নারী দিবস নিয়ে বিতর্ক  

0
তামান্না ইসলাম:
দুদিন আগে অফিসের একটা মিটিঙে আমি মুখ ভোঁতা করে বসে আছি। মুখ ভোঁতা করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে। রুমে প্রায় এগার জনের মধ্যে আমরা চারজন মেয়ে।  সংখ্যার দিক দিয়ে বেশ বলিষ্ঠ। টেক কোম্পানিতে নারীদের এই অনুপাত এখনো বিরল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মিটিঙের পুরুষরা তো বটেই, বাকি তিনজন মহিলা সবাই বিরক্ত হয়ে আছে কোম্পানিতে আরোপিত নতুন এক আইনের উপরে, যেখানে নারীদেরকে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অগ্রাধিকারের চেয়েও একটু বেশি অধিকার বলা যায়, আমাদের লক্ষ্য খুব অল্প কিছু সময়ের মধ্যে পুরো কোম্পানিতে পুরুষ এবং মেয়েদের অনুপাত অনেক খানি বাড়ানো। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ার মেয়েদের অনুপাত। এতে করে যারা চাকরির নিয়োগ দেয়, সেই সব ম্যানেজাররা সবাই পড়েছে বিরাট বিপদে।
আমেরিকার মতো শিক্ষিত দেশেও মেয়েরা অঙ্ক পড়তে, বিজ্ঞান পড়তে ভয় পায়। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে  এখনো হাতে গোণা মেয়ে যায়। এখন মেয়েরা যদি ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ে, তাহলে কোম্পানি নারী ইঞ্জিনিয়ার পাবে কোথা থেকে? কোম্পানির এই নতুন আইনের জন্য চাকরিদাতারা চাকরি হাতে নিয়ে বসে আছে, চাকরি দেওয়ার মতো প্রার্থী পাচ্ছে না।
এদিকে কাজ তো আছেই, সেই কাজ সময়মত শেষ করার চাপও আছে। তাই তারা সবাই চিন্তিত, হতাশ এবং বিরক্ত। কেউ কেউ এমন প্রস্তাবও তুলছে, অ্যাকাউন্টিং, ফিনান্স, মানবিক এইসব বিষয়ে মেয়েরা পড়ে বেশি, ওই সব চাকরিতে সব মেয়ে এনে অনুপাত বাড়ালেই হয়, ইঞ্জিনিয়ারিংকে ছাড় দেওয়া হোক।

 বলা বাহুল্য ওখানে চারজন মেয়ের মধ্যে আমরা তিনজনই ইমিগ্র্যান্ট, এশিয়ার দেশ থেকে আসা। একজন মাত্র আমেরিকান। সেই আমেরিকান বয়সে আমার চেয়ে অল্প কিছু ছোট। কিন্তু ওর মুখে আমি গল্প শুনেছি ওর পুরো ক্লাসে ও একা ছিল মেয়ে। সে হিসাবে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। বুয়েটে আমাদের ত্রিশ জনের ক্লাসে আমরা ছিলাম সাতজন মেয়ে।

তামান্না ইসলাম

আমি এদের সবার হতাশার কারণ বুঝি, কারণ আমি নিজেও একজন ভুক্তভোগী। তিন চার মাস ধরে লোক খুঁজে পাই না। এদের মতো আমিও এক সময় ভাবতাম, কেন মেয়েদেরকে বাড়তি সুযোগ দিতে হবে? সবাইকে সমান যোগ্যতার মাপকাঠিতে মাপা উচিৎ। 
অল্প কিছুদিন আগে আমার ছেলে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির জন্য দরখাস্ত করেছে। তখনই জানতে পারলাম যে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সময়ও অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনোলজিতে মেয়েরা অগ্রাধিকার, কোটা এসব পেয়ে থাকে। প্রথমে মনটা বেশ খারাপ হয়েছে। হাজার হলেও নিজের ছেলে। মনে হচ্ছিল এ ভীষণ অন্যায়। কিন্তু সেদিন সেই মিটিঙে বসে আমার আত্মোপলব্ধি হলো যে কোথাও যদি কোনো পরিবর্তন না হয়, কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা মেয়েদেরকে না দেওয়া হয়, তাহলে এই চক্র থেকে আমরা কোনদিনও বের হয়ে আসতে পারবো না।
হাজার বছরের রীতি নীতি সমাজ ব্যবস্থার কারণে মেয়েরা যতখানি পিছিয়ে গেছে, ততখানি পথ তাদের এগিয়ে দিয়ে তবেই সমতার কথা ভাবা যাবে, তার আগে নয়। আজ যদি ইউনিভার্সিটিতে কোটা, অগ্রাধিকার বাড়িয়ে মেয়েদেরকে বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে পড়তে উৎসাহিত করা যায়,  তাহলে কাল আর আমাদের গালে হাত দিয়ে ভাবতে হবে না ইঞ্জিনিয়ার মেয়ে কোথায় পাই? কাল যখন কোম্পানিগুলোতে ছেলেমেয়ের চাকরির অনুপাত সমান হবে, পরশু সেই মেয়েরা নিজেদের ম্যাটারনিটি লিভ, ডে কেয়ার এগুলোর দাবি আদায় করতে পারবে। 
আজ সারাদিন ফেসবুকে ‘নারী দিবস’ নিয়ে অনেক ঝড় দেখলাম। শিক্ষিত মেয়েরাই বেশিরভাগ বলছে, নারী দিবস মানে আমাদেরকে ছোট করা, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া আমাদের ক্ষমতা কম। আসলে আমাদের ক্ষমতা কম নয়, তবে আমাদের অবস্থান এখনো অনেক নিচে। সেই অবস্থানটা যতদিন সমান সমান না হবে ততদিনই আমাদেরকে আমাদের অবস্থান উপরে ওঠানোর চেষ্টা করতে হবে।
অনেকের বিরক্তির কারণ, বছরে একদিন আলাদা করে নারী দিবস পালনের কী  দরকার। কথা ঠিক, একদিন লোক দেখানো নারী দিবস উদযাপনের কোনই তাৎপর্য নেই, যদি বছরের তিনশ চৌষট্টি দিন তার আর কোন প্রভাব না থাকে। তবে যদি থাকে, সেটা কিন্তু একটা বড় লাভ।
আজ কিছু কিছু বন্ধুদের ছবি দেখলাম বিভিন্ন অফিসে নারী দিবস পালনের। সেটার উদ্দেশ্য যদি হয় সবাই একই ড্রেসকোডের ড্রেস পরে ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়া, তাহলে সেটা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু অনেক ছেলেদেরকেও দেখেছি সেই ছবিতে, যারা আমার জানা মতে সে  সব অফিসের হর্তাকর্তা। আজ যদি তারা তাদের নারী কলিগদের অসুবিধাগুলো মন দিয়ে শোনেন, তাদের কাজের উন্নতিতে কীভাবে সাহায্য করতে পারেন সেগুলো আলোচনা করেন এবং সে হিসাবে একটা দুটো পদক্ষেপও নেন, তাহলে কী সেটা সেই অফিসের মেয়েদের জন্য একটা ভালো ব্যাপার নয়? যদি নারী দিবস উপলক্ষে সকুল কলেজ গুলোতে কিছু সেমিনার আয়োজন করে, মেয়েদেরকে অনুপ্রাণিত করে কিছু আলোচনাও হয়, সেটাও তো কিছু মেয়েকে আলো দেখাতে পারে। 
আমার মনে হয় আরও বহু নারী দিবস আমাদের পার হতে হবে। আমার ছেলের ভর্তির সময় যে আক্ষেপ আমার হয়েছিল, আশা করি মেয়ের ভর্তির সময় সেই একই আইন আমার মেয়েকে জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। এই আপাত অসম, বিতর্কিত নিয়মগুলো একদিন হয়তো ওদের ছেলেমেয়েদের জন্য এক পৃথিবী তৈরি করবে, যেখানে এই নিয়মগুলোর দরকার হবে না।
আমার ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী নাতনি রুম ভর্তি কলিগের মাঝে একমাত্র মেয়ে বলে অস্বস্তি হবে না, সেদিন হয়তো তারা ‘নারী দিবস’ কী জানবে না, কারণ নারী শব্দটা তখন আর আলাদা করে সুবিধাবঞ্চিত বা পশ্চাদপদ কোনো গোষ্ঠীকে বোঝাবে না। 
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ২,৯২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.