ম্যারাথন চলছে, চলবে!

জিনাত হাসিবা স্বর্ণা:

মাঝে মাঝে দৌড়াতে আমি ভালোবাসি দৌড়ানোর সময় বাতাসটা আমাকে কেটে যায়, বেশি বেশি ছুঁয়ে যায় সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে যেতে যেতে শুধু আমি আর বাতাস, আমার নিঃশ্বাস! প্রাণ পাই! ভালো লাগে! কিন্তু দৌড়ানো হয়েছে কালে ভদ্রে, হাতে গুণে বলতে পারবো জীবনে কতবার দৌড়েছি (বিশেষ করে হাইস্কুলে ওঠার পর থেকে) আমার দৌড় বড় জোর ১০০ মিটার!

১০ মার্চ দৌড়ালাম দশ কিলোমিটার কিন্তু এই দৌড়টা ঠিক প্রাণ পাওয়া দৌড় নয় এর নাম ম্যারাথন- ঠিক ঝেড়ে দৌড় নয়, বহুদুর যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি রেখে কিছুদূর হাঁটা, কিছুদূর দুল্কি চালে দৌড় দেখতে দেখতে যাওয়া অনুভূতিটা নিজের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত অনেকটা ‘আমি আছি, আমার এখানে না থাকার কথা নয়’- এমন সাথে বাড়তি পাওনা অন্যদের চলতে দেখার আনন্দ! মাঝে মাঝে সঙ্গী পাওয়ার, আবার মাঝে মাঝে (সঙ্গ হয়ে আটকে না থেকে আর অন্যকেও আটকে না রেখে) চলতে থাকার আনন্দ! কখনো এক ছুটে কারো নাগাল পাওয়ার উচ্ছ্বাস, আবার কখনো আলগোছে পেছনে সরে যাওয়ার স্বস্তি!

লোকে নাকি এমনিতেই দশ কিমি হাঁটে, কিন্তু এখানে আসা মেয়েগুলো (বিশেষ প্রফেশনালরা বাদে। যেমন, বিএনসিসি, পুলিশ, নৌবাহিনী, খেলোয়াড়) দৌড় দূরের কথা, হাঁটারও সুযোগ পায় না। রাস্তায় দুই কদম হাঁটতে গেলেও তিনবার বাজে মন্তব্য আর স্পর্শ সহ্য করতে হয় (কখনো ভোরবেলা বের হলে আমি গার্মেন্টস এর মেয়েদের হাঁটা দেখি মুগ্ধ চোখে। ওদের প্রতি কৃতজ্ঞবোধ করি আরো অনেকের পথ করে দেওয়ার জন্য। ওরা বোধ হয় আসেনি এখানে, অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ছিলো)।

আমি মানুষটা “যা-ই দেখি লাগে ভালো লাগে” টাইপ (বেকায়দায় পড়ে গেলে ব্যতিক্রম তো থাকেই মাঝে সাঝে!) প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হই! এটা করতে চাই, ওটা করতে চাই, সেটাও করে দেখতে চাই কিন্তু নিষ্ঠার সাথে, লেগে থেকে, ‘সফল’ হওয়ার ধাত নেই কোনো কিছুতেই (অর্থাৎ ‘সিরিয়াস’ নই কোনো অর্জনে, তাই সিরিয়াসনেস এর চক্করে পড়ে যেতে পারি এমন পরিস্থিতি থেকে সযতনে দূরে থাকি)! এই ‘করে দেখে’ যে আনন্দ পাই তাই নিয়ে সার্থক! এই সময়টার ভালো মন্দ প্রত্যেকটা মুহূর্ত উপভোগ করার এক বিচিত্র বিষয় আমার ভেতর মাঝে মাঝে অনুভব করি (তবে পথে কিছু কুড়িয়ে পেলে সযতনে রেখে দিতে ভালোবাসি) যা-ই করি তাতে খুব বেশি উৎসাহ উদ্দীপনার দরকার না হলেও একটু হয় (‘একটু’-ই হয়। বেশি হয়ে গেলে ওটা আবার ভার লাগে)।

‘১০ মার্চ ম্যারাথন’ এর পোস্টটা দেখেই মনে হলো রাস্তাটা জুড়ে আমার অস্তিত্ব, আমার চলা, আমার স্বাধীন যাত্রার স্বাদ পাওয়ার সুযোগ এটা ভেবেই অনেকটা ভালোলাগা পেয়ে-টেয়ে বিবিধ কাজে-অকাজে ভুলে গেলাম! ৭ তারিখ নারী দিবস উপলক্ষ্যে অফিসের আয়োজনে দেখা হয়ে গেল সহলেখক বিথী হকের সাথে কথায় কথায় ম্যারাথনের কথা উঠতেই বললো, ‘রেজিস্ট্রেশন করে ফেলো, ৩০০ টাকা বিকাশ’ ভাবনাটা এগিয়ে গেলো এই একটু উৎসাহে!

৯ তারিখ সকালে ঘুম ভেঙে রেজিস্ট্রেশন করে ফেললাম রনি (আমার জোড়া) নির্বিকার মুখে বিকাশ করে দিলো ওর মোবাইল থেকে (আমার উপর আস্থার অভাব দেখিয়ে আমার যাত্রা ত্বরান্বিত করা ওর কৌশল মাঝে সাঝে ভোর ছয়টায় বের হবো বলে রাতে এলার্ম সেট করার সময় এক চোট হাসলো! আমিও স্বভাবতই খুব সিরিয়াস নই! কিন্তু কিঞ্চিৎ আশাহত হলাম ও আমার সাথে যাওয়ার কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে। আবার একলা যাওয়ার আমেজটাও ভালো লাগছিলো। সাথে কী নেবো-কী নেবো না, নিলে রাখার জায়গা পাবো কীনা, ব্যবস্থা করতে না পারলে সাথে নিয়ে দৌড়াতে পারবো কীনা, পোশাক কী পরবো, তাই ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম)

ভোরে এলার্ম বাজার আগে অদ্ভুত একটা ব্যাপার হলো, তন্দ্রার মতো কানের কাছে একটা পুরুষ কণ্ঠ শুনতে পেলাম – “তুমি আজকে ম্যারাথনে যাবে না” স্পষ্ট কণ্ঠ (রনি নয়!) ঘুমটা ভেঙে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম! টুকটাক করে প্রস্তুতি নেই, কিন্তু বেরোবার ব্যস্ততা নেই; কণ্ঠস্বর কানে বাজে রনি আধো ঘুম আধো জেগেই মাঝে মাঝে ঠাট্টা করছে যথারীতি শেষমেষ রনির ঠাট্টাকে সম্বল করেই বেরিয়ে পড়লাম দুটো রুটি আর ভাজি খেয়ে পরনে বেগুনি রঙের ‘নিরাপদ নগরী, নির্ভয় নারী’ লেখা টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার পৌঁছে সব মেয়েদের দেখে মন ভালো হয়ে গেল যাকেই দেখি মনে হয় একটু হাসি, দুটো কথা বলি কথা হলোও কারো কারো সাথে এক মেয়ের কথায় বুঝলাম সে নিয়মিত দৌড়ায়, স্ট্রেচিং করছিলো ওয়ার্ম আপ করতে (পরে দেখেছি ঢাউস পুরস্কার হাতে দাঁড়িয়ে)। অনুরোধ করলাম স্ট্রেচিংটা আমাকে দেখিয়ে দিতে একবার, করতে গিয়ে বোকা বনে গেলাম! হচ্ছেই না! মেয়েটা বললো “আপনার প্যান্টটা ঠিক নেই। পা ফ্রি করতে পারছেন না তাই”। অগত্যা সেই চেষ্টায় ক্ষ্যান্ত দিলাম।

সবাই দেখলাম পরে আসা পোশাকের উপর আয়োজকদের দেওয়া টি-শার্ট পরেছে চেঞ্জ রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ কনফিউজড হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম চিরাচরিত পোশাক বিড়ম্বনা! ঢাকাঢাকির দায়! দুই-একজন পরামর্শ দিলো- “ভেতরে ট্যাঙ্ক টপ পরেননি? তাহলে জামার উপর পরে ফেলাই ভালো গেঞ্জিটা অনেক পাতলাটি-শার্টের উপরে আরেক টি-শার্ট পরে আরো কনফিউজড হয়ে বেরিয়ে আসলাম একবার ভাবছি এসব কথায় পাত্তা দেওয়ার তো আমার কথা না, আবার পাত্তা যে দেইনি তারও তো নিশানা পাচ্ছি না!

শেষে ভাবলাম সময় তো আছে, দরকার মনে করলে পরে আবার গিয়ে চেঞ্জ করে নিবো আবারও উদ্ধার করলো বিথী অপরিচিতের ভিড়ে পরিচিত মুখ এই পোশাক বিভ্রান্তি জানাতেই বললো “পাতলা গেঞ্জি তো কী হইসে, তুমি যেন খুব কেয়ার করো?” ভাবলাম, তাই তো যেভাবে আমি কমফরটেবল, সেটাই তো করবো তৎক্ষণাৎ চেঞ্জ রুম রীতিমতোন স্বস্তি পেলাম! কিসের কী পাতলা গেঞ্জি? আমি তো দেখছি আমি দিব্যি প্রস্তুত! মনে আর চোখে কা্রো এক্সট্রা লেন্স থাকলে সে তার ভার নিয়ে স্বস্তিতে থাকুক আমি হালকা পল্কা-ই স্বস্তিতে

দশ কিলোমিটার পথের বর্ণনা শুনে প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও পরে ভাবলাম, যতোদূর পারি, ততোদূরই সই। পরেরটা পরে দেখা যাবে।

দৌড় শুরু করলাম হাঁটার মতোই কিন্তু কেমন অস্বস্তিকর জীর্ণ বোধ হলো, একটু দৌড়ালাম আবার যেমন আমি দৌড়াই তেমন দ্রুত নয়, বুঝলাম মাথায় দশ কিলমিটার ভালোই ঢুকেছে- এখন অনেকটা পথ পেরোতে চাই এক সময় খেয়াল করলাম কখনো হেঁটে কখনো দৌড়ে পরিচিত মুখগুলোর আশপাশে থাকতে চাইছি, একটু এগিয়ে বা পিছিয়ে মন দিতে শুরু করলাম অন্যসব মুখগুলোতে, মন দিতে শুরু করলাম আমার চলায়, পেরিয়ে যাওয়া পথ আর পথের মানুষগুলোতে দৌড় শুরু হতে দেরি হয়েছে, রাস্তাগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠেছে স্বেচ্ছাসেবকরা পথ দেখাতে আর উৎসাহ দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে কেউ দিক নির্দেশনা হাতে, কেউ পানি হাতে দাঁড়িয়ে কেউ নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে, কেউ হাসিমুখে বা হাততালি দিয়ে বলছে “অনেক দূর চলে আসছেন আপু, পারবেন বাকি পথ যেতে”

রাস্তার ধারে লোক জড়ো হয়ে আছে, নারী দর্শক নেই কোনো কখনো কাউকে চোখেই পড়ছে না, তাদের দিকে স্পষ্ট চোখ রেখে পেরিয়ে যাচ্ছি, কখন মাথা উঁচু আর সিনা টানটান করে দৌড়াচ্ছি কখনো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে সমস্ত মনোযোগ, কখনো “দেখ যতো ইচ্ছা তাকায়ে তোমরা, আমি যাচ্ছি আমিও দেখছি তোমাদের”- এমন ভাব, আবার কখনো নির্ভাবনায় হাঁটছি

হাঁটতে হাঁটতে কারো কারো সাথে কথাও হলো তাদের মধ্যে কার সাথে পরিচয় হলো, কারো সাথে পরিচয়বিহীন কথা এতো মেয়ে এই ব্যস্ত রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছে, দৌড়োচ্ছে- এই দেখেই বারবার মন ভালো হয়ে যাচ্ছে আর স্বেচ্ছাসেবকদেরে উৎসাহ দেখতে আমি এতো উৎসুক যে অনেকক্ষণ হয়ে গেলে এদের দেখা পাওয়ার জন্যেও মাঝে মাঝে দৌড়াচ্ছিলাম আবার হাঁটার চেয়ে দৌড় দেখলে এরা খুশী হচ্ছে বলে ওদেরকেই উৎসাহ দেওয়ার জন্য বোধ হয় ওদের দেখলেই দৌড়াচ্ছিলাম, ভাবটা যেন “আহা, যাদের দেখা পাওয়ার জন্য ওরা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, তারা একটু প্রাণবন্ত না হলে হয়?”

সুতরাং দৌড়! একটু এগিয়েই আবার নিঃশ্বাস ধরে আসা, গতি কমিয়ে হাঁটা! ৮ কি.মি. পেরোনোর সময় স্বেচ্ছাসেবকের মহা আনন্দ দেখে মন ফুরফুরে হয়ে গেলো কিছুদূর দৌড়ে বুঝলাম কান-গাল থেকে গরম ভাঁপ বেরোচ্ছে যেন  একবার মনে হলো থামার জন্যই এগোনো দরকার ৯ কি.মি. পরে স্বেচ্ছাসেবকরা হাতে দ্বিতীয় ব্যান্ডটা পরিয়ে বললো, “আপু এইটা পরতে পরতেই দৌড় দেন আরেকটু বাকি”

ভাবলাম এতোদূর এসে গেছি, অথচ একবারও মনে হলো না “আর পারছি না” পা’য় ফোস্কা পড়েছে অনেকক্ষণ ক্রমাগত ঘষা খাচ্ছি কিন্তু মনে হচ্ছে না যে এখনই থামতে হবে ডান পায়ে হাঁটুর পেছনের জয়েন্টের দিকটায় কোথাও একটা টান পড়েছে, কিন্তু মনে হচ্ছে না থেমে যেতে হবে দেখতে পাচ্ছি পথের শেষ সামনে একটা দল হেঁটে যাচ্ছিলো আমি দৌড়োতে দৌড়াতে তাদের পার হতেই হুড়মুড় করে সব দৌড় দিলো হই হই করে সবাই বরণ করে নিলো ওদের তারপর আমি, মহা আনন্দে একলাই যেন আমিই এলাম!

এরপর কয়েকটা মুহূর্ত আমার হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর একঘেঁয়ে আমি, একঘেঁয়ে গন্তব্য, একঘেঁয়ে বক্তব্য। বক্তব্যে আবার নারীকে মহিমান্বিত করার অপচেষ্টায় তার ‘মা-বোন-প্রেমিকা-স্ত্রী-কন্যা’ রূপ খোঁজা। একঘেয়ে দীর্ঘশ্বাস। কারও জ্বলে ওঠা তাকিয়ে দেখা। নারীর প্রতি সহমর্মিতায় অসতর্ক ‘পুরুষ’ রূপের বহিঃপ্রকাশ শোনা। পথের ঝিলগুলো মনে করতে চাইলাম- ফ্লাইওভারের উঁচুতে উঠে ঝিলের দিকে ফিরে শ্বাস নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে পড়তেই পেরিয়ে যাওয়া মেয়ে দুটোর কণ্ঠস্বর মনে করলাম, “মেডিটেশন? করো করো, দরকার আছে”।

বাসায় ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াতেই বুঝলাম দৌড়ানোর সময় যা কিছু হয়নি তা হতে শুরু করেছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এদিক যাই, ওদিক যাই- বাস কিংবা সিএনজি খুঁজি। একসময় এক সিএনজিওয়ালা বললো- “আপা মিটারে ২০ টাকা বাড়ায়ে দিয়েন, ছেলে দুইটাকে সামনে নামায়ে দিবো”। উঁকি দিয়ে দেখি একজনের ৬/৭ আরেকজনের ৯/১০ হবে। উঠে বসলাম। ছোটটার চেহারা মায়াভরা, এক গাল হাসি মেখে বললো “বাবা ২০ টা ট্যাকা দিও”! সিএনজিওয়ালা আমার দিকে ঘুরে হেসে বললো, “আপনাগো প্রোগ্রাম দ্যাখতে আসছিলো আপা। দেরি হয়্যা গ্যাছেদ্যাখতে পারে নাই”

আবার তাকালাম দুজনের দিকে। আমাদের দৌড়ের ‘হতে পারতো’ দর্শকদের দেখে মনটা আবার ভালো হয়ে গেলো! বাসায় ফিরে দেওয়া ফেসবুক পোস্টে সহলেখক জেসমিন আপা লিখলেন, “ম্যারাথন চলছে, চলবে”।

যা কিছু দেখলাম আর বুঝলাম, ব্যাপারটা তাইপথটা দশ কিলোমিটার নয়। ম্যারাথন আসলেই চলছে, এবং চলবেও।

১০ মার্চ ২০১৭

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.