“পুরুষ শোধনাগার প্রয়োজন”

উইমেন চ্যাপ্টার: নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা বন্ধে নারীর ক্ষমতায়নের চাইতেও বেশি প্রয়োজন পুরুষের শোধনাগার তৈরি করা, যেখান থেকে ছেলেদের ‘মানুষ’ হিসেবে তৈরি করা হবে। কারণ ছেলে বা পুরুষরাই এখন অসুস্থতায় ভূগছে, তাদের ‘ট্রিটমেন্ট’ প্রয়োজন। নিজেদের রক্ষায় মেয়েরা কেন আলগা বর্ম তৈরি করবে? কেন তাকে কারাতে শিখতে হবে পুরুষদের হাত থেকে রক্ষায়?

কথাগুলো বলছিলেন, একাত্তর টিভির কর্ণধার সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু। আজ মঙ্গলবার বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক আয়োজিত Our Role to Prevent Violence Against Women  শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি একথা বলেন। আলোচনার শুরুতে ডাটাবেজ থেকে সংগৃহীত নারী নির্যাতন চিত্র ২০১৬ উপস্থাপন করা হয়।

আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদা শারমীন বেণু। এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন নারীনেত্রী আয়শা খানম, গবেষক রুচিরা তাবাসসুম নভেদ, ডিএমপির ডেপুটি কমিশনার এবং ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের অধিকর্তা ফরিদা ইয়াসমীন।

নারী নির্যাতন রোধে আইনগত সুরক্ষা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে ডেপুটি কমিশনার ফরিদা ইয়াসমীন বলেন, অনেক আইন আছে দেশে। কিন্তু জনগণের দোরগোড়ায় সেই আইন কতোটুকু পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে। তিনি বলেন, নারী নির্যাতন বন্ধে বিদ্যমান সব আইনই অ-জামিনযোগ্য। কিন্তু আসামীরা ঠিকই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা কী করে সম্ভব হচ্ছে, তা তিনি জানেন না বলে মন্তব্য করেন।

এছাড়া নারীদের পক্ষ থেকেও অনেক সময় মামলা তুলে নেয়ার অনুরোধ আসে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রচুর এরকম ঘটনার মুখোমুখি হোন তারা। যৌন নির্যাতনের শিকার মেয়েরা পরিবার থেকে কোনো সহায়তা পায় না। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ নির্যাতন রোধে। তার মতে, প্রবলেমটা কেবল আইনগত না, সামাজিকও। আইন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি খুব জরুরি এই মুহূর্তে।

নারীনেত্রী আয়শা খানম বলেন, জেন্ডার সংবেদনশীলতা, মানবাধিকার বিষয়গুলো এখন পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা অাবশ্যিক হয়ে পড়েছে। ১৯৮৫ সাল থেকে বিভিন্ন নারী সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন নারী ইস্যুতে কাজ করছে, কিন্তু তার ফলাফল কী? গত কয়েক দশকে নারীরা যেভাবে এগিয়েছে, অন্যরা তা হয়নি। ফলে সংঘাত বাড়ছে, নির্যাতন বাড়ছে।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মাহমুদা শারমীন নারী নির্যাতন রোধে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরে বলেন, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হলেই নারী নির্যাতন কমবে না। এজন্য প্রয়োজন কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা। তরুণদের এই কাজে যতোবেশি সম্পৃক্ত করা যাবে, ততোই ফল পাওয়া সম্ভব হবে। বিভিন্ন ইউনিয়নে কিশোর-কিশোরীদের ভেতরে বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধাবোধ বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্লাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে নারী নির্যাতন বন্ধে যেসব মডেল হাতে নেয়া হয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে কোনটা আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত, তা নির্ধারণ করা যেতে পানে। একা আইন দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন করা সম্ভব হবে না। প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে হবে সবাইকে।

মোজাম্মেল বাবু আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মাত্র তিনদিনেই ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে সেই দাবি কার্যকর করাও সম্ভব হয়েছে। সুতরাং নারী নির্যাতন বন্ধে একটি একক ক্যাম্পেইন নিয়েও সর্বস্তরে এমন জাগরণ তৈরি করা সম্ভব হলে দৃশ্যপট বদলে দেয়া অসম্ভব নয়। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে এই মিডিয়ার একটা বিশাল ভূমিকা আছে। যদি এই মিডিয়াকে ব্যবহার করে একটা চাপ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে কারও পক্ষে চোখ বন্ধ করে রাখা সম্ভব হবে না।

তিনি দেশে মৌলবাদের উত্থানকে ‘দক্ষিণপন্থী তাপমাত্রা’ এবং ‘সামাজিক তাপমাত্রা’ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এই তাপমাত্রা যদি ২০ বা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল বলে ধরে নেই, তবে আজকের প্রেক্ষাপটে সেই তাপমাত্রা বেড়ে ৭০ এ দাঁড়িয়েছে। ৯০ বা ১০০ হলে এই দেশ পাকিস্তান বা সিরিয়ার মতোন ফুটতে থাকবে।

মোজাম্মেল বাবুর মতে, নারী কেন পুরুষের সমানাধিকার চাইবে? দুজন দুই প্রজাতির। নারীর জন্য প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ নারী যা পারে, পুরুষের পক্ষে কখনোই তা পারা সম্ভব না। আর নারীকে অন্তরীণ করে নারী নির্যাতন কমানো যাবে না, বরং উল্টোটা হতে হবে।

তিনি কথা প্রসঙ্গে ‘একাত্তরে নারীদের ইজ্জত বা সম্ভ্রমহানি’ বিষয় উল্লেখ করে বলেন, এটা খুবই ভয়াবহ অ্যাপ্রোচ নারীর প্রতি। ‘ইজ্জত হরণ যতোদিন বলবো আমরা, ততোদিন পুরুষও এটা হরণই করতে চাইবে। মেয়েদের এক্ষেত্রে ‘লজ্জা’ বিষয়টা ঝেড়ে ফেলে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি মিডিয়ার সমালোচনা করে বলেন, নারী তথা সমগ্র নারীবাদকেই পণ্য হিসেবে পরিণত করেছে মিডিয়া। ব্যবসা হচ্ছে নারীদের নিয়ে, নারী ইস্যু নিয়ে। এই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে ধরে ধরে এগোতে হবে সবাইকে সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

আলোচনার শুরুতে নারী নির্যাতন চিত্র ২০১৬ শীর্ষক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের কমিউনিটি এম্পাওয়ারমেন্ট প্রোগ্রামের প্রধান ফারহানা হাফিজ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৫৫টি জেলায় ৭,৪৮৯টি নারী নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নারী (১৮ বছরের উপরে) ৮০%, মেয়ে শিশু (১৮ বছরের নিচে) ২০%। গড়ে প্রতি মাসে ৬২৪টি, প্রতিদিন ২০.৫টি, প্রতি জেলায় মাসে ১১.৩৫টি নির্যাতন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।  

তবে পারিবারিক নির্যাতনের অনেক খবরই প্রকাশিত হয় না বলে উল্লেখ করেন ফারহানা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য নারী নির্যাতনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সবাই নারী নির্যাতন বন্ধে ভবিষ্যতে দৃঢ়ভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

সবার সুবিধার্থে পুরো রিপোর্টটির পিডিএফ ফাইল এখানে সংযুক্ত করা হলো: 

file:///C:/Users/User/Downloads/Write-up%20on%20VAW.pdf

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.