সহানুভূতি নয়, চাই সহযোদ্ধা

0

রুদ্র মাহমুদ:

মুক্তমনা হলেই নারীবাদী হওয়া যায় না, বলা যায় না নারী মুক্তির কথা।
আপনি সারাদিন প্রগতির কথা বলে অবশেষে ঘরে গিয়ে মা/বোন/ফুফু/বউ/মেয়েকে তাড়া দিয়ে বলবেন, এসি/ফ্যানটা ছাড়ো, এক গ্লাস পানি দাও; পানি দিতে দেরি হলেই ধমক দিবেন কিংবা একটা গালি দিবেন! তবে স্বাভাবিক অর্থে আপনাকে আমি মুক্তমনা বলবো, কিন্তু নারীবাদী না। নারীবাদ আর মুক্তমনাকে এক করে জগা খিচুড়ি বানাবেন না। সকল নারীবাদী-ই মুক্তমনা, কিন্তু সকল মুক্তমনা নারীবাদী না।

এমনও মুক্তমনা আছে, স্বাধীনচেতা, বাক-স্বাধীনতা সহ নানান স্বাধীনতা নিয়ে শাহবাগ, প্রেসক্লাব চেঁচামেচি করে অথচ ঘরে গিয়ে বউকে জোর করে ধর্ষণ করে কিংবা বেশ সন্দেহ বাতিক হয়ে বউয়ের স্ব-ইচ্ছাকে গলা কেটে মারার অভিসন্দিচ্ছু ধারণ করে। এদের আপাদ-মস্তক নারীবাদী বলে কিংবা নারী মুক্তির সংগ্রামে সহযোদ্ধা ভেবে দয়া করে নারী মুক্তির সংগ্রাম কলুষিত করবেন না।

১. নারীবাদী কি বলে হওয়া যায়? কিংবা অসংখ্য নারীর সাথে সখ্যতা করে, ছবির হাট, শাহবাগ কিংবা টিএসসি বসে সিগারেট ফুকলেই নারীবাদী হওয়া যায়? তবে আমি বলবো, এরা নারীবাদ বলতে বুঝে গায়ে গা ঘেঁষে বসা, ফেসবুকে লুতুপুতু করে যৌন আলাপচারিতা, এক পর্যায়ে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব! এমন অনেক মুক্তমনা দেখেছি মেয়েটা নারীবাদী, নাস্তিক শুনলেই জায়গায় হাত ঘষলো, আর আস্তে জিজ্ঞেস করে ‘কাম দেয়া যাবে?’ তবে এদের কি করে আপনি নারী মুক্তির লড়াইয়ে সহযোদ্ধা ভাবেন!(?)

২.
নারীবাদের সাথে ধর্ম ও পুরুষ সাঙ্ঘর্ষিক। যারা বলে নারীবাদ নারীবাদের জায়গায় আর ধর্মের জায়গায় এবং নারীবাদী হতে হলেই যে পুরুষবিদ্বেষী হতে হবে তা নয়, তাদের এক বাক্যে নারীকে অবদমিত করে রাখার মূল হাতিয়ার উল্লেখ করা যায়। আমি কোন কালেই নিজেকে পুরুষ দাবি করিনি। যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে, পারিপার্শ্বিক বিষয় নিয়ে ক্ষুদ্র মস্তিস্কে ভাবনার জগৎ তৈরি করেছি, তখন থেকে সমাজে নারীকে যারা তার ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত করে ঘরকন্যা করেছে, লাঞ্ছিত করেছে, তাদের পুরুষ ভেবে ধিক্কার দিয়েছি। ‘

আমার বাবাও একজন মুক্তচিন্তক, কিন্তু তাকে আমি নারী মুক্তির লড়াইয়ে সহযোদ্ধা ভাবতে পারিনি। কারণ আমার মাকে যখন তিনি বিয়ে করে আনেন তখন তার পরিবারের পৈশাচিকতায় আমার মা কুঁকড়ে যাওয়ার পরেও নীরব থেকে নিজের পরিবারের পক্ষালম্বন করে গেছেন। তাছাড়াও বিয়ের দশ বছর পেরিয়ে গেলেও যখন আমার মা একটা সন্তান গর্ভে ধারণ করতে পারছিলো না, তখন বাবার পরিবারের কটুক্তি ও অত্যাচারে আমার মা যখন অতিষ্ট, তখনও আমার বাবা নিরব। কেননা আমার বাবা একজন পুরুষ। সেও চাইতো তার বউ সকাল হতে রাত অবধি পরিবারের সব কাজ করুক, বছর শেষে বাচ্চা পয়দা করুক। আমার বাবার মতো অনেক মুক্তমনা-ই ভেতরে ভেতরে পুরুষাঙ্গের বড়াই করে। যা এক সময় প্রকাশ পায়। কখনও সরব থাকার মাধ্যমে, কিংবা কখনও নিরব থাকার মাধ্যমে।

৩.
অনেকেই বলে, ‘আমি আমার বউকে চাকরি করতে দিবো’। কেন তুমি তোমার বউকে চাকরি করতে দিবে! তার ইচ্ছার কি কোন মূল্য নেই? সে কেন তোমার দেয়ার জন্য বসে থাকবে? নারী তার মুক্তির লড়াই করে তোমরা পুরুষরা হাতেম তাই এর মত দানবীর হয়ে তাদের অধিকার দিবে বলে নয়। বরং নারী যেন বুঝতে পারে কে পুরুষ, আর কে সহযোদ্ধা! ঘরের ভেতরে যে মানুষটা তার পাশে শুয়ে আছে, সে কি আদৌ সহযোদ্ধা, না জন্ম শত্রু পুরুষ, তা বুঝানোই নারীবাদের মূল লক্ষ্য।

৪.
“নারীবাদ নিয়ে লেখো, ভালো, ধর্ম নিয়ে কেন লিখতে হবে? ধর্ম তো নারীকে বেশি মর্যাদা দিয়েছে। তোমরা কি ধর্মের চেয়ে বেশি মর্যাদা দিবে?” ধর্ম কখনওই নারীকে মর্যাদা দেয়নি, বরং জীবন্ত পুঁতে ফেলা, সতীদাহ প্রথা, নারী শয়তান, নারী পুরুষের জন্য শষ্য ক্ষেত ইত্যাকারে আখ্যা দিয়ে ও পালন করতে বাধ্য করে পুরুষতন্ত্রকে হৃষ্টপুষ্ট করেছে। তাছাড়া আজকে এসেও যখন সমমনাদের মুখে যখন শুনি, নারীবাদী হও তবে রোকেয়ার মতো, তসলিমার মতো নয়, তখন আক্ষেপটা হয় সমমনা পেলাম, কিন্তু যে লড়াইটা করছি তার জন্য সঠিক যোদ্ধা পেলাম না।

নারীবাদ তথা নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় নারী পুরুষ বিদ্বেষী হবেই। এখন কথা হলো, আপনি কি নিজেকে পুরুষ নাকি মানুষ ভাবেন! যদি পুরুষ হয়ে থাকেন, তবে আঘাতটা আপনার অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে অচিরেই ভেবে নারী মুক্তির লড়াইকে কৌশলে যেমন আমার বন্ধু আমার সাথে সিগারেট টানে, আমার বউকে চাকরি করতে দেবো, তার তো নারীবাদী হওয়া দরকার নাই টাইপ কথা বলে পুরুষতন্ত্র হৃষ্টপুষ্ট করবেন নিঃসন্দেহে। আর যদি নিজেকে মানুষ ভাবেন, তবে নিঃসন্দেহে লড়াইটা আপনারও। নারীরা এ লড়াইয়ে সহানুভূতি নয়, একটু সাহস চায়, তার পাশে শুয়ে থাকা, পাশে বসে আড্ডায় রত বন্ধু তার কাছে পুরুষ হয়ে নয়, সহযোদ্ধা হয়ে দাঁড়াবে, এটাই কাম্য।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ৫৪৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.