কন্যারা ‘আত্মবিশ্বাসী’ হোক, পুত্ররা “মানুষ” হোক (১)

তানিয়া মোর্শেদ:

ক’দিন আগে পথের পাঁচালী আবারও দেখলাম দীপ্তর জন্য। দূর্গাকে যখন মা লম্বা চুল মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন মনে হয়েছে! দু’দিন পর চ্যানেল আই-এর এক নাটকে গ্রামের এক মেয়েকে তার সুন্দর লম্বা চুলে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে ধর্ষক মোড়োলের কাছে, তখনও মনে হয়েছে! কোথায় যেন পড়েছিলাম, ১৯৭১-এ পাকিস্তানী সৈন্যরা ক্যাম্পে নারীদের নিজের লম্বা চুল দিয়েই ঝুলিয়ে রাখতো! আবার এও পড়েছিলাম, নারীর লম্বা চুল কেটে দিতো। যেন সে নিজের চুল দিয়ে ফাঁস তৈরি করতে না পারে আত্মহত্যার জন্য!

পথের পাঁচালী আর নাটকের দৃশ্য দেখে কী মনে হচ্ছিল! মনে হচ্ছিল নারীর লম্বা চুল কেবল সৌন্দর্য্য বর্ণনার বিষয় নয়। সময় সময় এটা তাকে আক্রমণ করার লক্ষ্যে ব্যবহার করা যায়। বাংগালী নারীর লম্বা চুল কবি সাহ্যিতিকদের লেখার বিষয় বহু কালের। একই ভাবে নির্যাতকের হাতিয়ারও বহু কালের! চুল কেবল নির্যাতক বরই ধরে না! দু’জন নারী যদি কখনো একে অপরকে আক্রমণ করে তখনও দেখা যায় এই চুল ধরার ব্যাপারটি।

আটই মার্চে ফেইসবুকে দেখা গেলো চুলের তেলের একটি অ্যাড। এক নির্যাতিত নারী পার্লারে গিয়ে তাঁর লম্বা চুল ছোট করে কাটতে বলছেন। যেন কেউ আর চুল ধরতে না পারে নির্যাতনের জন্য। আর্মিদের চুলও কিন্তু খুব ছোট রাখে একারণে। শত্রুপক্ষ যেন চুল ধরে আটকাতে না পারে।

অ্যাডটি নিয়ে কিছু লিখবো ভেবেছিলাম। লেখা হয়নি। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এর মধ্যে ফেইসবুকে দু’বন্ধু লিখেছেন যৌক্তিকভাবেই, কেন নারী চুল কাটবে? কেন নির্যাতকের হাত ভেঙ্গে দেবে না? অ্যাডটি ভালো মেসেজ দেয়নি।

এ প্রসঙ্গে বলি, বাংলাদেশের টিভিতে যে সব অ্যাড দেখায় (যা বাংলাদেশ ও ভারতের তৈরি) তার ৯৫ ভাগই কোনো না কোনো ভাবে পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট। নারীর অবমাননা, বর্ণ বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিকতা, কী নেই এসবে? ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অনেক অনেক নেতিবাচক জিনিস শিখছে এসব থেকে। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি থেকে শুরু করে কাপড় কাচা সাবান, কোথায় নেই নেতিবাচক মেসেজ!

আমার সেই দু’বন্ধুর সাথে একমত, নারী কেন চুল কাটবে নির্যাতকের হাত রুখে না দিয়ে? তবে আরও কিছু কথা আছে। মানুষের জীবন ডিজিটাল নয়। এখানে কেবল জিরো আর ওয়ানই থাকে না। আরও অসংখ্য নাম্বার আছে জিরো আর ওয়ানের মাঝে। সেভাবেই অ্যাডটিকে পুরোই নেতিবাচক হিসাবে দেখতে পারিনি।

তানিয়া মোর্শেদ

প্রথমত অ্যাডে কোথাও বলেনি নির্যাতক বরের সাথেই থাকো। অ্যাডে কিছু কথার সাথে একটি নাম্বার দিয়েছে পরামর্শের সহায়তার। আমি এনিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। এক বন্ধু (সুপ্রীতি) সেখানে ফোন করে আমাকে জানিয়েছে, সেটি একটি হটলাইন। ডাক্তার, মানসিক সাপোর্ট আছে অন্যান্য বিষয়ের সাথে। অ্যাডটি প্রথমবার দেখার সময়ই এই বিষয়টিই আমার প্রথম নজর কাড়ে। আমি কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, লিখবো নির্যাতিত নারী ও শিশুর শেল্টার হোম নিয়ে। বাংলাদেশে ভীষণভাবে প্রয়োজন এই কেন্দ্রের। অল্প কয়েকটি আছে জানি। তবে তা প্রধানত এবং সম্ভবত ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ। আর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই নয়। তো এই অ্যাডে যখন দেখলাম হটলাইন আছে নারীর জন্য, তখন মনে হয়েছে, কেউ তাহলে কাজ করছে! সম্ভবত আরও কিছু হটলাইন আছে দেশে।

আরেকটি বিষয়টি নিয়েও লিখবো ভেবেছি, হয়নি এখনও। Battered women’s syndrome. অনেক নারী নির্যাতিত হতে হতে এমন এক পর্যায়ে যান যে তাঁরা নিজেরাও জানেন না তিনি যেভাবে ভাবছেন তা কতটা ভুল বা অযৌক্তিক। মানসিক যে কোন অসুস্থতা যেমন সেই রুগীর স্বাভাবিক চিন্তা রুদ্ধ করে অনেক সময়, সেরকম এই ব্যাটার্ড উইমেন্স সিন্ড্রোমে ভোগা নারীও স্বাভাবিক ভাবে অনেক কিছু ভাবেন না। নির্যাতক বর বা প্রেমিক যখন ক্ষমা চায়, বোঝায় আর কখনো এমন হবে না, সে নিজেও শিকার ছোটবেলায় নির্যাতনের (সত্যিই তাই), সে জীবন দিয়ে ভালবাসে ইত্যাদি। সম্পূর্ণ উলটো কথাও বলতে পারে। সব দোষ মেয়েটির। সে যদি দোষ না করতো এসব কিছুই হতো না ইত্যাদি। মেয়েটি এসব সত্যি বিশ্বাস করে।

অনেক নারী এই অবস্থায় অনেক অনেক বৎসর কাটিয়ে দেন। কেউ কেউ এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন। বেরিয়ে আসেন সেই নির্যাতিত জীবন থেকে। আবার কেউ কেউ সারা জীবন এভাবে থেকে যান। কেউ কেউ নির্যাতকের হাতেই মৃত্যু বরণ করেন। নির্যাতন সব সময় শারীরিক নয়। নির্যাতন শারীরিক, মানসিক যে কোনো একটি বা দুটোই হতে পারে। অনেক মানুষকেই দেখা যায় কেউ আত্মহত্যা করলেই সেই মানুষটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে! চুলচেরা বিচার তাঁর জীবন নিয়ে, কেন সে আত্মহত্যা করলো, এতো বোকা কেন, এতো ভীতু কেন, কী মেসেজ দিলো সমাজকে, ইত্যাদি। যারা এসব বলেন একতরফা ভাবে, তারা ভুলে যান মানসিক অসুস্থতা অনেক সময়ই শারীরিক যে কোনো কঠিন অসুস্থতার থেকেও ভয়ঙ্কর। শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে নাই নাই করেও কিছু মানুষ কথা বলেন। কিন্তু মানসিক অসুস্থতা নিয়ে কথা কেউ বলতে পারেন না। এটা ভীষণভাবে ট্যাবু পৃথিবীর সর্বত্র।

যে নারী ব্যাটার্ড উইমেন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত তাঁকে সমালোচনা না করে তাঁর পাশে সহযোগিতার হাত নিয়ে দাঁড়ানোই একমাত্র পথ। ঠিক যেভাবে মানসিক অসুস্থতার শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মানসিক অসুস্থতা যেমন যে কোন মানুষের হতে পারে, তেমনই ব্যাটার্ড উইমেন সিন্ড্রোমে যে কোন নির্যাতিত নারী ভুগতে পারেন। অশিক্ষিত-উচ্চ শিক্ষিত, নিম্নবিত্ত-উচ্চবিত্ত,কর্মজীবী-“কোন কিছু না করা নারী” ইত্যাদি।

অ্যাডটি দেখে আমার মনে হয়েছে, মেয়েটি একটি পা এগিয়েছে নির্যাতনের বিরুদ্ধে। যে চুল ধরে নির্যাতন করা হয়, সেই চুল কেটে প্রতিবাদ শুরু। হ্যাঁ তার যেতে হবে অনেক দূর। তবে শুরুটা তো করেছে সে!

আর যে নারী পথে নামেন তিনি কিন্তু একদিনেই নামেন না। সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, সন্তান ও সন্তানের বেড়ে ওঠার চিন্তা এবং অনেক অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর জন্মগত পরিবার (নিজের মা-বাবাও) তাঁর সাথে নেই এই যাত্রায়! সেখানে একজন নির্যাতিত নারী পথে নামার আগে বহুবার ফিরে যান সেই নির্যাতকের কাছেই! সেই নারী যেন প্রথমবার চুল মুঠি করে ধরায়, প্রথম চড়েই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নিজের পথ খুঁজে নেওয়ায়, আসুন, আমরা সবাই তাঁদের সেকথায় বিশ্বাসী হতে নিজেদেরও তৈরী করি। কন্যাদের শেখাই আত্মবিশ্বাসী হতে, পুত্রদের শেখাই “মানুষ” হতে।

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.