নারীবাদ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই

ড. বিলকিস রহমান:

কিছুদিন আগে উইমেন চ্যাপটারে এই নিয়ে বিতর্ক চলছিল বলেই এই লেখাটা। মনে হয়েছিল অনেকেই হয়তো বেসিক বিষয়গুলোও জানে না। তাই এই প্রচেষ্টা।

ড. বিলকিস রহমান

পিতৃতান্ত্রিক ধর্ম, সাধারণ বিশ্বাস এবং অনেকাংশে বিজ্ঞানও মনে করে যে, নারী-পুরুষের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক অসমতার মূলে রয়েছে তাদের শারীরিক পার্থক্য। জীববিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে তাদের কিছু জৈবিক পার্থক্য রয়েছে, যেমন, নারী সন্তান ধারণ করে, পুরুষ করে না; যৌন মিলনে পুরুষ সক্রিয়, নারী তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয়; সন্তানধারণ ও লালনের জন্য নারীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে, পুরুষের সেগুলি নেই। নারী-পুরুষের এই জৈবিক ভেদকে ‘সেক্স’ বলা হয়। পুরুষ ও নারীর সেক্স ভেদাভেদকে ভিত্তি করে সমাজ নারী ও পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট বিনির্মিত নারী ও পুরুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ককে ‘জেন্ডার’ নামে চিহ্নিত করা হয়।

নারী ঘর-গৃহস্থালির কাজ করবে, অন্যদিকে পুরুষ অফিসে-কল-কারখানায় কাজ করবে-এর জৈবিক কোনো ভিত্তি নেই। সমাজ এ কর্ম বিভাজন সৃষ্টি করেছে। পিতৃতন্ত্র এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে পুরুষ নারীর উপর প্রভুত্ব করে, নারীর ওপর নির্যাতন চালায় এবং নারীকে শোষণ করে। পিতৃতন্ত্রের ভিত্তি পুরুষ প্রাধান্য। সমাজের সর্বক্ষেত্রে পুরুষ প্রভুত্ব বিস্তার করে রেখেছে এবং নারীকে অধস্তন ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করেছে।

যৌনজীবনে পুরুষের ইচ্ছা ও চাহিদা দ্বারা নারী পরিচালিত হয়। যৌন মিলনে নারীর ভূমিকা গৌণ; নিজের সন্তুষ্টি লাভ নয়, পুরুষের সন্তুষ্টিবিধান নারীর একমাত্র উদ্দেশ্য। পুরুষ নারীকে উপভোগ করবে-এটাই নারীর নিয়তি। পিতৃতন্ত্র নারীকে সেবাদাসীতে পরিণত করে রেখেছে।  

অপরদিকে নারীবাদ বা Feminism হলো নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতার একটি মতবাদ, যাতে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বিস্তার রোধে নারীদের সংগঠিত হওয়ার উপর এবং সামাজিক জীব হিসেবে সমঅধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের জন্য সমাজকে নিরাপদ আবাসস্থলে রূপান্তরিত করার উপর গুরুত্ব দেয়। নারীবাদ মতাদর্শ হলো নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক, লৈঙ্গিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে। এর মূল লক্ষ্য, সমাজে বিদ্যমান লৈঙ্গিক বৈষম্যের অবসান।

এখন প্রশ্ন আসে, এই বৈষম্যের উৎস কোথায়? 

ফ্রেডরিক এঙ্গেলস মার্কসের সাথে একমত প্রকাশ করে বলেছেন-পরিবার ব্যবস্থার আগে নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ যৌনমিলন প্রচলিত ছিল। তারপর প্রথম রক্ত-সম্পর্কীয় যৌনমিলন নিষিদ্ধ হয় এবং এরও পরে এক পুরুষ -এক স্ত্রী সম্মিলনে পরিবার প্রতিষ্ঠানের সূত্রপাত হয়।

এঙ্গেলস বলেন, উৎপাদনের নাটাই যতোদিন নারীর হাতে ছিল, ততদিন পরিবারে নারীর প্রাধান্য ছিল; উৎপাদনস্থল ও উৎপাদন ধারা পরিবর্তিত হলে নারীর প্রাধান্য লুপ্ত হয়। উৎপাদনে পুরুষের ভূমিকা যতো বৃদ্ধি পেল, নারীর ভূমিকা ততো গৌণ হলো। সম্পদ পুরুষের হাতে পুঞ্জিভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের মধ্যে সম্পদের উত্তরাধিকার প্রদানের বাসনা সঞ্চার হলে মাতৃ অধিকার উৎখাত হলো।

সমাজে নারীর অবস্থানে এই বিপর্যয়কে এঙ্গেলস বলেছেন, ‘নারীর বিশ্ব ঐতিহাসিক পরাজয়’। এ পরাজয়ের ফলে নারী রূপান্তরিত হলো পুরুষের যৌনকামনা চরিতার্থের মাধ্যম এবং পুরুষের জন্য সন্তান প্রজননের যন্ত্রে। তাঁর মতে, পরিবারের মধ্যে ‘স্বামী হচ্ছে বুর্জোয়া এবং স্ত্রী প্রলেতারিয়েত’। এঙ্গেলস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি নামক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হলেই কেবল নারী নির্যাতন বিলুপ্ত হতে পারে। 

পিতৃতন্ত্র যে ধরনের পরিবার, গৃহ ও যৌনতা প্রতিষ্ঠা করেছে তা পরিবর্তনশীল উৎপাদন পদ্ধতির ফল। মেরি ওলস্টোন ক্রাফটের মতে, শিল্প বিপ্লবের আগে যুক্তরাজ্যে সকল উৎপাদী কর্মকাণ্ড গৃহে বা গৃহের আশেপাশে সংঘটিত হতো এবং নারীপুরুষ উভয়েই তাতে অংশ নিত। শিল্প বিপ্লবের পর পুরুষ ঘরের বাইরে গিয়ে শিল্প-কলকারখানায় কাজ নেয়, কিন্তু নারী ঘরে থেকে যায়।

গৃহিনীদের উৎপাদী কর্মকাণ্ড না থাকায় তারা উৎপাদী কর্মহীন গৃহবধূ হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে যাদের স্বামী অপেক্ষাকৃত ধনী পেশাজীবী বা উদ্যোক্তা, তারা গৃহকর্ম চাকর-বাকরের হাতে ছেড়ে দিয়ে ঘরে নিষ্কর্মা শয্যা সঙ্গিনীতে পরিণত হয়। মেরির মতে, এদের একমাত্র কর্ম, আরাম আয়েশে থাকা এবং পুরুষের মনোরঞ্জন করা। উদার নীতিবাদে বিশ্বাসী মেরি নারীপুরুষের অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার উপরজোর দিয়েছেন। 

জন স্টুয়ার্ট মিল এবং হেরিয়েট টেইলর নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, গৃহকর্ম, সন্তানপালন একদিকে এবং গৃহস্থলির বাইরে অর্থকরী কর্ম অপরদিকে – এই দুইয়ের মধ্যে নারী একটি বেছে নেবে তা হয় না এবং তা হওয়া উচিত নয়। যা ন্যায়সঙ্গত, তা এই যে তারা গৃহকর্ম এবং সন্তানপালনের পাশাপাশি পেশা ও জীবিকা গ্রহণ করবে; তারা যুগপৎ গৃহিনী ও পেশাজীবী হবে।

টেইলর দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘বিবাহিত নারী স্বামীর সত্যিকারের সমান হবে তখন, যখন সে পরিবারে ভরণপোষণে আর্থিক অবদান রাখবে এবং অবদানের জন্য তার মনে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব বোধ জন্মাবে। 

অন্যদিকে গৃহস্থালি ও কর্মস্থল দুইই সামলাতে গলদঘর্ম কর্মজীবী নারীকে বেটি ফ্রিডান ‘অতিনারী’ বা Super Women আখ্যা দিয়েছেন। কারণ তাকে দুই রণাঙ্গনে নিখুঁত চরম উৎকর্ষতা অর্জন করতে  হচ্ছে। ঘরে গৃহকর্ম বিমুখ স্বামীর সেবা, সন্তানের যত্ন ও যাবতীয় গৃহকর্ম সম্পাদন করে তাকে কর্মস্থলে চরম দক্ষতা প্রদর্শন করতে হচ্ছে নারীকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.