কন্যারা ‘আত্মবিশ্বাসী’ হোক, পুত্ররা “মানুষ” হোক! (২)

তানিয়া মোর্শেদ:

সেদিন যে লেখা শুরু করেছিলাম সে বিষয়েই আরও কথা। স্কয়ার গ্রুপের অ্যাডটি দেখে কারও কারও কাছে মনে হয়েছে, পার্লারে যেয়ে যে নারী চুল কাটতে পারেন, তিনি কেন নির্যাতক বরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন না? আগেই বলেছি ব্যাটার্ড উইমেনস সিন্ড্রোমের কথা।

এবার আসি অন্য বিষয়ে। কোনো নারী ব্যাটার্ড উইমেনস সিন্ড্রোমে না ভুগলেই কি প্রথমবার নির্যাতিত হলেই প্রতিবাদী হোন? কেন হোন না? একজন নির্যাতিত নারী প্রতিবাদ করা মানে তাকে নিজে স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়া বা তাকে যদি বের করেই দেওয়া হয় প্রথম প্রশ্ন, তিনি কোথায় যাবেন? ক’জন নির্যাতিত নারী তাঁর নিজের জন্মগত পরিবারে এ’ অবস্থায় সাদর আমন্ত্রণ পান বাংলাদেশের মতো দেশে?

তানিয়া মোর্শেদ

আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি হাতে গোণা কিছু নির্যাতিত নারী নিজ জন্মগত পরিবারে স্থান পান। বিত্তহীনদের কথা বলার কিছুই নেই এখানে। মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের জীবনে এটা একই ঘটনা। এখানে অর্থনৈতিক ব্যাপার অনেক বড় বিষয়। বিশেষত যদি সন্তান থাকে সেই নারীর। উচ্চ বিত্তে অর্থনৈতিক বিষয় নেই। তবে সবক্ষেত্রেই সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি বিশাল ভূমিকা রাখে। সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি কোন ঘর ত্যাগী নারীকে ভালো চোখে দেখে না অনুন্নত সমাজে। যে সমাজে ধর্ষিতার দিকেই আঙ্গুল তোলে মানুষ, সে সমাজে ঘর ত্যাগী নারীর কী অবস্থা, তা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়।

সংসার মানুষের নানা কারণে টিকতে না পারে। দুটো ভালো মানুষও সংসার না করতে পারেন। কিন্তু সেই সংসার ভাঙ্গার জন্য সব সময় নারীকে দায়ী করা হয়। কত কত নির্যাতিত নারীকে উচ্চ শিক্ষিত, প্রগতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারও নির্যাতক বরের কাছে ফিরে যেতে বলেন, বাধ্য করেন তা জানলে বিস্মিত হতে পারেন কেউ। কিন্তু তাতে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না। উচ্চ মধ্যবিত্ত, উচ্চ বিত্তের নির্যাতিত নারীর জন্য সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতির অজুহাত এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।

একজন নির্যাতিত নারীর প্রতিবাদী হয়ে ঘর ছাড়তে অনেক কিছুর সমন্বয় লাগে। সেই নারী অনেকবার ভাবেন, পথে বের হয়ে যে বাধা, তা রুখবার মতো শক্তি তাঁর আছে কিনা? আর সন্তান থাকলে এই চিন্তা হাজার গুণ বেশী হয়ে যায়। সেকারণে অধিকাংশই শতবার নির্যাতনের পর ঘর ছাড়েন। প্রথমবারে খুব কম নির্যাতিতই তা পারেন। তাঁদের শত অভিবাদন। যিনি শতবারের পর ছাড়েন তাঁকেও অভিবাদন। আর যিনি পারছেন না তাঁর জন্য একটি নারী বান্ধব সমাজ, রাষ্ট্র তৈরীর জন্য সবার অংশ গ্রহণ। এজন্য নির্যাতিত নারী ও শিশু কেন্দ্র প্রতিটি জেলা নয়, উপজেলায় গড়তে হবে। কারণ একজন নির্যাতিত নারী তিনি কর্মজীবিই হোন আর “কিছু না করা নারী” হোন, যে বিত্তেরই হোন, ঘর ছাড়ার পর প্রাথমিক ভাবে হলেও একটি স্থান প্রয়োজন থাকবার জন্য।

এবার আসি আমার জানা কতোগুলো ব্যাটার্ড উইমেনস সিন্ড্রোমের ঘটনার। একারণেই এগুলো লিখছি, তাঁদের জীবনের গল্প হয়ত অনেককেই সহায়তা করবে এটা বুঝতে। হয়ত অনেক নির্যাতিত নারীও কিছু শিখবেন এথেকে। আশা করতে তো অসুবিধে নেই! কেউ এই উদাহরণ থেকে যদি কোন পরিচিত জনের গল্প বলে ভাবেন, তাদের প্রতি অনুরোধ সে ধারণা নিজের মধ্যেই রাখবেন। তাঁদের জাজ করবেন না। এ গল্পগুলো বলার একমাত্র কারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। আর কিছুই নয়। যাঁদের গল্প তাঁদের প্রতিও অনুরোধ, তাঁরাও যেন বোঝেন কেন আমি লিখছি।

দেশে পড়ালেখার শেষ পর্যায়ে প্রেম শুরু দু’ সহপাঠির। পড়া শেষে বিয়ে ও বিদেশে আসা। উচ্চ শিক্ষা নিতে নিতেই সন্তান জন্মানো। ছেলেটি আগে পড়া শেষ করে কর্ম জীবনে প্রবেশ। মেয়েটি ছোট সন্তান নিয়েই পড়ছে। এরমধ্যেই সংসারে অশান্তি শুরু। ছেলেটির সন্দেহ বাতিক। নিজে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী সমাজের বিশেষ কিছু স্থানে আনাগোনার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলে দোষ নেই! মানসিক নির্যাতন শারীরিক নির্যাতনে রূপ নিয়েছে। মেয়েটি নিরাপত্তার জন্য অন্য কোথাও আশ্রয় নেয়। তাকে “বুঝিয়ে” ঘরে ফেরানো। প্রতিবার নির্যাতনের পর ক্ষমা চাওয়া, নির্যাতকের ছেলেবেলার করুণ কাহিনী (বাবার কাছে মায়ের নির্যতিত হবার ঘটনা) মেয়েটিকে ভুলিয়ে দেয়। আবারও নির্যাতন। শেলটারে আশ্রয়। আবার ফিরে যাওয়া। পড়া শেষে এদেশের বড় টেক কম্পানীতে জব। জব নিয়ে দূরে চলে যাওয়া। কিছু মাস পর আবার ফিরে যাওয়া। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! দশ+ বৎসর এভাবে চলে! তারপরে মেয়েটি শেষ পর্যন্ত বের হয়ে আসে সেই সম্পর্ক থেকে। উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, আত্মবিশ্বাসী নারী অথচ দশটি+ বৎসর লেগেছে! মেয়েটি একটি উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, উচ্চ বিত্ত পরিবারের। এখন সে খুব ভালো আছে।

উচ্চ শিক্ষিত, প্রগতিশীল, বাংলাদেশে বিখ্যাত পরিবার, কর্মজীবী মা সেই যুগের যে যুগে কম নারীই কর্মজীবী ছিলেন। সেই পরিবারের মেয়ে বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করে। বর পরিবারের খুব ঘনিষ্ট। অপরিচিত কেউ নন। যে কেউ মুগ্ধ হবেন আচরণে। ছেলেটির বাবা-মা সেপারেটেড কিন্তু একই বাড়ীতে থেকেছেন সন্তানদের জন্য। বিদেশে বেড়ে ওঠা। মেয়েটি পড়া অবস্থায় বিয়ে করেছিল। বিয়ের পরপরই সন্তান। পড়া শেষে ছেলেটির দেশে আসে। মেয়েটি উচ্চ শিক্ষা নেয়। জবে ঢুকে। ছেলেটি সন্দেহ বাতিক। সংসারে ইনভল্ভড নয়। আরেকটি গুণ কেউ জানে না! পার্ভার্ট। মেয়েটি জানতে থাকে অনেক কিছু। তবুও চেষ্টা করে সংসার টিকিয়ে রাখতে! আরেকটি সন্তান নেয়। এক পর্যায়ে আর পারে না। মেধাবী, কর্মজীবী, আত্মবিশ্বাসী, প্রচণ্ড প্রগতিশীল চিন্তার নারী সময় নেয় দশ+ বৎসর! বাধা আসে প্রগতিশীল নিজ পরিবার থেকে! প্রগতিশীল মায়ের কাছ থেকেও! মেয়েটি ততদিনে বুঝে গেছে জীবনের মানে! আজ একাকীই নিজের জীবন যাপন করছে আত্মবিশ্বাসে। সন্তানদের বড় করছে সিঙ্গেল মা হিসাবে।

জন্মের পর পরই বাবা হারানো মেয়ে। অর্থনৈতিকভাবে উচ্চ বিত্তবান না হলেও পিতার সম্পত্তি ছিল। উচ্চ শিক্ষিত, কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর বিয়ে। এক পর্যায়ে বিদেশে আসা। একটি সন্তান আছে। বর মানসিক থেকে শারীরিক সব ধরনের নির্যাতন করে। আশে-পাশে অনেক রিলেটিভ। যা বিদেশে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। শুধু তাই নয়, রিলেটিভদের সবাই তার পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। একবার বাড়ি ছেড়েও যায়। বাধ্য হয়, সন্তান থাকতে চায়নি নির্যাতক বাবার সাথে। তবুও পরে মেয়েটি ফিরে যায়! কারণ, সে বাবা কী তা জানে না। তার সন্তান যেন বাবার ভালবাসা পায়, সেজন্য সে নিজের জীবন নষ্ট করছে!

আমি অপেক্ষায় আছি, একদিন সেও বুঝবে হয়তো ……………

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.