‘মেয়েরা আসেই এজন্য’

তানিয়া কামরুন নাহার:

মনেরও রঙ লেগেছে, বনের পলাশ জবা অশোকে

বনেরও ঘোর জেগেছে, পারুল কনক-চাঁপার চোখে।।

বসন্তে প্রকৃতি যেমন নানা রঙে রঙিন হয়ে উঠে তেমনি, দোল উৎসবে একে অপরের গায়ে  আবির ছড়িয়ে দিয়ে সবাই রঙের খেলায় মেতে উঠতে চায়। মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও এখন এটি ধীরে ধীরে সার্বজনীন হয়ে উঠছে। কিন্তু তারপরেও কোথায় যেন একটা কাঁটা রয়ে গেল। রঙে রঙিন হয়ে যাবার ছেলেমানুষি এ খেলাতেও নারীরা নিরাপদ নয়। নারীরা যে নিরাপদ নয়, এজন্যও দোষ যেন নারীরই। ‘’মেয়েরা আসেই এজন্য’’ এই থিওরিতে বিশ্বাসীরা নারীদের এমন যৌন নিগ্রহের প্রতিবাদ তো করেই না, বরং পারলে তারাও উৎসবে অংশ নেওয়া নারীদের নিগ্রহ করে যাবার সুযোগ খুঁজতে থাকে।

তারপর আছে ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষ। হোলি বা দোল উৎসব যেহেতু পাপের কারখানা, তাই এখানে অংশ নেওয়াও নিষেধ। এই অতি ধার্মিকেরা আবার কিন্তু রংগের খেলায় যৌন নিগ্রহের শিকার নারীদের ভিডিও দেখে অত্যন্ত উল্লসিত। ভাবটা এমন, ‘বেশ হয়েছে, হোলি খেলায় গেলে এরকমই তো হবে।‘’ তার উপরে আগে থেকেই একটি সামাজিক মাইন্ড সেট প্রস্তুত করা থাকে, ‘মেয়েরা আসেই এজন্য।‘ হোলি খেলায় যৌন নিগ্রহের ঘটনা ঘটবে, এটাই যেন স্বাভাবিক ঘটনা। এর অন্যথা নারীরা প্রত্যাশা করবে, তা যেন বোকামি।

তানিয়া কামরুন নাহার

ঠিক আছে, নাহয় তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম, সবচেয়ে বাজে মেয়েগুলো সব জেনে শুনে হোলি উৎসবে অংশগ্রহণ করে এবং তারা এই নিগ্রহকে উপভোগও করে। তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর কী হবে, পথচারী, হোলিতে অংশ না নেওয়া অনিচ্ছুক মেয়েটিকেও যে যৌন নিগ্রহ করা হলো? এই মেয়েটিও কি এজন্যই এসেছিল? এদিকে এই যৌন নিগ্রহের ঘটনা জেনে অতি ধার্মিকেরা খুশিতে দাঁত কেলিয়ে হাসলেন। কিন্তু এই নিগ্রহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেন না! মাঝখান থেকে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ায় সুযোগ পেয়ে তা দ্রুত কাজে লাগালেন।

আপনারা কি বলতে পারবেন, নারী আসলে কোথায় নিরাপদ?
একটি মেয়ে পাবলিক বাসে উঠলে অহেতুক কিছু ঈভ টিজিং শিকার হয়। কারণ, মেয়েটি নাকি বাসে উঠেছেই এজন্য। পয়লা বৈশাখের উৎসবে নারীরা যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয়, কারণ, মেয়েরা  নাকি এসেছেই এজন্য। এভাবেই নারীর উপর যৌন নিগ্রহ সামাজিকভাবে জায়েজ হয়ে গেছে। দুঃখজনকভাবে এটাও সত্যি, যারা এই মিথ্যাকে জায়েজ করেছে, তাদের মা-বোন-স্ত্রীরাও আজ এই সমাজে নিরাপদ নয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.