সেই বাবার কাছে ক্ষমা চাই

নাসরীন রহমান:

মায়েরা তো ‘ন্যানি’ই -এই শিরোনামে লেখা পাঠাবো ভাবছিলাম এবং কিছুটা অগ্রসরও হয়েছিলাম লেখাটিতে; এরই মধ্যে চোখে পড়লো সংবাদ মাধ্যমের খবরটি।

কী করে সম্ভব? বিশ্বাস করুন, আমার ভাবতেই অবাক লাগছিলো, এটা কী করে সম্ভব!

এই সেই অভিযুক্ত সেলিম মিয়া, যে আট মাসের শিশুকে ধর্ষণ করেছে

মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচি আয়োজিত ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত একজন বাবা জানিয়েছেন, তাঁর আট মাস বয়সী মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যদিও এটা গত বছর আগস্টের ঘটনা, কিন্তু খুব বেশি আলোচিত হয়নি বলে জানাও হয়নি ঘটনার ভয়াবহতা।

লোকমুখে শোনা, বাবা মো. মাসুদ যখন সেই ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন যে, তার শিশুর যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্তপাতের ঘটনায় তারা থমকে গিয়েছিলেন, হতভম্ব হয়ে গেছিলেন, পুরো  হলরুমে তখন পিনপতন নীরবতা নেমে আসে।

সারাদেশে যেখানে অব্যাহত ভাবে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে, সেখানে ‘আট মাস বয়সী ‘ শিশু ধর্ষণের ঘটনা ‘নারী ও শিশু নির্যাতন ‘ এর ধরনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গত বছর দিনাজপুরের পার্বতীপুরে শিশু পূজা দাসকে যখন নির্মমভাবে ব্লেড দিয়ে যৌনাঙ্গ কেটে ধর্ষণ করা হয়, তখন এই নির্মমতার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সারাদেশবাসী; ধর্ষকের বিচারের দাবিতে একজোট হয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং প্রশাসন দ্রুত শিশু পূজাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসে এবং অভিযুক্ত সাইফুলকে আটক করে। এতো গেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত শিশু ধর্ষণের ঘটনা, কিন্তু এর বাইরে আরও কত শিশু ধর্ষণের ঘটনা অজানাই থেকে যায়, তা বলা বাহুল্য! আমরা নিচের পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখবো শিশু ধর্ষণের ঘটনা কী মহামারী রুপ ধারণ করেছে। 

ব্র্যাকের এই গোলটেবিল বৈঠক যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে , গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১ দশমিক ৭ জন মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুরাও এ নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। কেউ কেউ গণধর্ষণেরও শিকার হয়।

নাসরীন রহমান

নারী নির্যাতনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্র্যাকের তৈরি এই ডেটাবেইস এ দেখা যায়, ‘গত বছর ৫৫টি জেলায় ৭ হাজার ৪৮৯টি নারী ও মেয়েশিশুর নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। গড়ে প্রতি মাসে ৬২৪টি, প্রতিদিন ২০ দশমিক ৫টি এবং প্রতি জেলায় মাসে ১১ দশমিক ৩৫টি নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। মোট নথিভুক্ত ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল শারীরিক নির্যাতন (৬৭ %)। এরপর ছিল যৌন নির্যাতন (১৯ %) এবং মানসিক নির্যাতন (১৪%)। নথিভুক্ত নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে পরিবারের সদস্যরা। নারীরা শারীরিক নির্যাতনের শিকার বেশি হলেও শিশুদের নির্যাতনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে ধর্ষণের ঘটনা।’ এখানে লক্ষ্য করুন , শিশু নির্যাতনের ভেতর সবচেয়ে বেশি ঘটে ‘ ধর্ষণের ‘ ঘটনা! এই তথ্যটি আমাদের উদ্বিগ্ন করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, সারা বছর জুড়েই নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও বর্ষাকালে এর মাত্রা বাড়তে দেখা গেছে। এর কারণ হিসেবে পুরুষের কাজের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী ও দেখা যায় , ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৩২৫টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই ৩২৫ শিশুর মধ্যে ৪৮ জন শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৩১ জন প্রতিবন্ধী বা বিশেষ শিশু, ৫ জন গৃহকর্মী শিশু। এদের মধ্যে ১৫ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৫৪ শিশুকে। ২০১৫ সালে ৫২১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ৯৯ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়, ৩০ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং ৪ জন শিশু ধর্ষণের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।

২০১৪ তে ১৯৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ২২টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, ২১টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ২৩টি শিশু ধর্ষণের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে’। সকল শিশু ধর্ষণের ঘটনা মিডিয়ায় আসে না, আর অভিযুক্তের বিচারের দাবিতে সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে উঠে না। অনেক সময় অভিযোগ পাওয়া যায় যে, অপরাধী স্থানীয় প্রশাসনের মদদ পায়! অনেক সময় ভিকটিমের পরিবার আইনের আশ্রয় নেন না সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে, সেক্ষেত্রে ধর্ষণের সঠিক পরিসংখান অনেক সময় প্রচার মাধ্যমে আসে না। আবার গ্রাম্য সালিশেও এমন অনেক ঘটনার নিষ্পত্তি করা হয়, যেগুলোতে খুব স্বাভাবিকভাবেই নারী অধিকার লঙ্ঘিত হয়।

ব্র্যাক এর আলোচনায় সেই বাবার অভিযোগ, তিনি পুলিশের সহায়তা পেয়েছেন, চার্জশিটও হয়ে গেছে। কিন্তু আসামী ঘুরে বেড়ালেও ধরা পড়ছে না। উপরন্তু হুমকি দিচ্ছে! কী করে একজন ধর্ষক অপরাধ করেও উপরন্ত হুমকি দেয়? অভিযুক্তের এই উদ্ধত আচরণের উৎস কী? এবং চার্জশিট হবার পরও অভিযুক্ত ধর্ষক কিভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, সেই প্রশ্নের উত্তরও আমাদের অজানা!

একের পর এক শিশু ধর্ষণের মত পৈশাচিক ঘটনা আমাদের থমকে দেয়, কি করে এতো অমানবিক, নিষ্ঠুর হতে পারে এইসব ধর্ষকেরা! এটা কি কোনও সভ্য সমাজ?

শিশু ধর্ষণসহ সকল নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দোষীসাব্যস্ত অপরাধীর বিচার হোক দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে; একমাত্র অপরাধীর যথাযথ শাস্তিই পারবে শিশু ধর্ষণ এর মতো অমানবিকতা ও হিংস্রতা রোধ করতে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.