নারী কি শুধুই মা?

0

কাকলী রানী দাস:

এদেশে প্রতিদিন প্রতিটি ঘরের কোনায় কোনায় চাপা কান্না আর দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, এখনও নারীকে তার কর্মস্থলে শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়, প্রতিদিন রাস্তায়, নারীর জন্য অপেক্ষা করে অনেক অনাকাঙ্খিত স্পর্শ আর বিষবাক্য।

গৃহিণীদের তথৈবচ অবস্থার কথা বেশি আর না বলি – এটাই পৃথিবীর একমাত্র পদ, যেখানে কোন কর্মঘন্টা নেই, বেতন নেই, বিশ্রাম নেই, অবসর নেই, স্বীকৃতি নেই; যা আছে তার নাম গঞ্জনা, অসম্মান, শারীরিক, মানসিক আর যৌন নির্যাতন।

তারপরও এই ধূর্ত পৃথিবী নারীর শুধুমাত্র “মা” রূপকে মহিমান্বিত করে, গানে, কবিতায়, উপন্যাসে নারীর পায়ে পূজার অর্ঘ্য সাজায়, নারীকে আরও বেশি আত্মত্যাগে উৎসাহিত করে – তবে এই সবই করা হয় নারীর জীবনের শেষবেলায়। অথচ এই নারীই যখন কন্যাশিশু, কিশোরী, তরুনী, স্ত্রী, পুত্রবধূ তখন তাকে ধর্ম, পরিবার, রাষ্ট্র সমাজ পোষাক দিয়ে, বিধি নিষেধের শিকল দিয়ে প্রতিক্ষণে নারীর জন্য লক্ষ্মণরেখা টানে। নারী একপা এগিয়ে যায় তো, সবাই মিলে তাকে টেনে-হিঁচড়ে দশ পা পিছিয়ে আনে। বড় অদ্ভূত এই হিসাব, তাই না?

একটু ভাবুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন পুরো হিসাবটা। সন্তানরা সাধারণত নিজে প্রতিষ্ঠিত হবার আগ পর্যন্ত মায়ের এই আত্মত্যাগের কথা বুঝতেই পারে না, কারণ তাদের শেখানো হয়, একজন মা তো এমনই হবে – পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনে আরাম আর আয়েশ নিশ্চিত করার জন্য মা তার নিজের সবকিছু ত্যাগ করবে।

আর যখন সেই সন্তানরা নিজেরা বাবা-মা হয় বা যথেষ্ট বড় হয়, তখনই তারা বুঝতে পারেন মা তাদের জন্য কতখানি করেছেন বা করেন। ততদিনে মা শত অসম্মান আর নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে তার জীবনের ১৫ আনা সময় কাটিয়ে ফেলেছেন – আর এই সময়ে এসে শুরু হয় মায়ের স্তুতি, বছরে কয়েকটা সুন্দর শাড়ি, হাতে কিছু টাকা গুঁজে দেয়া, মায়ের প্রয়োজনের টুকিটাকি জিনিস কিনে দেয়ার মধ্যেই সব বন্দনা শেষ হয়ে যায়।

তবে মজার ব্যাপার, এই একই মাতৃবন্দনারত সন্তান যদি পুরুষ হয়, তবে সে কিন্তু তার জীবনসঙ্গী, যিনি ঐ পুরুষের সন্তানের মা হয়েছেন, তার অবদানের কথা স্বীকার করে একটি বাক্যও উচ্চারণ করবেন না, বা সন্তানদেরও শেখাবেন না। বরং তার বাবা এবং পরিবার যেভাবে তার মাকে শোষণ করেছেন, ঠিক তেমনটাই তার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অব্যাহত রাখবেন।

কাকলী রানী দাস

আর রাখবেনই বা না কেন– নইলে তো তার স্ত্রীর বেতনহীন, ‍ছুটিহীন, গঞ্জনাময় ২৪ ঘন্টার চাকরিতে তাকে সহায়তা করতে হবে, সন্তান পালনের মতো কঠিন এবং সুক্ষ্ম কাজে তাকে হাত লাগাতে হবে। আর যদি স্ত্রী চাকুরিজীবী হোন, তাহলে তো কথাই নেই। একেবারে সোনায় সোহাগা, গাছেরটাও খাবেন, তলারটাও কুড়াবেন, লাভই লাভ।

রাজনীতি মনা রাজনীতি – এটা এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজনীতি। এই রাজনীতি যেদিন সব নারী ঠিকঠাক মতো বুঝে ফেলবে সেদিন পুরো পৃথিবীর পরিবার কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে।

আর তা ধ্বংস হয়ে গেলে রাস্তাঘাটে সারাদিন যে ফুলবাবুদের দেখেন, সেই ফুলবাবুদের দিনের অর্ধেক সময় কাটবে ঘরে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ করে – গায়ের শার্ট থেকে শুরু পায়ের জুতায় এখনকার মতো এমন জৌলুশ যে থাকবে না, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা, পুরো পৃথিবীতে মানবজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

যে নারী এই মানবজাতিকে তার জঠরে ধারণ করে, পুরো পৃথিবীকে ধারণ করে – বছরের প্রতিটা দিন তাদের, প্রতিটা ক্ষণ তাদের। তারপরও বছরের একটি দিনে সব নারীকে এক পৃথিবীর ভালবাসা আর শুভ কামনা।

রাস্তায় প্রতিদিন যে গুটিকয়েক ঘাড় ত্যাড়া নারীকে দেখি জঞ্জাল সরিয়ে কোদাল কাঁধে নিয়ে, দলবেঁধে মাথা ঢেকে, কর্পোরেট সাজে, এনজিও ব্যাগ কাঁধে কর্মস্থলে ছুটতে – আমি চাই তাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে শত সহস্রগুণ হোক, তাদের ত্যাড়া ঘাড় আরো ত্যাড়া হোক, মুখের কথা আরও ধারালো হোক।

নারী, তুমি বিশাল এক নর্দমায় কাঁটাওয়ালা পদ্ম হয়ে ফুটেছো, এই পদ্মের সুঘ্রাণ বুকে নিয়েই বেঁচে থাকো, নর্দমার দুর্গন্ধ যেন তোমাকে ছুঁতে না পারে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 55
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    55
    Shares

লেখাটি ১,১৬৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.