বিদেশি পাত্রের খোঁজ বাদ দিন, পড়ালেখা শেখান মেয়েকে

দিনা ফেরদৌস: 

জন্মগতভাবে আমি একজন সিলেটি কুট্টি। শৈশবে আমাদের পাড়ায় চাকুরিজীবী যেসব নারীদের দেখেছি ,তাদের বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু পরিবারের। আর মুসলিম পরিবারের মেয়েদের মাষ্টারির বাইরে বেশি কিছু ভাবাই সম্ভব ছিলো না। যদিও এই কয় বছরে চেহারা আনেক পাল্টেছে।
 
 
আত্মীয় স্বজনদের বেশিরভাগেরই দেখেছি পড়াশুনা শেষ করার আগেই ভাল পাত্র (ভাল পাত্র মানে লন্ডনী / আমেরিকান) পেলে বিয়ে দেয়ার জন্য যেন উঠে পড়ে লেগে যেতেন। ক্লাস নাইনে উঠার আগেই আমাদের বান্ধবী ছাবিনার বিয়ে হয়ে যায় লন্ডনী পাত্রের সাথে।বিয়ের কিছুদিন পর সে বাপের বাড়ি আসছে জানলে, দেখতে যাই বান্ধবীরা মিলে। দেখি ঘরে সে শাড়ি পরে আছে। আর কথাবার্তায়ও যেনো বড় বড় একটা ভাব।
 
 
তার বহুদিন পর আর এক ক্লাসমেটের বিয়ের দাওয়াত পাই। বিয়েতেও যাই সবাই মিলে। তখন শুনতে পাই, যেই ঘটক সাহেব বিয়ের আলাপে ছিলেন, তিনি এর আগে একটি দেশি চাকুরিজীবী পাত্রের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। এতে সেই ক্লাসমেটের বাপ নাকি ভীষণ ক্ষ্যাপে যান। তার ফর্সা-সুন্দরী কমবয়সী মেয়েকে তিনি লন্ডনী/ আমেরিকান পাত্র ছাড়া বিয়ে দেবেন না। বাপের স্বপ্ন পূরণ হলো। বিদেশি পাত্রের কাছে মেয়ে বিয়ে দিলেন। বিদেশি পাত্রের কাছে বিয়ে দিয়েছেন, মানেই ধরে নিলেন মেয়েটি টাকার খনিতে গিয়ে পড়বে এবার।
 
 
আমার দেখা সেইসব বিদেশি ( মানেই লন্ডনী বা আমেরিকান) স্বজনরা যখন দেশে আসতেন, দেশে সবাই তাদের উপর এক ধরনের আশা করে বসে থাকতেন। যার নাই সে তো আশা করবেই, যার আছে সেও। বিদেশিরা সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন সবাইকে খুশি রাখতে। ভাই, ভাতিজা, ভাগিনার শখ হয়েছে মোটর সাইকেল দৌড়াবে, আছেন বিদেশে গৌরী সেন।পরিবারে বা আত্মীয় স্বজনের বিয়ে লাগবে, দেবেন গৌরী সেন। যেহেতু নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয় না ,তাই গা’য়েও লাগে না। তিনশ লোকের আয়োজনে পানচিনি অনুষ্টান,পাঁচশো লোক নিয়ে আকদ আর হাজার’জন নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান।
 
 
আমি যখন কলেজে পড়ি তখনও সবাই আম্মাকে জিজ্ঞেস করতেন ভালো প্রস্তাব (লন্ডনী/আমেরিকান) আসে কিনা? আমার গায়ের রঙ যেহেতু ফর্সা না, তাই আমাকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজন সবারই চিন্তা ছিলো। গায়ের রঙ আমার সাথে বেইমানি করেনি বলেই এলএলবি কমপ্লিট করতে পেরেছিলাম। আজ আমেরিকাতেও বসবাস করছি। বিদেশে গেলেই যে টাকার খনির গল্প শুনতাম, তা যে কতো পরিশ্রম করে ঘাম ঝরিয়ে অর্জন করতে হয়, তা বিদেশিরা কেউ  মুখ ফোটে বলে না বলেই, কেউ তার খবর রাখে না।
 
দেশে ঈদে দামী দামী জামা পরবেন, কুরবানী ঈদে বাজারের সবছেয়ে সুন্দর-দামী গরু কুরবানী দিবেন তা না হলে বিদেশি বাড়ির ইজ্জত থাকে না। আর চকচকে বিল্ডিং না দেখাতে পারলে কি আর বিদেশি বাড়ি বলা যায়। সব ইজ্জতই বিদেশিদের উপর ভরসা করে। যা নাই তাও দেখাতে হবে। কিন্তু নিজে খেটে কিছু করা যাবে না। কম টাকার বেতন দিয়ে বিদেশি বাড়ির মানুষের পোষায় না।
 
 
এই বিদেশিরা দেশে যেতে হলে ঘর ভাড়াসহ হাবিজাবি বহু টাকার বিল দিয়ে যেতে হয়, তার পর টিকেটের টাকা, দেশে যাওয়া উপলক্ষে সবার জন্য গিফট, তারপর আবারও নিজেদের শপিং ,অবশেষে একে তাকে নগদ টাকা দেয়া। যা দিয়ে কমপক্ষে তিন মাস বিদেশে চলা যায়।
 
অথচ আমি বলতে পারি, এই ভিনদেশে যদি বিপদে পড়ি, আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই। আজ যদি স্বামীর সাথে না পোষায়, তো মেয়েকে নিয়ে আমার যাবার কোথাও জায়গা নেই। যদি নির্যাতিত হই, সাহায্য করার কেউ নেই। বিদেশে আসছি শুনে আত্মীয়-প্রতিবেশি সবাই খুব খুশি। তাদের ভুলও ভাঙ্গলো, যে পড়াশুনা শেষ করে কালো মেয়েরাও বিদেশে যেতে পারে।
 
 
কিন্তু আমি নিজে বলতে পারি না, কাল কী হবে আমার! কারণ ক্লাস এইট-নাইনে থাকতে বিয়ে হয়ে আসি নাই। আমার নিজস্ব বোধশক্তি আছে। ব্যক্তিত্বহীনদের মতো স্বামী উঠ বললে উঠবো, আর বস বললে বসে থাকবো সেই রকম হতে পারি নাই। নিজস্ব মতামত সব কিছুতেই আছে আমার। কোথায় আপোষ করতে হয় না জানি।
  

যদিও সিলেটের দৃষ্টিভঙ্গি এখন আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। তবুও বলবো, পড়ালেখা ছাড়িয়ে এখনো যারা বিদেশি পাত্রের স্বপ্ন দেখেন, তারা এই চিন্তা থেকে বেড়িয়ে আসুন। যেই টাকা বিদেশিরা বিয়ের জন্য পাঠাবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন, তাদের বলুন পারলে মেয়ের পড়াশুনার জন্য সেই টাকা দিতে, বিয়ের সময় দেয়া লাগবে না। মেয়ে পড়াশুনা শেষ করে নিজেই নিজের বিয়ের পাত্র ঠিক করবে, তার সাধ্য অনুযায়ী নিজের বিয়ের খরছ নিজেই বহন করবে। এতে মেয়েটির ব্যক্তিত্বেরও বিকাশ হবে। সারা জীবন পরনির্ভরশীল চিন্তা করবে না। সৌখিন জিনিস অন্যের টাকায় ব্যবহার করার মধ্যে যে কি পরিমাণ বেইজ্জতি আছে তার উপলব্দি করতে শিখবে।

বিয়ে বাড়ি হাজার লোককে খাইয়ে যে দাম পাবেন এমন হবে না। যারা নিজের ঘরে প্রতিদিন খাচ্ছেন, তারাও বদনাম করবে যদি মুরগীর রোস্ট একটু শক্ত হয়। পাত্র কেমন কাবিন দিল,মেয়ের সঙ্গে কি কি দেয়া হচ্ছে এইসব নিয়ে বাইরের লোকই বেশি ঝামেলা করে। তারপর মেয়ের ভবিস্যত বিদেশে গিয়ে কি হবে, তা সেই জানবে। নিজেরা যখন গর্ববোধ করে বলবেন মেয়েকে বিদেশি পাত্রের কাছে বিয়ে দিয়েছি ,তখন মেয়েটি খারাপ অবস্থায় থাকলেও বলতে পারেনা বিদেশি গন্ধের চোটে।

সবকিছু বাদ দিয়ে মেয়েটিকে পড়ালেখা করান। নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করুন, যারা তার ভবিষ্যত সুন্দর দেখতে চান। পরিবারের সাহায্য মেয়েটির চলার পথে অনেক বড় সহায়ক। যেকোনো অবস্থায় বলুন, তোমার পাশে আছি মেয়ে, আমরা সবাই। তুমি যতোদূর পারো এগিয়ে যাও।

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.