প্রশ্নগুলো সহজ, তার উত্তর কি সব জানা?

0

লীনা পারভীন: 

নারী হিসাবে আমার পরিচয় কোনটি? আজ আমি একজন নারী, একজন মা, একজন অভিভাবক, একজন স্ত্রী, একজন অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, একজন রাঁধুনী, একজন বন্ধু …।  এই যে এতো লম্বা লাইন, এর ভিড়ে আমার আসলে পরিচয় কোনটি? কোনটি আমাকে বেশী আনন্দ দেয়? কোন পরিচয়ে আমি বেশী মর্যাদাশীল মনে করি? কোন দিবসটিতে আমি আমার আমিকে খুঁজে পাই? উত্তর কি আছে?

লীনা পারভীন

প্রশ্নগুলি সহজ, কিন্তু তার উত্তর কি সব জানা??

বিভিন্ন দিবস এলেই আমাদের অনেক তৎপরতা দেখা যায়। ফেইসবুকের যুগে কারো মনে না থাকলেও মনে করিয়ে দেয়ার জন্য নোটিফিকেশন আছে। প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করা, একটা স্ট্যাটাস দেয়া, কেক খাওয়া, গিফট পাওয়া, আরো কত কী? ভালো লাগে। অন্তত একদিন হলেও কেউ কেউ কিছু করার মতো একটা উপলক্ষ্য খুঁজে পায়। হোক না সেই মুহূর্ত বা সেই ক্ষণটির পর না থাকুক সে অনুভুতি।

কিন্তু আমার মনে সারাক্ষণই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। ঠিক কেন জানি না অবলীলায় আমি মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি না আমাকে নিয়ে কোনো দিবসে। মাঝে মাঝেই মনে হয় কেন আমাকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়েই পরিচিত হতে হবে? সমস্যা কী যদি পাই অনেক পরিচয়? আমাদের পূর্বের মা চাচিরা তো এইসব নিয়ে ভাবেনি কখনো, তাই বলে কী তারা সুখী বা খুশী ছিলো না? তাহলে আমাদের এতো প্রশ্ন কেন? একটু বেশী পড়ালেখাই কি তবে নারীকে প্রশ্ন করাতে অভ্যস্ত করে ফেলছে? কী হয় যদি এমনি করেই দিন কেটে যায়?

প্রতিদিন আমি কোনো না কোনো নারীর লাঞ্ছনার খবর পাই, হত্যার খবর পাই। ভিতরে রক্ত গরম হয়ে উঠে। প্রতিবাদ করি। শ্লোগান দেই। নিজের ঘরে ফিরে যাই। শুরু হয় নিজ জীবনের আপোসনামা। সংসারের আরেক নাম আপোস। এই আপোস কারও জন্য বাধ্যতামূলক, কারো জন্য দায়বোধ, আবার কারো জন্য দায়িত্ববোধ। প্রতিদিন কোনো না কোনো বিষয়ে, কোথাও না কোথাও আপোস করে চলেছি। আপোস না করলে যে আমার অস্তিত্ব টেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।

এই যে আমি একজন শিক্ষিত, সুন্দর, আকর্ষণীয় নারী, যে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আয়-রোজগার করি, নিজের মতো করে জীবন চালাতে চেষ্টা করি, সেই আমিও কী আপোস করছি না? করছি। প্রতিনিয়ত করেই চলেছি। নিজের শখের কাছে, সন্তানের কাছে, স্বামীর কাছে, পিতা মাতার কাছে। কিছু আপোস হয়তো এখন আর গুনাতেই আনি না।

এতো স্বাধীন আমি। এখন যদি আমার সংসারে কোনো ঝামেলা হয়, সন্তানের দেখাশুনার কোনো ঘাটতি হয় তখন আমি নিজেই হয়তো সিদ্ধান্ত নেবো যে, আমি বরং বাসাতেই থাকি। চাকরিটা ছেড়ে দেই। আমার স্বামী ভদ্রলোক, কখনো হয়তো বলবেন না ‘কেন চাকরি ছাড়বে? আমরা অন্য কোনো ব্যবস্থা করে নেবো’। আর সংসারে যদি আমার আয় রোজগার খুব বেশী ম্যাটার করে, তাহলে ঘটনা অন্য হলেও হতে পারে।

সেইদিন অফিসে একজন খুব গর্ব করে বলছিলো তার স্ত্রী চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। কেন? তাদের প্রথম সন্তান মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী আর রিস্ক নিতে চায়নি। স্বামী হিসাবে তার গর্ব হচ্ছে যে এক কথায় স্ত্রী চাকরি ছেড়ে দেবার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে, যেটা সে পারেনি। অথচ তার স্ত্রী ছিলো ক্যারিয়ারিস্টিক একজন মানুষ। এই জায়গাতে সে মনে করে তার স্ত্রী তার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে।

এই যে উদাহরণ, এটা কে নির্ধারণ করেছে? এই সমাজ নির্ধারণ করে দিয়েছে যে মেয়েদেরকে আগে মা হিসাবে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, তারপর ক্যারিয়ার।

আর স্ত্রীর এই ত্যাগ নিয়ে স্বামীর গর্বের শেষ নাই। অনেকেই হয়তো বলবে, মেয়েটা কেন চাকরি ছেড়ে দিলো? না দিলে কী হতে পারতো? প্রতিনিয়ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মন কষাকষি, আরেকবার যদি সন্তান হারানোর মতো ঘটনা ঘটতো, তাহলে এর দায় মেয়েটাকেই নিতে হতো, আর মনে মনে মেয়েটাও কিন্তু নিজেকেই দায়ী করতো। তার মানে কী মেয়েদের মাতৃত্বও একটি দুর্বলতা? জানি না এর উত্তর কী হবে।

আপনি প্রেমিক। যদি আপনি একটু নরম মনের হয়ে থাকেন, খুব বেশী ভালোবেসে দুর্বল হয়ে থাকেন, তাহলে দেখা যাবে সেখানেও আপনার এই দুর্বলতাকে আপনার প্রেমিক পুরুষটি কোনো না কোনভাবে কাজে লাগাচ্ছে। প্রেমেও আছে যন্ত্রণা। সেখানেও কাউকে পাবার জন্য আপনাকে অনেক বেশী সহনশীল হবার ভূমিকা রাখতে হবে। প্রেম বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও কোন না কোনভাবে এসে পড়বে মেয়েটির উপর, কারণ সে ভালোবেসেছে।

আজকাল মেয়েরা আয় উপার্জন করছে, আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করছে, কিন্তু তার পুরো আয়ের উপর নিজের অধিকার ১০০ ভাগ আছে কী? খেয়াল করে দেখবেন, আপনি হয়তো আপনার স্বামীকে টাকা দিচ্ছেন না, কিন্তু কোন না কোনভাবে আপনার সমস্ত টাকা সংসারের পিছনেই খরচ করছেন। নিজের অনেক শখ আহ্লাদকে অপূর্ণ রেখে হলেও সংসারের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সংসার কারও একার হয় না, কিন্তু এখানেও আপনি একজন নারী হিসাবে যতোটা উদার হবেন, আপনার স্বামী কী ঠিক সেই সমপরিমাণ উদার হয়? খুব চালাক স্বামীরা সরাসরি কিছু বলে না, কারণ জানে, আপনি সংসারের কিছু অপূর্ণ রেখে নিজের বিলাসিতায় মন দিতে পারবেন না। এই বড়ত্বে মহত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু এতেই কি ১০০ ভাগ সুখ আছে?

এরকম অনেক অনেক অনেক জায়গা আছে যেখানে নারীরা অকপটে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার যে পরিমাণ মর্যাদা পাওয়া উচিত ঠিক সে পরিমাণ মর্যাদা দিতেও আছে কার্পণ্য। আর আমার কষ্টটা ঠিক সেই জায়গাটিতেই।

দিনশেষ আমি হাতিয়ে বেড়াই আমার পরিচয়। আমাকে একদিকে একজন দায়িত্ববান নাগরিক হতে হবে, আরেকদিকে দায়িত্ববান মা হতে হবে, স্ত্রী হতে হবে, কন্যা হতে হবে, একজন সফল কর্মকর্তা হতে হবে। নারীর এতো এতো ভূমিকার কথা মাথায় রেখেই হয়তো দেবী দুর্গার এতোগুলো হাতের সৃষ্টি।

তারপরও আমি অতৃপ্ত থাকি। হিসাবের খাতায় আমার জন্য কী পেলাম? মনের খোরাক কোথায় পেলাম? নাকি এতোসব চিন্তা করাটাই বাদ দিবো? যতো চিন্তা ততো সমস্যা, ততো অতৃপ্তি, ততো হতাশা। অনেকেই বলে তুমি আগে মানুষ হও। মানুষ আমি ঠিক কোথায় কোথায় হবো? নারী হিসাবে আমার যে একটা আলাদা সত্ত্বা রয়েছে, সেটার কী হবে তাহলে? যুগ যুগ ধরে আমার ভিতরে নারীর যে গড়ন আর আকাঙ্খার যে কাঠামো, মুক্ত হবার যে লোভ, প্রেম পাবার যে বাসনা, আর ভালোবাসার যে তীব্রতা আছে, তার কী হবে? এগুলোকে এড়িয়ে চলা কী এতোই সহজ? তবে কী আমরা একেকজন পাকা অভিনেতা হয়ে উঠছি?

[এটা একান্তই এলোমেলো মনের ভাবনা, কেউ সিরিয়াসলি নিয়ে আবার ভাবতে বসে যাবেন না প্লিজ]

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

লেখাটি ৮৯৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.