ভুবনায়ন হোক ভালোবাসার ভূমিকা

0

সীমা কুণ্ডু:

ছদ্ম শব্দটা নিজেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজন্ম। শব্দটাকে নিষ্পেষিত মেয়েটির জীবনের সাথে জুড়ে জীবনটাকে আর ভারী করতে চাইনা। তাই ছদ্মনাম বলবো না, বলবো অন্য নাম, “পরমা”।

হ্যাঁ, পরমাই বটে। মধ্যবিত্ত পরিবারে পাঁচ ভাইয়ের এক বোন, দেখতে প্রচলিত সুন্দরী, মা বাবা বাড়িঘর লেখাপড়া সব মিলে সে তৎকালীন বিবাহযোগ্যই ছিল বটে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই তার বিয়ে হয়ে যায়, তার চেয়ে কিঞ্চিৎ উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যবসায়ী ছেলের সাথে।

সীমা কুণ্ডু

বছর ঘুরতেই প্রথম ছেলে তার দুবছর পরেই দ্বিতীয় ছেলের জন্মদানের সাথে শ্বশুর বাড়ির তাবৎ দায়িত্ব পালন হতে শুরু করে সন্তান লালন পালন,গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছের তদারকি করতেও শিখে গেল। পাশাপাশি সে তার মা ও পরিবারের সহায়তায় ক্রমে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এটাই ছিল তার জীবনের চরম ও পরম সিদ্ধান্ত। যা তাকে আত্মহননের হাত হতে বাঁচিয়েছিল।

শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা মানুষের দৃষ্টিকে দিব্য করে। তখন সে বুঝতে শিখে ভালো মন্দের বিবেচনা। প্রকাশ করতে চায় নিজস্ব মতামতকে। নিজের ভবিষ্যৎ কে দেখতে চায় নিজের না পাওয়া সমুহের ক্ষতিপূরণ হিসাবে। পরমাও ভাবল সন্তানদের সুশিক্ষা দিতে হলে কেবল বরের আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভর করলে চলবে না, তাকে নির্ধারণ করতে হবে এর গতি এবং প্রকৃতি।

এই গতি প্রকৃতি নির্ধারণের মানসিকতাই তার জীবনের গতিটাই পালটে দিল। এ নিয়েই শুরু হয়ে গেল চিরাচরিত বৌ বনাম শ্বাশুড়ি, ছেলে বনাম মা, বর বনাম বৌ নামক পারিবারিক কলহ। যার জেরে শরীর ক্ষত বিক্ষত হলেও জোর বাড়িয়েছিল মনের। শরীর মনের বছর দুয়েক যুদ্ধ চলতে চলতে এসে থামল বরের পুনর্বিবাহ এবং একটা নাবালিকা সংসারের যবনিকাপাতে।

কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরাই নারী জীবনের প্রতি মুহূর্ত, জীবনযাপন, পারিবারিকতা, ধর্ম, সংস্কৃতি, বিয়ে হতে শুরু করে মাতৃত্ব, সন্তান লালনপালন হতে তাদের জীবনযাপন সব কিছুকেই আবশ্যিক শর্ত করে তুলেছে। এসবের জন্য অন্দরের অনুশাসনই মূলত দায়ী। সে অনুশাসনের ভিতর বাহির ভেদ করে এক লক্ষণরেখা টানা থাকে, যাতে সদাসচল প্রচলনের গণ্ডি পেরুনো না যায়। এ গণ্ডি পেরুতে চাওয়া নারীদের কপালে মূলত চরিত্রহীনা, অন্যে আসক্ত কিংবা এমন কিছু বিশেষণ জুটে যার কারণে সে মুখ থুবড়ে পড়ে এবং হার মানে সেই প্রচলিত গণ্ডির কাছেই। এর পেছনের কারণ কেউ বিবেচনায় আনেনা,আনতে আগ্রহীও না। বিচারের আশা তো দুরাশা।

অন্দরেও পুরুষের বিচরণ দেখা যায় তবে অন্দর রাজনীতিকে আলোকিত করতে উস্কে দেয়া সলতে হিসাবে। তারা নিজেরা কখনো স্থান বদল করে না। তারা তাবৎ সুখভোগ এবং সংসার সচল রাখার পূজারী। এসবে অধিকার পুরুষের পকেটে স্ব-উপার্জিত অর্থ কিংবা সেই অর্থে কেনা সিগারেটের প্যাকেটের মতই চকচক করে। আর নারীরা সদাব্যস্ত থাকেন এ প্রচলনকে অপরিবর্তনীয় করে রাখতে। অথচ চাওয়া পাওয়ার নিয়ত পরিবর্তন ঘটতে থাকে পুরুষের হাতেই। এ পরিবর্তন নারীজীবনকে কখনো কখনো গণ্ডির বাইরে আনলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডু ডু ডু।  

নিজের বলতে শিক্ষার সনদটুকু হাতে করেই “পরমা” গণ্ডির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল দুছেলের হাত ধরে। তার পরিবার ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, বুকে টেনে নিয়েছিল তার অসময়কে। যৌতুক হিসাবে তার বাবার দেয়া গয়না হতে শুরু করে যাবতীয় সে ফেলে এসেছিল ঘেন্নায়, যা তার প্রাপ্য ছিল। মন উঠে গেলে এসব বৈষয়িক বিষয় তুচ্ছ করা কোন ব্যাপার না। সময় যেভাবে মানুষকে দাবিয়ে রাখে দুঃসময়ে মানুষই সময়কে দাবিয়ে রাখতে শিখে যায়, সময়ের শিক্ষায়।  

পরবর্তী দশ বছর ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ব্যয় করেছিল পরমা, সাথে পরিবার। সে পেশাগত প্রশিক্ষণ নেয় এবং শুরু করে আর্থিক পথচলা। এরপর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি ফেলে আসা সময়ে। ইচ্ছা সাহস এবং মনোবল তাকে দিয়েছে এক স্বাবলম্বী সম্মানিত জীবন।

আমরা আসলে থমকে যাই, থমকে যেতে শিখে শিখে এ শিক্ষা এমনই মজ্জাগত হয়ে আছে যা অস্বীকার করার উপায় খুঁজে পেতে পেতেই ফুরিয়ে যায় জীবনবায়ু। সময় থাকতে নিঃশ্বাস নিতে পারা এক যুদ্ধ, এ যুদ্ধে কাউকে সাথে পাবার চিন্তা দুশ্চিন্তার আরেক নাম। তাই শুরুটা নিজের উপর বিশ্বাস রেখেই করতে হয়। যে সমাজে নিজের পরিবারেই নিপীড়ন বঞ্চনায় আড়ষ্ট জীবন সে সমাজে অন্যের সহায়তা পুনঃ বঞ্চনার আরেক ধাপ। মানুষের জীবন এলিভেটর নয়, একই ছন্দে দুলে দুলে চলবে। উত্থান পতন ভাঙা গড়া জীবনের অপরিহার্য প্রক্রিয়া। এসব মানুষ মেনেও নেয়। তবে সহানুভূতি নয়, এসময়ে প্রয়োজন পারিবারিক সহমর্মিতা এবং সহযোগিতার হাত ভালোবাসা আর মমতায় মোড়ানো।  

ভালোবাসার ভূমিকা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ছাপিয়ে বিশ্বব্যাপী। জয়ী হোক মানুষ, জয়ী হোক ভালোবাসা। ভুবনায়ন হোক ভালোবাসার ভূমিকা।

জয়ী হও নারী, জয় করো সময়কে। অভিবাদন তোমাকে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.