লড়াইটা যেখানে কর্তৃত্বের; সমাধানের পথও সেখানেই

নাসরীন রহমান:

নারীবাদ নিয়ে আজকাল বিভিন্ন লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয় অনলাইন নিউজ পোর্টালের কল্যাণে। হালের অনেক স্বঘোষিত নারীবাদী, অঘোষিত নারীবাদী, ‘নারীবাদী ‘ তকমা পাওয়া নারীবাদীরা যে যার নিজস্ব চিন্তাধারা ব্যক্ত করেন যার যার লেখায়।

এঁদেরই কেউ কেউ নারীবাদকে দেখেন গুচ্ছ গুচ্ছ চুল কেটে ফেলার মাঝে, কেউ চিৎকার – চেঁচামেচি এবং গালিগালাজ করার মাঝে; কেউ বা আবার ‘হিজাব’ পরিধানের মাঝে খুঁজে পান নারী জীবনের চরম ব্যর্থতা! ‘নারীবাদ’ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা এসব লেখা আমার কাছে বিরক্তিকরই! তবুও অনেক লেখা পড়ি নিছক চোখে পড়ে যায় বলেই; অবধারিতভাবে খানিকটা পড়ার পরই আগ্রহে ভাটা পড়ে পড়ার, সেই একই কথার চর্বিত চর্বণ!

নাসরীন রহমান

‘আলু’ যদি পাঠককে খাওয়াতেই চান তবে একেক দিন আলুর একেক পদই না হয় করুন; কাঁহাতক আলু ভর্তা আর ভালো লাগে? তবুও যদি মূল সমস্যা চিহ্নিত হতো, তা নিয়ে আলোচনা হতো, বুঝতাম তবে। এ যেন ‘বিষবৃক্ষের ‘ শেকড় রেখে মামুলি প্রশাখা নিয়ে টানাটানি!

‘নারীবাদ’ বা ‘নারী মুক্তি আন্দোলন’ বুঝতে হলে আপনাকে গুচ্ছের মোটা মোটা বই পড়তেই হবে, তাই কি? আপনি আপনার বিবেককে জাগ্রত করুন, উপলব্ধির দরজা খুলে দিন, দেখবেন আপনার চারপাশেই প্রতিদিন ঘটে যাচ্ছে নারীর প্রতি ‘বৈষম্যের’ নমুনা!

লেখক এবং সাংবাদিক শান্তা মারিয়া একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন তাঁর একটি নিবন্ধে, তিনি সমতার সমাজ গঠনের কথা বলেছিলেন, কিন্তু আরেকটি কথা যা আলোচনায় এলে আরও ভালো হতো, তা হচ্ছে শুধু অর্থনৈতিক সমতা নয়, দরকার নারী-পুরুষের কর্তৃত্বের সমবণ্টনও।

হালের বিভিন্ন নারীবাদীদের লেখার কথা শুরুতেই উল্লেখ করেছি, সেইসব লেখায় ঘুরে ফিরে আসে, এভাবে এভাবে পুরুষ আমাদের নির্যাতন করেন, ওভাবে করেন, কিন্তু এই নির্যাতনের পেছনের মূল কারণ কী, তাই ভাবতে হবে আমাদের। ‘পুরুষতন্ত্র ‘ নির্যাতক, কারণ তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় নারীর উপর; নারী আজ গোষ্ঠীগতভাবে দুর্বল অবস্থানে, তাই তাঁরা ‘পুরুষতন্ত্র’ দ্বারা নির্যাতিত। ব্যাপারটি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার; নারীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই ‘পুরুষতন্ত্র’ আজ নিপীড়ক আর নারী নিপীড়িত।

আপনারা শুনে থাকবেন, বাম রাজনীতিতে যে শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলা হয়, শোষক – শোষিত শ্রেণীর কথা বলা হয়; নারী মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এই কথাটাই খাটে; এখানে শোষক ‘পুরুষতন্ত্র’ এবং ‘নারী’ শোষিত, কারণ নারী তাঁর প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত; নারী তাঁর সিদ্ধান্ত

গ্রহণের ক্ষেত্রেও স্বাধীন নয়, ‘পুরুষতন্ত্র’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নিপীড়ক পুরুষ, নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই তাঁরা ‘জোর’ খাটায় নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, চলাফেরা, তথা নারীর ‘শরীর’ এর উপরও, এমনকি সবকিছুর উপর।

যতক্ষণ না নারী-পুরুষের মধ্যে এই ‘কর্তৃত্বের’ সমবণ্টন হচ্ছে, ততদিন নারী মুক্তিও তবে সম্ভব নয়;  ‘পুরুষতন্ত্র’ এই কর্তৃত্ব নারীকে স্বেচ্ছায় দিয়ে দিবে এমনটা আশা করাও দুরাশা, পৃথিবীতে কোনও বিপ্লবই সাফল্যের মুখ একদিনে দেখেনি, নারীকে এই কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নিয়ে হোক, সমঝোতা করে হোক, মোদ্দা কথা বুঝে নিতে হবে নারীকেই।

আজ নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার সকল পর্যায়ে, কারণ ক্ষমতার হাতল আসলে পুরুষের নিয়ন্ত্রণে! সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্য সর্বত্র পুরুষের কর্তৃত্ব, আর তাতেই তাঁদের ইচ্ছের প্রাধান্য সর্বত্র, তাদের মতো করে সব! এই কর্তৃত্বটাই এখন সমবণ্টন দরকার।

নারী মুক্তি আন্দোলন তাই নিছক নারীর উপর প্রযুক্ত অন্যায়ের প্রতিবাদ বা প্রতিকার চাওয়ার মধ্যেই সীমিত নয়, বরং নারী মুক্তি মুক্তি আন্দোলন নারীদের শ্রেণী সংগ্রামের লড়াইও বটে।

কলাম লেখক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.