হিজাব কেন ইউরোপের কর্মক্ষেত্রে নিষিদ্ধ!

ওমর ফারুক লুক্স:

ইসলামি রাষ্ট্রগুলোতে কিংবা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে বোরখা হিজাবের মতো নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী সংস্কৃতিগুলো থেকে নারীদের কবে মুক্তি ঘটবে তা বলা কঠিন। তবে অমুসলমান, শিক্ষিত ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে মুসলিম নারীদের শিক্ষিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে গেলে তাদেরকে এই মধ্যযুগীয় সংস্কার ত্যাগ করে উন্নত সংস্কৃতি, আধুনিক আর মানবিক আইন আর সমাজ ব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা করতেই হবে, এর বিকল্প নেই।

হিজাবসহ যেকোনো ধর্মীয় পোশাক বা চিহ্ন কর্মক্ষেত্রে নিষিদ্ধের পক্ষে মঙ্গলবার রায় দিয়েছে ইউরোপীয় শীর্ষ আদালত (ইউরোপিয়ান কোর্ট ফর জাস্টিস)। সূত্র: http://www.bbc.com/news/world-europe-39264845?ocid=socialflow_facebook&ns_mchannel=social&ns_campaign=bbcnews&ns_source=facebook

ওমর ফারুক লুক্স

এটাই ছিল গতকালকের দিনের বিশ্বব্যাপী অন্যতম আলোচিত একটি খবর। আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে হিজাব বা ধর্মীয় চিহ্ন বহনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি, বরং চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে- কোনো প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে এই কারণে কোনো প্রার্থীকে চাকরি নাও দিতে পারেন।

ইউরোপে কর্মক্ষেত্রগুলোতে মুসলিম নারীদের হিজাবের ব্যবহার একটা দীর্ঘ আলোচনা বা বিতর্ক পেরিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে। হিজাব পরে একজন নারী কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাবেন কি পাবেন না, না পেলে কি সেটা চাকরিদাতার ‘বর্ণবাদী আচরণ’ বলে বিবেচিত হবে কিনা, সেটা আদালতের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলো।

যেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সুনির্দিষ্ট ড্রেসকোড আছে, অথবা যেসব প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ধর্মীয় পরিচয়কে প্রদর্শন বা প্রকাশ পাওয়াকে কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা মনে করেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ আইনটি অনেক জটিলতা থেকে মুক্তি দেবে। দ্বিতীয়ত, কোনো চাকরিপ্রার্থী নারী তার হিজাবের কারণে চাকরি না পেলে একে ‘বর্ণবাদী আচরণ’ বলে অভিযোগ করতে পারবে না।

এবার আসি ইউরোপের মতো ধর্ম-নিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক মহাদেশে প্রকাশ্যে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের বোরখা এবং হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ খুব পরিচিত কিছু কারণে।

একজন মুসলিম নারী বোরখা বা হিজাব দিয়ে নিজের চেহারা ঢেকে রাখাকে তার ধর্মীয় অনুুশাসন বা অবশ্যই করণীয় বলে মনে করেন। কিন্তু ইউরোপে নিরাপত্তা এবং আইন-শৃংখলাজনিত কারণে বোরখা ও হিজাবকে অনেক বড় একটি সমস্যা বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে যে স্থানগুলোতে মানুষের চেহারা অবশ্যই প্রদর্শন করতে হয়, যেমন, আদালত, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস বা মন্ত্রণালয়, বিমানবন্দর বা দুটি দেশের সীমান্ত পারাপারের সময়ে বোরখা বা হিজাব মানুষের পরিচয় গোপন করতে পারে।

এছাড়াও বাস, ট্রেন, সিনেমা, থিয়েটার, বড় শপিং-সেন্টারে কিংবা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের মোড়ে যেখানে জনগণের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা ব্যবহৃত হয়, সে স্থানগুলোতে বোরখা বা হিজাব পরে একজন অপরাধী সহজেই কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে পার পেয়ে যেতে পারেন। তাই ইউরোপের দেশগুলোর অনেক অঞ্চল বা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বোরখা পরাকে সম্পূর্ণ নিষেধ করেছে বা করার কথা ভাবছে।

ইউরোপের যেসকল প্রতিষ্ঠানে বা কর্মক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ড্রেসকোড প্রচলিত আছে, অথবা স্বাস্থ্যসম্মত বা দুর্ঘটনা এড়াতে সুনির্দিষ্ট এবং নিরাপদ পোশাক প্রচলিত আছে, সেইসব ক্ষেত্রে বোরখা বা নিজের পছন্দমতো ঢিলেঢালা পোশাক, বা হিজাব অবশ্যই বেমানান, অস্বাস্থ্যকর এবং দুর্ঘটনার কারণও হতে পারে।

ইউরোপসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর গবেষণার পথ পাড়ি দিয়ে শিল্প-কারখানা বিভিন্ন কারিগরি বা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ, পরিবহন শ্রমিক, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট শ্রমিক ইত্যাদি পেশার জন্য সর্বোচ্চ উপযোগী এবং নিরাপদ ড্রেসকোডে পৌঁছেছে। এক্ষেত্রে একজন কর্মীর ধর্মীয় পোশাক বা বিশেষ ধর্মীয় চিহ্ন ড্রেসকোডকে বিঘ্নিত করে।

কর্মক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ পরিস্থিতি বিরাজ করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এক্ষেত্রে একজন কর্মী বোরখা, হিজাব বা অন্য কোন ধর্মীয় পোশাক পরিধান করলে তিনি অবশ্যই তার বিশেষ ধর্মটি সবার কাছে তুলে ধরেন এবং বাকি সবার কাছ থেকে নিজেকে আলাদা বলে প্রকাশ করেন। যা কর্মক্ষেত্রে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এবার আসি, মুসলিম নারীরা প্রকাশ্যে এবং কর্মক্ষেত্রে বোরখা ও হিজাব পরিধানের ক্ষেত্রে যে যুক্তিগুলো দেখান, সে প্রসংগে। মুসলিম নারীরা দাবি করে থাকেন, বোরখা বা হিজাব পরা তার অধিকার ও পছন্দ। সেক্ষেত্রে বোরখা বা হিজাব না পরাও একজন নারীর অধিকার ও পছন্দ হওয়া উচিত। কিন্তু সে বিষয়টি আবার মুসলমান নারী, এমনকি অনেক মুসলিম চিন্তাবিদও মানতে রাজী নন।

বোরখা বা হিজাব যে একজন নারীর পছন্দ নয়, বরং তাকে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়, তার পেছনে অসংখ্য প্রমাণ আছে। যেমন, একটি মুসলিম দেশের বা সমাজের নাগরিক হিসাবে আমরা প্রায়ই দেখি মুসলিম পরিবারের কন্যা সন্তানদের তাদের বালিকা বয়স থেকেই জোর করে বোরখা বা হিজাব পরানো হয়। বোরখা বা হিজাব পরতে অনিচ্ছুক কন্যা সন্তানদেরকে শারীরিক নির্যাতন মুসলিম সমাজে খুব পরিচিত একটি বিষয়।

বোরখা বা হিজাব পরিহিতা মেয়েদেরকে চরিত্রবান বা সতী-সাধ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বিশেষ যোগ্যতার পাত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিয়েশাদীর ক্ষেত্রে। ইসলাম প্রচার আন্দোলনের কর্মীরা বিশ্বের সকল নারীকে হিজাব পরানোটাকে তাদের জিহাদের অংশ হিসাবে নিয়েছে। মাওলানাদের বয়ান, গণমাধ্যমে এবং পাঠ্যপুস্তকে নারীদের হিজাব পরানোর পক্ষে প্রচারণা, মুসলিম রাষ্ট্রে এমনকি বিশ্বের সকল অমুসলমান সমাজেও মুসলিম জিহাদীরা নারীদের হিজাব পরানোর পক্ষে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।

বিশ্বের শরিয়া রাষ্ট্রগুলোতে মুসলিম নারীদের তো অবশ্যই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অমুসলিম নারীদেরকেও বোরখা পরতে আইন করে বাধ্য করা হচ্ছে। আইন অমান্যকারীদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির বিধান। এরপরেও কি বলবেন- বোরখা বা হিজাব পরা শুধুই নারী নিজস্ব পছন্দ ও ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে?

বিশ্বের সকল ধর্মই নারীদেরকে বোরখা ও হিজাবের মতো বিভিন্ন পোশাকি বা সামাজিক বেড়াজালের মধ্যে আটকে রেখে গৃহবন্দি করতে চেয়েছে। ধর্মগুলো সফলও হয়েছিল হাজার হাজার বছর। মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া বলেছিলেন,- ”আমাদেরকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন”- কথাটি সব ধর্মের বেলায়ই সত্য। তবে বেশিরভাগ ধর্মের নারীরাই সেই অন্ধকার থেকে অনেকটাই আলোতে আসতে পেরেছেন। যদিও তার জন্য সময় লেগেছে হাজার হাজার বছর। অথচ ইসলাম ধর্ম নারীদের অধিকার আর স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এখনও সেই মধ্যযুগীয় অন্ধকারের যুগেই রয়ে গেছে।

এর পেছনের কারণ হিসেবে ইসলামী চিন্তাবিদরা অনেক ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক কারণকে দায়ী করে থাকেন। অনেকে আবার বোরখা হিজাব ইসলামী অনুশাসনকে নারী স্বাধীনতা অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো সমস্যাই মনে করেন না। সে বিশাল আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কোরান আর হাদিস যে মুসলিম নারীদের বোরখা আর হিজাবের মতো পরাধীনতা আর অন্ধকার অনুশাসন থেকে বেরিয়ে আসতে সবচেয়ে বড় বাধা, তা অস্বীকার করার কারণ নেই।

কোরান হাদিসে মুসলিম নারীর অধিকারের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে পর্দাপ্রথা এবং গৃহবন্দি হয়ে থাকাকে। সেজন্য নারীর পিতা ও স্বামীকে ঈশ্বর কর্তৃক দেয়া হয়েছে নির্যাতনের অধিকার, ইসলামি আইনে রয়েছে কঠোর শাস্তির বিধান, আর পরকালে রয়েছে ভয়াবহ দোযখের আযাব। কিন্তু রেনেসাঁ আর ফরাসি বিপ্লব পার হয়ে আসা শিক্ষিত আর আধুনিক ইউরোপে নারীদের জন্য এ মধ্যযুগীয় পরাধীনতার অনুশাসনকে করুণার চোখে দেখা হতে পারে, তবে প্রশ্রয় দেবার সুযোগ নেই।

ফ্রাংকফুর্ট, জার্মানি

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.