোভে।
ভালবাসি প্রিয় অন্ধকার <3
আমি জানি ,তুমি আমায় কখনো ছেড়ে যাবে না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.