‘হ্যাপি ফ্যামিলি’ ক্যাপশনের পেছনে …

0

রেজভীনা পারভিন:

নারী পুরুষের  সমতায় উন্নয়নের যাত্রা

বদলে যাবে বিশ্ব, কর্মে নতুন মাত্রা –

রেজভীনা পারভিন

এই শ্লোগানে বিভিন্ন জায়গায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০১৭ পালিত হয়ে গেল বেশ ঘটা করে। কথাগুলো দেখে কেমন জানি ভেতরটা খচখচ করে উঠলো।

বিশ্ব বদলাচ্ছে, উন্নয়নের যাত্রায় সবক্ষেত্রেই কাঠামোগত পরিবর্তন আজ চোখে পড়ার মতো নিঃসন্দেহে। কিন্তু ভেবে দেখা দরকার, যে মাপকাঠি দিয়ে আমরা হাতের কড় গুনে গুনে নারী উন্নয়নের কথা বলার সময় গর্ব করে বলি, সেগুলো আসলেই উন্নয়ন কিনা? বা সেগুলো আসলেই সমতা কিনা?

একটু গভীর ভাবে ভাবা দরকার। নারী নির্যাতন বা নারীর অবমাননা বলতে আমরা একবাক্যে ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, এসিড মেরে ঝলসে দেওয়া এগুলোকে বুঝে থাকি। আর যে সংসারে স্বামী বউ পেটায় না, সেই সংসারটা সুখের মনে করি, ধরেই নেই বউয়ের গায়ে হাত তোলে না, বউ দিব্বি খাচ্ছে, পরছে, এখনকার সময় যুক্ত হয়েছে ফেসবুকে ‘হ্যাপি ফ্যামিলি’ ক্যাপশনে ছবি আপলোড করছে, ভালই তো আছে, সমতায় সংসার করছে।

একবার ভেবে দেখবেন এই ‘হ্যাপি ফ্যামিলি’ ক্যাপশনের পেছনে কতটা আনহ্যাপিনেস লুকিয়ে আছে! আসুন একটু আনহ্যাপিনেস ব্রাউজ করি। আমি জানি আপনাদের ব্রাউজারে সার্চ দিলেই এগুলো আসবে —

  • বিয়ের পর বাপের বাড়ি বেড়াতে আসার জন্য মন কেমন করছে, কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ি বা স্বামীকে সে কথা বলতেই পারছেন না। ঐদিকে স্বামী তার আত্মীয়-পরিজনদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে বেড়াতে, আপনি সেজেগুজে যাচ্ছেন।
  • আপনি নৌপথ-স্থল পথের হাজারও ঝক্কি পার করে শ্বশুর বাড়িতে গেলেন ঈদ করতে, পুরোদস্তুর ঘরকন্না করে ঈদ করছেন, কিন্তু আপনার মহান স্বামী আপনার বাবা-মাকে ফোনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়েরও সময় পাচ্ছে না।
  • আপনার বাড়িতে গৃহকর্মি কত টাকায় রাখবেন, কাকে রাখবেন, সকল বিষয়ের সিদ্ধান্ত আসছে স্বামীর দিক থেকে। আপনি এসব ছোটখাটো বিষয়ে ও নিজের মতামত কার্যকর করতে পারবেন না।
  • আপনার সন্তানকে নিয়ে স্কুলে গেছেন, আপনার স্বামী রাস্তায় কেন জ্যাম হলো, কেন তার এতোটা সময় নষ্ট হলো, তার ঝালটা ঘরে প্রবেশ করেই আপনার উপর দিয়েই ঢালবে।  
  • অফিস টাইমে স্বামীর অফিসে কোনো একটা দরকারে ফোন করেছেন, শুনতে হবে, “আমি ব্যস্ত, জরুরি কিছু না হলে রাখো’, কিন্তু আপনি  অফিসের হাজারটা কাজের মাঝেও আপনার সন্তান স্কুল থেকে ফিরে খেয়েছে কিনা, দুপুরে কী রান্না হবে, সব পইপই করে বলে দিচ্ছেন।
  • অফিস করে দুজনেই বাড়ি ফিরে একজন আয়েশ করছেন এক হাতে রিমোট আর অন্য হাতে ধোয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে, আর অন্যজন হয়তো রান্নাঘরে অথবা বাচ্চাকে পড়ানোয় ব্যস্ত–এসব সেকেলে তুলনা না হয় নাই বা করলাম। যদিও সেই সেকেলে তুলনা আজও দৃশ্যমান।
  • বাইরের লোকের সামনে হয়তো তুচ্ছ কোনো বিষয় নিয়ে গলা উঁচু করে কথা বললো আপনার সাথে, আপনি সম্মান হারানো নিয়ে মনোকষ্টে ভুগছেন, আর উনি ভাবছেন, সবাই তো দেখলো আমার কতোটা ক্ষমতা।
  • আপনার স্বামী বাড়ির বাইরে কোথাও গেলে সময়মতো পৌঁছালো কিনা, থাকার জায়গাটা কেমন হলো, খাবার কেমন, ইত্যকার বিষয় নিয়ে ফোন করে খবর নিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত হচ্ছেন, একবার ভেবে দেখেন এই জাতীয় কয়টা ফোন আপনি পাচ্ছেন? কারণ উনি অফিসের কাজে গিয়েছেন, উনার এতো সময় কোথায়?
  • আপনি উপার্জন করছেন, তাহলে আপনার যা যা প্রয়োজন তার সবকিছু আপনিই জোগাড় করবেন, কারণ আপনি তো স্বাবলম্বী।
  • কথায় কথায় আপনাকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলা হবে, যদিও আপনি কন্ট্রিবিউট করছেন, একই কথা কখনও যদি মুখ ফসকে আপনি বলে ফেলেন, তাহলে কিন্তু সেটা গুরুতর অপরাধ।
  • সন্তান খারাপ কিছু করলে সেটার জন্য আপনার বাড়ির বাইরে (চাকুরী করা)  থাকা সবার আগে দায়ী।
  • স্বামীর জন্মদিন বা বিশেষ কোনো দিনকে ঘিরে নানা আয়োজনের চেষ্টায় আপনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ঐদিকে আপনার বিশেষ দিনটি তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন।

আজ এ পর্যন্তই থাকুক। আমি জানি আপনাদের অনেকের সাথে এগুলো মিলে যাবে। এরকম যে সবার সাথেই হয়, আমি তা বলছি না, বেশির ভাগের সাথে হয়। একটা উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করি বলে প্রতিদিন অনেক উন্নয়নকামী নারীর সাথে আলাপ হয়; তাদের অনেকের কাছেই এই কষ্টের কথাগুলো শুনতে পাই, তাদের স্বামীরা বউ পেটায় না, কিন্তু এই কষ্টগুলোকে কী বলবেন আপনারা? কী নামে ডাকবেন আপনারা? যে মাপকাঠি দিয়ে সচরাচর সমতা মাপা হয়, সেই মাপকাঠি নিয়ে বোধহয় একটু ভাবা দরকার।

নৃবিজ্ঞানী, উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares

লেখাটি ১,৯৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.