সৈয়দ হক এর লিসবেথ-ইস্পাতের পাখী

0

ইশরাত জাহান ঊর্মি:

সৈয়দ শামসুল হকের পুরুষ চরিত্র নির্মাণ এক সামাজিক বাস্তব। সে চরিত্রগুলো ঠিক বানিয়ে বানিয়ে লেখা নয়। পুরুষের মস্তিষ্কে যা বাস করে তার নিপুণ কারিগর তিনি। পুরুষ বলেই কি?

আমরা বাবর আলীকে পাই। “নিষিদ্ধ লোবান” এর মেজরকে পাই, বাঙালী নারীর গর্ভে যে খাঁটি মুসলমান এর বীজ পুঁতে দিতে চেয়েছিল। তাঁর অধিকাংশ গল্প, উপন্যাস আর কবিতাতে নারী তার বিখ্যাত শরীর নিয়ে হাজির হয়। সে ‘নিষিদ্ধ লোবান’ এর বিলকিস হোক অথবা “পরাণের গহীন ভিতর” এর নারীটি। যে নারীর গহীনে হাহাকার,

“আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দু:খ দ্যায় ক্যান? ক্যান এত তপ্ত কথা কয়? ক্যান পাশ ফির‌্যা শোয়? ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান ক্ষ্যাতে রোয়?”

নারী “ধানক্ষ্যাত” সমমান। সেখানে “বিছন রোয়া” যায়। অথবা “পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়” এর মাতবরের কন্যা। সৈয়দ হক জানান, তার সম্ভ্রম গেছে। তারই পিতা তাকে তুলে দিয়েছেন পাকিস্তানী ধর্ষকদের হাতে। মাতবরের কন্যা এই ঘটনা জনগণের সামনে জানায়,

“আমার কী আছে আর? গ্যাছে সুখ, য্যান কেউ নিয়া গ্যাছে গাভীনের বাঁটে যতটুক দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহন দিয়া…”

এবং মাতবরের কন্যা বাবার অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে আত্মাহুতি দেয়।

সৈয়দ হক এর এইসব নারী চরিত্র পড়লে সাহিত্য রস নিশ্চয়ই আস্বাদিত হয়, কিন্তু কোথায় যেন নারী হিসেবে একটা অপমান আর অবমান, একটা বানানো ইনসিকিউরিটি ফিলিং হয়। পড়লে নেশা হয়, কিন্তু সেটা অস্বস্তিকর নেশা।

এই সবকিছুর বিপরীতে আজ একটা উজ্জ্বল চরিত্রের কথা লিখতে বসেছি। নারী চরিত্র। সৈয়দ হক চরিত্রটি সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, “কল্পনায় আমি নির্মাণ করে নিয়েছি…” নূরুলদীনের সারাজীবন এর লিসবেথ।

কোম্পানী কুঠিয়াল টমসন এর স্ত্রী সে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সারা যাকেরকে এই চরিত্রে অভিনয় করতে দেখতাম। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উঠানে হতো নাটক। দর্শক চারপাশে বসা। লিসবেথরূপী সারা যাকের লাল গাউন পড়ে পুরোন বাড়িটির (জাদুঘরের)প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলে ঐ নাটকের দর্শকরা নড়েচড়ে স্থির হয়ে বসতেন। নূরুলদীনের স্ত্রী আম্বিয়া যখন মুখে কাপড় দিয়ে আব্বাসকে নূরুলদীনের না থাকার টেনশন বর্ণনা করে এই ভাষায়-

ভাইজান নারীর অন্তর জানে/ অন্তরে কি হয় তার/ জংগে যদি যায় পতিধন। ইয়ার চেয়ে যে শান্তি নিজের মরণ/ সর্বক্ষণ কি হয় কি হয় করে অন্তর যখন…

দর্শক মজা পায়, উপভোগ করে, কিন্তু যখন শ্বেতাঙ্গিনী লিসবেথ নামে মঞ্চে, দর্শক একটু উৎকর্ণ হয়। কারণ কী? জ্বী আমার তাই মনে হয়। ব্যক্তিত্ব।

লিসবেথ টমসনের স্ত্রী। রংপুরের কালেক্টর গুডল্যাড সন্দেহ করে দুই “উষ্ণ রক্তসম্পন্ন” তরুণ কোম্পানির ফৌজি অফিসার ম্যাকডোনাল্ড আর রেভিনিউ সুপার ভাইজার মরিস দুজনেরই মাথা খাচ্ছে সুন্দরী লিসবেথ। যারা লিসবেথ এর বন্ধুত্বে সুখী হয়ে কোম্পানির প্রতি কর্তব্যকর্মে অবহেলা করছে।

গুডল্যাড তাকে বলে,

লিসবেথ শিশু নও, বালিকাও নও

সুন্দরী বটে তুমি; আর- এটা প্রশংসা করছি

মহিলার করোটিতে পুরুষের মস্তিস্ক তোমার।

লিসবেথ নির্মোহ এবং কিছুটা ফালতু কথা শুনছে এমন ভঙ্গীতে বলে,

ধরে নিচ্ছি প্রশংসাই এটা। তারপর?

গুডল্যাড এর ভিত্তিহীন সন্দেহের জবাব লিসবেথ দ্যায়। এই জবাবের মধ্য দিয়েই একজন দৃঢ়, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, উজ্জ্বল এক নারী আমাদের সামনে আরও স্পষ্ট হয়। লিসবেথও এসেছেন পুরুষের অংকশায়ীনি হয়েই, ব্রিটেন থেকে “ঈশ্বর বর্জিত” বঙ্গদেশে এসেছেন তিনি। তিনিও এসেছিলেন কটুগন্ধী কৃষ্ণকায়া রমণীর আলিঙ্গন থেকে কোম্পানির যুবাকে বাঁচাতেই।

কিন্তু এটুকুই কি? লিসবেথ এর ইতিহাস হওয়ার লক্ষ্য ছিল। তাই সে উত্তরে শীতল আর স্থির কণ্ঠে জানায়,

…যেদিন এই ইন্ডিয়ায় ব্রিটেনের রাজদণ্ডধারী রাজপুরুষের কাছে, এইসব রূপকথা বলে মনে হবে যেদিন, যেদিন ইন্ডিয়ায়

মশা,মাছি, জ্বর কিংবা আমাশয় নয়,

স্বাস্থ্য, মেদ আর ত্বক উজ্জ্বল গোলাপী

গ্রীষ্মে পাখা, সোরাহির জল, শৈলাবাস, শিকার,

বিশ্রাম, ল্যান্ডো

মশালচি-খানসামা-নৌকর-গোলামসেবিত এ ইন্ডিয়াকে

অদূর যে ভবিষ্যতে , যেদিন যেদিন ভূতলে অতুল স্বর্গ মনে হবে

সেদিন স্বদেশে

আর্কাইভ, লাইব্র্রেরি, ইন্ডিয়া হাউসে

আমি জানি কোন গবেষক

কোম্পানীর ডেসপাচ, রিপোর্ট, মেমোস সব পাশে ফেলে রেখে

সন্ধান করবে কিছু ব্যক্তিগত চিঠি, দিনপঞ্জী-

কার?

সেইসব মহিলার,

যারা এই ঈশ্বর বর্জিত দেশে

আর কিছু নয় শুধু ঈশ্বর নির্ভর করে

একদিন এসেছিল পিতামাতা ছেড়ে…

এই শ্বেতাঙ্গীনি রাজনীতি কূটনীতি নয়,

তারও চেয়ে গুরুতর কর্তব্যসাধনে রত ছিল এই ইন্ডিয়ায়…

লিসবেথ এর মতো আসলেই কেউ এসেছিল কিনা তা অজানা। কল্পনা থেকে সংগ্রহ করা এই নারী চরিত্রটি সৈয়দ হকের অন্যান্য নারী চরিত্র থেকে কিছুটা আলাদা।

লিসবেথ জানান দ্যায়, পুরুষের কামনার ধন হওয়ার চেয়েও তার আলাদা আরেকটা মিশন আছে। কোম্পানির পতাকা যাতে ইন্ডিয়ায় ঠিকঠাক ওড়ে, সেজন্যই অজানার হাত ধরে তার জাহাজে ওঠা। লিসবেথ সুন্দরী, কিন্তু সমীহ জাগানিয়াও বটে। সুন্দরী আবার একইসাথে শক্তিমতী। লিসবেথ এর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তাকে অস্বীকার করা যায় না।  

লিসবেথ এর উত্তর শোনার পর গুডল্যাড ভাবতে থাকে আনমনে,

আমি অনেক ভেবেছি, বংগদেশে বিভিন্ন কুঠিতে,

নিমন্ত্রণ রক্ষা করে ফেরবার পথে

অনেক ভেবেছি আমি প্রায় ভেবে থাকি-

এমনও কি হতে পারে-ইস্পাতের পাখি?

… আসলে গুডল্যাড নয়, সম্ভবত, গুডল্যাড এবং অপরাপর কামুক বাবর আলীর স্রষ্টা সৈয়দ হক এবং সমগ্র পুরুষকূলই এই কথা ভাবতে থাকে, বিস্মিত, চিন্তামগ্ন-

“এমনও কি হয় ইস্পাতের পাখী?”

 

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.