হাইহিল ফাঁদ

0

নাসরীন মুস্তাফা:

প্রিয় লেখক শান্তা মারিয়া পায়ে কেডস জুতো পরে চলেন এবং বলেনও, কয়েক দিন আগে উইমেন চ্যাপ্টারেই তার এক লেখাতে পড়ে খুব ভালো লেগেছিল। তখন থেকেই ভাবছিলাম, দৈহিক উচ্চতা মাপামাপির অধিকার এই সমাজকে কেন দিতে হবে? আমি নিয়মিত শাড়ি পরি, উচ্চতা কম থাকা সত্ত্বেও কেডসও পরি। শাড়ির সাথে কেডস মানায় না, লম্বা দেখায় না, এমন কথা শুনে প্রশ্ন করে জেনেছি, হাইহিল না পরলে নাকি শাড়ির সৌন্দর্য খোলে না, নারীরও না।

দিন যাপনের হাই স্পিড দৌড়ে শাড়ি আমাকে ঝামেলায় ফেলে না, ভালবাসার সাথে অভ্যস্ততা মাখামাখি হয়ে আছে। পায়ের কেডস জুতো নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, কেননা আকাঙ্খিত গতি চাইলে এর জবাব নেই। যারা শাড়ি পরেন না, তাদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। গতি চাইলে কেডস জুতোর সত্যিই কোন জবাব নেই। এর সাথে যদিও ‘কিন্তু’ মেরে দিয়েছে বিজ্ঞ সমাজ।

কেডস পুরুষালি, কেননা গতি পুরুষের চাই। গতি নারীর জন্য নয়। চীনা নারীদের সুন্দরী হতে হলে পা ছোট রাখার জন্য ছোট্ট জুতা পরে থাকতে হয়। নারীর লাগবে সৌন্দর্য, পুতুপুতুনেস, টুকটুক ঠিকঠাক…ঠিক একই কারণেই নারীর জন্য হাইহিল। হ্যাঁ, সমাজ নারীর পায়ে হাইহিল দেখতে ভালোবাসে, কেডস নয়।

মানুষ নিজেকে রক্ষার জন্য যত রকম আবিস্কার করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিস্কারগুলোর তালিকা দাঁড় করালে জুতা নিঃসন্দেহে থাকবে প্রথম সারিতে। যদিও জুতার ইতিহাস মানুষের ক্ষমতা দখলের ইতিহাসের মতো কাল-ময়লা। যার জুতা নাই তার কিছু নাই।

১০০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসে একটি আইন জারি করা হয়েছিল। ক্রিতদাসদের অবশ্য অবশ্য খালি পায়ে থাকতে হবে। ক্রিতদাসদের দেখেই সহজে যাতে চিনতে পারা যায়, সেজন্যই এই আইন করা হয়েছিল। খালি পা মানেই দাস, আর জুতা পরা মানে দাসের মালিক! খালি পা মানে নিঃস্ব- এই ধারণা থেকে এখনো বের হতে পারেনি আধুনিক মানুষ। লাঠি দিয়ে পেঠালে অত লাগে না, যতটা লাগে জুতা দিয়ে পেটালে।

জুতার নানান রকমের মধ্যে হাইহিল জুতা এক রকম। বিশ্ব বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, আবিস্কারক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯) এর আবিষ্কারক। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার সময় পা যাতে ঘোড়ার শরীরে বাঁধা স্ট্র্যাপের সাথে ঠিকমত আটকে থাকে, সেজন্য সোলটাকে হিলে রূপান্তরিত করা হয়। স্বয়ং লিওনার্দোও ভাবেননি যে এই হিল একসময় মেয়েদের সম্পত্তি হয়ে দাঁড়াবে। মেয়েরা প্রথম হিল জুতা পরেছিল নিজেকে স্বামীর পাশে মানানসই উচ্চতায় রাখার জন্য। ১৫৩৩ সালে ইতালির ডিউক অব অরলিয়ানস বিয়ে করে ঘরে তুললেন ১৪ বছরের ক্যাথেরিন দ্য মেডিসিকে। এই প্রথম এক নারী বিয়ের পোষাকের সাথে দুই ইঞ্চি উঁচু হিল পরে বিয়ের মন্ত্র পড়লেন।

ব্লাডিমেরির নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই, ভয়ংকর রক্তপিপাসু শাসক হিসেবে মেরি ট্যুডর (১৫৫৩-১৫৫৮) কুখ্যাতি পেয়েছিলেন। নিজের ক্ষমতা দেখানোর অন্যতম উপায় হিসেবে তিনি জুতার হিল যতটা পারা যায় উঁচু করেছেন। মূলতঃ এই সময় থেকে ছেলে এবং মেয়ে, উভয়ের জুতাতেই হিল ব্যবহৃত হতে থাকে ব্যাপকভাবে।

ঊনিশ শতক পর্যন্ত এভাবেই চলেছে। স্পেন এবং ফ্রান্সে মেয়েদের জুতায় কর্ক কিংবা কাঠের তৈরি অতি উচ্চ হিল যোগ করা হতে থাকে, কখনো কখনো হিলের উচ্চতা ২৪ ইঞ্চিও হচ্ছিল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সপিন’। এই জুতা পরে মেয়েরা দু’জন সাহায্যকারীর মাঝখানে থেকে তাদের দু’হাত জাপটে না ধরে হাঁটতে পারতো না। কাজে কাজেই সপিন ধনী ঘরের মেয়ে-বউরা ছাড়া আর কেউ পরতো না। কারণ, এরকম দু’জন সাহায্যকারী দাসী পোশার ক্ষমতা তো সবার ছিল না।

উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর হেমলেট নাটকের এক জায়গায় লিখেছেন, ‘‘ By’r lady, your ladyship is nearer to heaven than when I saw you last, by the altitude of a chopine. ’’

কিন্তু লোকে যে বলে, কোন এক ধনী স্বামী বড় জ্বালায় পড়ে এত উঁচু জুতা আবিস্কার করেছিলেন যাতে তার সুন্দরী বউ হুটহাট যেখানে সেখানে চলে যেতে না পারে ! বউটাও বোকা, তাকে আরো বেশি সুন্দর দেখা যাবে, স্বামীর এই যুক্তিতে ভুলে পায়ে তুলে নিলো বিপদজনক বোঝাটাকে, যা তার এগিয়ে যাওয়ার কাঁটা। ঐ সময়ে ভেনিস পর্যটনে যাওয়া বহু বিদেশী পর্যটক ও ভ্রমণার্থীদের লেখা থেকে এমনটিই জানা গেছে।

স্প্যানিশ পাদ্রী তালাভেরা ১৪৩৮ সালে দিকে সপিন যারা পরে, সেই সব নারীদেরকে বলেছিলেন দূষিত নৈতিকতা বোধসম্পন্ন চরিত্রহীন নারী- ‘‘ depraved and dissolute women ’’।
কালে কালে এই সপিন ধনীর ঘর ছেড়ে পতিতালয়ে ঠাঁই নেয়। রূপোজীবী নারী ক্লায়েন্ট সংগ্রহের জন্য উচ্চতায় আরোহন করে দাঁড়িয়ে থাকতো গলির মুখে। যে যত উঁচুতে দাঁড়াতো, তাকে ভদ্রলোকেরা সহজে দেখতে পারতো, দ্রুত জুটে যেত ব্যবসা। এ কারণেই পতিত রমনীদের কাছে সপিনের মর্যাদা ছিল অনেক উপরে। সপিনের গায়ে কলংকের কাদা লেগে যাওয়ায় একে নিষিদ্ধ করে আইনও পাশ করা হয়েছিল।

বিয়ের বন্ধনকে অটুট রাখতে যেকোনো বয়সের, মর্যাদার, পেশা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার কুমারী বা বিধবা নারীর জন্য প্রযোজ্য এই আইন অনুযায়ী সৌরভ, মুখরঞ্জন, প্রসাধনী, নকল দাঁত, নকল চুল, স্প্যানিশ উল, আঁটোসাটো বক্ষবন্ধনী, উঁচু হিলবিশিষ্ট জুতা কিংবা পাশ বালিশের মতো দেখতে নিতম্ব দেখিয়ে মহামান্য রাজার পুরুষ সভাসদদের বিয়েতে প্রলুব্ধ করে কিংবা বিয়ের বিশ্বাসের হানি ঘটায়, তাহলে উক্ত নারীকে ডাকিনী বা যাদুকরদের জন্য বরাদ্দ শাস্তি পাওয়ার বিধান ছিল।

ফরাসী বিপ্লবের সময় ধনী আর অভিজাত শ্রেণীর প্রতি নিঃস্বদের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল মারাত্মকভাবে। সেই সময়ে জুতার হিলের ব্যাপারে যে মানসিক প্রতিক্রিয়া হ’লো, তা হচ্ছে, উঁচু হিল আভিজাত্যের প্রতীক। ধনী নারী-পুরুষ উঁচু হিল পরে ঠক্ ঠক্ করে হেঁটে যায়, সেই শব্দে জানিয়ে যায় তাদের কত কী আছে! রানী মেরি আন্টোনেকে গিলোটিনে মৃত্যুবরণ করতে হ’লো এই অপরাধে যে, তিনি উঁচু হিল পরে আভিজাত্য দেখিয়েছেন। এভাবে হিলকেও গিলোটিনে চড়ানো হ’লো।

এর পর জুতার ডিজাইন পাল্টে গেল একদম রাতারাতি। ধনীদের শাসন ছিল বিপ্লবের আগে, তার প্রমাণ ছিল তখনকার জুতার ডিজাইনে। বিপ্লবের পরে পতন হলো ধনীর, জয় হলো গরীব শ্রমিক শ্রেনীর, জয় হলো গণতন্ত্রের। জুতা দেখে আর ধনী-গরীব চেনার ব্যাপারটা থাকলো না। রাতারাতি হাওয়া হয়ে গেল জুতার হিল। রাস্তাঘাটে আর শোনা যায় না ঠক্ ঠক্ ঠক্….অর্ডার অর্ডার অর্ডার !

জুতার ইতিহাস পুনঃপঠিত হতে শুরু করেছে বিশ শতকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যাদের সবচেয়ে পাল্টে দিল, তারা হচ্ছে কিশোর বয়সী বা সদ্য কৈশোর পেরুনো তরুণদের। পুরুষরা চলে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে, সংসারের সাথে সাথে ফ্যাক্টরি সামলাচ্ছে মেয়েরা। ফ্যাক্টরি সামলানোর মানে তো উৎপাদন ঠিক রাখার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে ঘরে লাভ তুলে আনা। লাভের অংক হাতে নিয়ে নতুন অনুভূতিতে শিউরে উঠল মেয়েরা। কর্মমুখী হওয়ার তাড়না এলো মেয়েদের মনে। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা পুরুষ অবাক হয়ে দেখলো পুরবধুর কোমল লালিত্য শান দেওয়া ছুরির মতো চমকাচ্ছে। তার কথাবার্তা পাল্টে গেছে, পাল্টে গেছে পোষাকের আদুরে ঢক, এমনকি জুতা পর্যন্ত। দ্রুত চলাফেরার উপযোগী ঢিলেঢালা সাদামাটা পোষাক, সাথে বাস্তববাদী জুতা।

এই প্রথম নারী রাস্তায় নেমে এসেছে ভোটাধিকারের দাবীতে। শিল্প বিপ্লব মানুষের মাঝে বৈষম্য বাড়িয়েছে, ভোটাধিকার তথা অধিকার চাইতে শেখা নারীকে শাসন করার একচ্ছত্র  ক্ষমতার কারণে উঁচু হিলওয়ালা জুতা আবার ‘আবিস্কৃত’ হয়। ভেতর-বাহিরের টানাপোড়েনে জটিল প্রতিযোগিতায় পড়ে গেল নারী, আর তাই লিপস্টিকের মতোই হাইহিল হয়ে গেল নারীর সঙ্গী। পুরুষ যেভাবে চাইছে, সেভাবে নারী সাজছে, পুরুষের চোখে মুগ্ধতা দেখতে মরীয়া নারী চলতি ফ্যাশন-এর খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে নিজের মেরুদণ্ডেরবারোটা বাজিয়ে হলেও হিল জুতা পরছে। ওদিকে পুরুষের কর্মস্থলের জুতার নকশা কিন্তু কেডস জুতার-ই সংস্করণ, হিল জুতা নয়।

দ্য সিক্রেটস অব ডিসটিংটিভ ড্রেস বইয়ের লেখক ম্যারি ব্রুকস সেই ১৯১৮ সালেই লিখেছিলেন, ‘কমনসেন্স থেকে মনে হয়, নিচু হিল-ই ভাল; যদিও আমাদের গর্ব বলে দেয়, উঁচু হিল-এ আমাদেরকে ভালো দেখায়।’ এই সময়ে এসে আমার মনে হয়, নারীর কমনসেন্স এমন জুতাকে বেছে নিক্, যা তাকে ছুটতে সাহায্য করে। নিজের উচ্চতা কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর নারীর ‘গর্ব’ নামক ফানুস যতো তাড়াতাড়ি নারীকে ছেড়ে যায়, ততোই মঙ্গল। আর কিছু না হোক, মেরুদণ্ড-গোড়ালি-হাঁটুর ব্যথায় কাতরানো নারীর সংখ্যা তো কমতো।

লেখাটি ৩,০৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.