আমার আয় আমার, আমার কাজ মানুষের জন্য

0

অর্পণা ঘোষ:

বহুদিন আগে এক সহকর্মীর  কাছে মাঠ পর্যায়ে কাজ করা কয়েকজন মেয়ে সহকর্মীর নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার প্রশংসা করছিলাম। ওনি আমাকে অবাক করে দিয়ে মন্তব্য করলেন, এটা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। কারণ তাদের স্বামীরা ভালো আয় করে না। তাই তাদের আয়ই সংসারের ভরসা। কয়েক বছর আগে আরেক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম তার পরিচালিত, ”মেয়েদের উচ্চশিক্ষার্থে দেয়া অনুদান” প্রকল্পের ফলাফল কী?

অর্পণা ঘোষ

ওনার উত্তর ছিলো, ‘এ প্রকল্পের আওতায় মেয়েরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল, বুয়েট ও অন্যান্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে ভালো বিয়ে করেছে, সুখে আছে।”

উত্তরটা মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণার মতো মনে হওয়ায় কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। তাই পরদিন অফিসের খাবার টেবিলে প্রসঙ্গটি আবার উঠাই। এবার আমার অবস্থা আরো সঙ্গীন হয়ে পড়ে। কারণ আমার সহকর্মীরা জানালেন, বিএ, এমএ পাস না করলে তারা তাদের বউকে বিয়ে করতেন না। তারা ঘর সংসার করছে, সন্তান দেখছে, শাড়ি গয়না কিনছে, সুখে আছে। তাদের ভাষায়, বরং আমার মতো চাকুরিজীবী মেয়েরাই কষ্ট করছি, মাস গেলে হিসেব করছি বাড়ি ভাড়া, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন এবং অন্যান্য খরচ। আমাদের ফুসরত কই দামী শাড়ি বা গয়না কেনা বা সকালে আয়েশি ঘুমের!

তাদের কথায়, যুক্তিতে সায় না দিলেও,  বিষয়গুলোকে আরো তিক্ত না করে খাবার টেবিলে প্রসঙ্গ পাল্টালাম।

কয়েক বছর আগে এক ছাপাখানায় জরুরি কিছু কাজ করছিলাম। তখন আমি গর্ভাবস্থায় থাকায় ছাপাখানার মালিক আমাকে বার বার খেয়াল করছিলেন। এক পর্যায়ে উনি ওঠে এসে বললেন, “আপা আপনার জামাই খুব পাষাণ, আপনাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হচেছ”। উনি আরো বললেন, “আমি আমার বউকে খুব ভালোবাসি। এ অবস্থায় কোনোদিন চাকুরি করতে দিতাম না”।  আমি মৃদু হেসে জানালাম, “আমি কাজ করতে পছন্দ করি, ঘরে বসে রান্নাবান্না বা টিভি সিরিয়াল দেখা আমার সইবে না”।

কাজ করতে যেয়ে দুবার দুটো প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়ানোর প্রসঙ্গ তুলেছিলাম, দুটো জায়গায়ই জবাব ছিল, “আপনার স্বামী তো ভালো আয় করেন, ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, বেতন বাড়ানো নিয়ে আপনার এতো চিন্তা কেনো”।

কিছুদিন আগে উচ্চশিক্ষিত (পিএইচডি ধারী) একজনকে ইন্টারভিউ বোর্ডে জিজ্ঞেস করছিলাম, “আপনার সুপারভাইজর হবেন একজন নারী, আপনাকে আরও দুজন নারী সহকর্মীর পাশে বসে অফিস করতে হবে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখবেন”?

উত্তর ছিলো, “সংসারের প্রয়োজনে এখন অনেক নারী চাকুরি করছেন, তাই নারী সুপারভাইজর হলে আপত্তি নেই। তবে, নারী সহকর্মীদের সঙ্গে বসার ব্যবস্থায় একটা পার্টিশন হলে ভালো হয়”।

কোনো কর্মজীবী পুরুষকে একজন নারীর মতো প্রতিদিন এরকম হাজারও বিষয় নিশ্চয়ই মোকাবেলা করতে হয় না। কেউ তাদের বলে না, আহা, সংসারের প্রয়োজনে, ঘরের বউটি আয় করছে না, বা তার আয় ভালো না বলে কর্মজীবী পুরুষটিকে কতো কষ্ট না করতে হচেছ, তাকে চিন্তা করতে হচেছ বাড়ি ভাড়া, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ, আরো কতো কি? কেই তাদের বলে না ঘরের বউটি ”পাষাণ” বলে পুুরুষটিকে দিন রাত কাজ করতে হচেছ বা সে চাকুরিতে ভালো পারফরমেন্স দেখানোর চেষ্টা করছে।

নারীর আয়, তার পেশা এখনো সংসারে বাড়তি বা অপ্রয়োজনীয় হিসেবে দেখতেই অনেকে পছন্দ করেন। নারী  যে তার নিজের জন্য, সংসারের জন্য আয় বা ব্যয় করতে পারেন এটা অনেকেরই চিন্তায় আসে না। একইভাবে নারী যে তার পারিবারিক গণ্ডির বাইরে নিজের সামাজিক প্রতিষ্ঠা বা সম্মান লাভের জন্য কাজ করেন, এটাও অনেক শিক্ষিত পুরুষের কাজে বোধগম্য হয় না, বা তারা মেনে নিতে চান না।

যেমন, ‘ভাবী কী করেন’ জানতে চাইলে আমার এক সহকর্মী উত্তর দিয়েছিলেন, অফিস থেকে বাসায় ফিরে নিজের হাতে চা বানিয়ে খেতে চাই না, তাই আপনার ভাবী বাসা ও বাচ্চাদের সামলান, তবে আপনার ভাবীর পড়াশোনাটা ভালো, উনি একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেছেন।

তাই গৃহকাজে নিয়োজিত নারীদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে প্রশ্ন করছি, আমরা যারা মাঠ পর্যায়ের নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করি, তাদের কয়জন স্ত্রীকে চাকুরিজীবী বা উপার্জনকারী হিসেবে দেখতে চাই? চারপাশের পরিসংখ্যান বলে, সংখ্যাটা খুব বেশি নয়।

সব মিলিয়ে বলতে চাই, নারী হিসেবে আমার আয় আমায়, একজন পুরুষ সহকর্মীর মতো ব্যক্তিগতভাবে বা সংসারে খরচ করা আমাদের আনন্দ দেয়, সংসারের আর্থিক ভিতকে মজবুত করে। আর উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমার কাজ পৌঁছে যায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে।

সংসারের বাইরে মানুষের উপকার করার মধ্য দিয়েই আমি শোধ করছি এ সমাজে ও দেশে বেড়ে উঠার ঋণ। আর এ সাফল্য গর্বভরে বলতে আমাদের দ্বিধা নেই। এ ক্ষেত্রে স্বামী ও পরিবারের অন্যদের সহযোগিতা আমাদের চলার পথকে আরো সুন্দর করছে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৮১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.