উইমেন্স ম্যারাথন এবং নারীর হেঁশেল

বিথী হক:

শুনলাম ম্যারাথনে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীকে অর্থ পুরস্কারের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সাইজের প্রেসার কুকার। এক সহকর্মী বললেন ’১০ কিলোমিটার দৌড়াইলি কি প্রেসার কুকারের লোভে?’ কি বলা উচিত বুঝে উঠতে উঠতেই সময় ফুরিয়ে গেল। তাই নাকি? ছোটবেলায় দৌড় প্রতিযোগিতায় টিফিন ক্যারিয়ার, প্লাস্টিকের বাটি আর পানি খাওয়ার মগের কথা মনে পড়লো। ১০০ মিটার/২০০ মিটার দৌড়ে ওসব পুরস্কার দেওয়া গেলে ১০ কিলোমিটারে নিশ্চয়ই প্রেসার কুকার দেওয়া যায়। কারণ নারীর ক্ষমতায়ন মানে তো এই না যে নারী রান্ধা-বাড়া বাদ দিয়ে শুধু দৌড়াবে আর দৌড়াবে! এসব চিন্তা-ভাবনা বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগে না।

নারী ক্ষমতায়নকে মোটাদাগে দেখানো ও নিরাপদ শহরের জন্য গত ১০ই মার্চ অয়োজিত হয়েছিল ঢাকা উইমেন্স ম্যারাথন ২০১৭। বরাবরের মতো এবারেরও আয়োজক এভারেস্ট একাডেমি এবং সাথে ছিল বিএনসিসি। আমিও গিয়েছিলাম দৌড়াতে। আত্মবিশ্বাস ছিল পারবই, তবে কত সময় লাগবে জানতাম না। ৯০ মিনিটে ১০ কি.মি দৌড়াতে পারি কী না, সেটা পরীক্ষা করাটাই ছিল মূল লক্ষ্য। ব্যাকপেইন থাকায় অগত্যা একটা নাপা এক্সট্রা খেয়ে দৌড়ানো শুরু করেছিলাম, আধাআধি দৌড়ানোর পর ওষুধের গুল্লি মেরে শুরু হল ভয়াবহ ব্যাকপেইন। তারপর শরীর বলে একটা জিনিস আছে সেটা ভুলে গিয়ে নব্বই মিনিটেই ১০ কিলোমিটার শেষ করেছি।

ধরেই নিতে পারি খুব গতানুগতিক চিন্তা-ভাবনার মেয়েরা খেয়ে-দেয়ে কোনরূপ পুরস্কার প্রত্যাশা করে ১০ কিলো দৌড়াবে না। কিন্তু পুরস্কার একটা পেয়ে গেলে উৎসাহ কাজ করে, পরবর্তী সময়ে এমন অনেক ইভেন্টে অংশগ্রহণ করার জন্য এক প্রকার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। সেই উৎসাহ আর আত্মবিশ্বাসে প্রেসার কুকারের সিটি কতখানি একটা মেয়েকে ওপরে তুলবে তা আমি জানি না। শুধু এতখানি জানি নারী দৌড়ে ১০ কিলো অতিক্রম করুক বা ১০ হাজার বর্গমাইল, এই সমাজ আর একটা সিস্টেম নারীকে রান্নাঘরে ছাড়া আর কোথাও প্রবেশের অনুমতি দেবে না।

এই যে এত এত সংগঠন নারী-ইস্যুকে খিচুড়ি বানিয়ে ব্যবসা করছে, ফান্ড রেইজ করছে, ম্যারাথনের মতো ইভেন্টের আয়োজনও করছে তারা কিন্তু জেনেশুনেই সাপও মারে আর লাঠিও না ভাঙ্গে এমন কৌশলেই এগুচ্ছে। আয়োজক এভারেস্ট একাডেমি বলতেই পারে ‘টপার’ ইলেক্ট্রনিক্স পার্টনারশিপে ছিল। তাহলে প্রেসার কুকার না দিয়ে কী মাইক্রোওয়েভ ওভেন দেবে? প্রথমত একবারও কেউ কি ভেবেছেন, এভারেস্টের মতো স্বনামধন্য একটা এডভেঞ্চারাস প্রতিষ্ঠানের জন্য স্পন্সরের অভাব পড়েছিল? আর যদি পড়ে থাকে তাহলে সেটা অনেকগুলো ধরনের মতো এক ধরণের ব্যর্থতা।

যে মেয়ে ঘরে থাকেনা, শুধু দৌড়ায় তাকে কেন প্রেসার কুকার দিয়ে পুরস্কৃত করতে হবে তাই তো আমার মাথায় ঢোকে না। সে তো সেরা রাঁধুনী বা মাস্টারশেফে যেতে পারত, তাতে করে সংসারের সব জিনিসপাতি এমনি এমনিই চলে আসত, কেন ম্যারাথনে আসল? একটা জুতার ব্র্যান্ড, ব্যাকপ্যাক প্রসাতুতকারী ব্র্যান্ড বা স্লিপিং-ব্যাগ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানও কি এগিয়ে আসেনি? বাদ দিলাম সব। একটা মুঠোফোনের ব্র্যান্ডও ১৭৯০ টাকা করে তিনটে ফোনসেট দিতে এগিয়ে আসেনি? ঢাকা শহরে ২ কোটি মানুষের ভেতর ৫০ হাজার নারী হলেও অংশগ্রহনকারী নারী কিন্তু ছ’শো, সাতশো’। এসব মেয়েদের ডেকে এনে ক্ষমতায়নের নামে হেঁসেলে ঠেলে দেবার এই কূটকৌশলের নিন্দা জানাই।

এতো গেল শুধু পুরস্কার বিড়ম্বনা। এমন খাপছাড়া, বাজে ব্যবস্থাপনার ইভেন্ট আমি জীবনে কম দেখেছি। এতগুলো মেয়ে দৌড়াবে, তাদের জন্য টয়লেটের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অনেক বলে বলে পরে একটা মোবাইল টয়লেট এনে মেয়েদের সান্ত্বনা দিল।

সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা ছিল ব্যাগ ডিপোজিট কাউন্টারে। কোন স্বেচ্ছাসেবক ছিল না, ভাবলাম বাহ্ আমরা সভ্য হয়ে গেছি বোধ হয়। এসব চুরি-চামারিতে আমাদের আর আগ্রহ নাই। কিন্তু দৌড় শেষ করে এসে দেখলাম আমার সহকর্মীর ব্যাগ উধাও, আমার ব্যাগেরও ওপরের চেইন খোলা। মুসা ইব্রাহীম ভাইকে ডেকে বললাম। উনি এতোই বিব্রত ছিলেন যে আমারই কথা বলতে লজ্জা লাগছিল। তবে তিনি কথা বলতে বলতে শেষে আমার সহকর্মীর হাতে ১৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ গুঁজে দিলেন। বারবার বললাম, ক্ষতিপূরণটা না দিয়ে ফোনগুলো খোঁজার ব্যবস্থা করলেই খুশি হবো। উনি সম্ভবত খুব ব্যস্ত ছিলেন, তাই আমাদের কথায় পাত্তা এবং দেওয়ার মতো সময় কোনটিই ছিল না। তিনটে ফোন আর এক হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ সর্বসাকূল্যে ১৫ হাজারে সেরে ফেললেন।

এই যে নারীদের এভাবে টেনে তুলে প্রাগৈতিহাসিক চিন্তাধারা দিয়ে ক্ষমতায়নের চেঁচানি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া, এরপরেও কিন্তু নারীরা দৌড়াতে যাবে। যাবে কারণ এ দেশের চোখ-মুখ খোলা বোহেমিয়ান নারীদের জন্য কোন সুযোগ কেউ করে দেয় না। তাই প্রেসার কুকার, স্যানিটারী ন্যাপকিন যাই দিক; নারীরা দৌড়ানোর জন্য দৌড়াবে। ব্যাগ, ফোন, টাকা-পয়সা সব হারিয়ে নি:স্ব হয়ে গেলেও দৌড়াবে। ম্যারাথনের ১০ কিলোমিটার নয়, এখন নারীরা দৌড়ায় নিজের পা শক্ত করতে বা পায়ে শক্তি আছে বলে।

মুসা ভাই, এমন ইভেন্ট অনেক হয় না। একটা দায়িত্ব যখন কাঁধে নিয়েছেন তখন ইভেন্টটা সমৃদ্ধ করুন, যুক্তিবাদী ইভেন্ট গড়ে তুলুন। নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে এরপর থেকে কথা বলার আগে তাই এর চর্চাটাও জরুরী। আশা করি পরবর্তী ইভেন্টগুলোয় আরো যত্ন নেবেন। তখন দেখবেন নারীরা নিজের ক্ষমতায়ন অন্যের হাতে বয়ামবন্দী করে তুলে দেন না, কারো থেকে ঝগড়াঝাটি করে কেড়েও আনে না। নিজের ক্ষমতায়ন নিজের কাছে থাকে। পারলে সুযোগ তৈরি করুন, প্রাসঙ্গিক স্পন্সরের সাথেই কাজ করুন! আমরা সারাজীবন দৌড়াতে থাকবো।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.