উভকামী হেফাজতকে ‘না’ বলুন

kumkum
মাহবুবা হক কুমকুম

মাহবুবা হক কুমকুম:

সম্প্রতি নারীকে তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি তার বক্তৃতায় বলেছেন, ‘মার্কেটে যেখানে তেঁতুল বিক্রি করে, ওদিকে যদি আপনে যান, আপনার মুখ থেকে লালা বাহির হয়। মহিলারা তার চেয়েও বেশি খারাপ! মহিলাদের দেখলে দিলের মইধ্যে লালা বাহির হয়।’

—ভাষা মনের ভাব প্রকাশ করে। মনের মধ্যে যদি পশু থাকে, সেই পশুর ভাবও বহন করে ভাষা। অতি কুৎসিত বিবৃতিদানকারী এই ব্যক্তি সম্পর্কে বলা যেতে পারে, তার সারাজীবন কেটেছে অন্ধকার গুহায়। প্রগতির আলো যেখানে পৌঁছয়নি। এই ব্যক্তিকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বিবেচনা করে হাসপাতালে পাঠানো জরুরি।

কিন্তু তাকে শুধু অসুস্থ বলা ভুল হবে। তার রাজনৈতিক জ্ঞান অতি টনটনে। হেফাজতি জ্ঞানও তার কম নয়। আল্লামা শফী জানেন, কীভাবে খয়রাতি টাকায় কওমি জমিদারি পরিচালনা করতে হয়। ব্যক্তিকর না-দিয়ে কীভাবে হেলিকপ্টারে উড়ে-ঘুরে রাজনীতি করতে হয়, তা-ও অজানা নয়। তিনি জানেন, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলের নেতা নারী, সংসদের অভিভাবক নারী, সেই দেশে বাস করছেন তিনি। তাই তিনি কখনও বলেন না, নারী প্রধানমন্ত্রী মানি না। বলেন না, নারী নেতৃত্বে চালিত বিরোধীদলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধব না। কিছুদিন আগে নারীকে ঘরে আটকে রাখার দাবি সংবলিত ১৩ দফা দাবিপূরণের জন্য আল্লামা শফী সরকারকে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। এর পরপরই জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এটি আল্লামা শফী ও তার সংগঠনের জন্য সশব্দ চপেটাঘাত হলেও তিনি তখন বলেননি, নারী স্পিকারের নেতৃত্বাধীন সংসদ মানি না। বলেননি কারণ, তিনি জানেন এজন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা সংসদ অবমাননার আইনি দায়ে পড়তে হতে পারে।

তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দিনরাত বাঘা-বাঘা অর্থনীতিবিদরা যখন কৌশল আবিষ্কারে ব্যস্ত, তখন আল্লামা শফী তার তত্ত্বে বলছেন, অভাবের মূল কারণ নারীর ঘরের বাইরে বের হওয়া। নারীরা ঘরের বাইরে বের হয় বলে সংসারে ‘বরকত’ আসে না। তিনি বলেছেন, ‘গার্মেন্টসে কেন দিছেন আপনার মেয়েকে? কোন পুরুষের সঙ্গে ঘোরাফেরা করতেছে তুমি তো জানো না। কতজনের মধ্যে মত্তলা হচ্ছে আপনার মেয়ে, আপনে তো জানেন না। জেনা কইরা কইরা টাকা রোজগার করতেছে, কী বরকত হবে?’

যে ভাত খেয়ে আল্লামা শফী বক্তৃতা করেন, সেই ধান যে প্রক্রিয়ায় তার প্লেটে আসে, তার মূলে রয়েছে নারীর শ্রম। তিনজন গরিব মানুষের পোশাক হতে পারে, এমন দৈর্ঘ্যের কাপড় দিয়ে যে আলখাল্লা আর ওড়না তিনি পরেন তা নারীদেরই তৈরি। ভাত এবং কাপড়কে ত্যাজ্য করার কথা কখনও বলেন না এই মতলববাজ আল্লামা শফী। সমগ্র বিশ্ব যখন উন্নয়নের সূচকে নারী-পুরুষের সমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে, আল্লামা শফী তখন নারীদের বিরুদ্ধে সবাইকে উস্কে দিচ্ছেন। ১৩ দফা দাবি আদায়ের জন্য মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবরোধ করে ঢাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার হেফাজতে ইসলাম। ২০১১ সালে তাণ্ডব করেছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির বিরুদ্ধে।

আল্লামা শফী তার বক্তৃতায় আরও বলেছেন, ‘কেউ যদি বলে মহিলাকে দেখলে আমার দিল খারাপ হয় না, কুখেয়াল দিলের মধ্যে আসে না, তাহলে আমি বলব ভাই, তোমার ধ্বজভঙ্গ বিমার আছে। তোমার পুরুষত্ব নষ্ট হইয়া গেছে। সেজন্য মহিলাদের দেখলে তোমার মনে কুভাব আসে না।’ এই ব্যক্তি কেবল নারীর বিরুদ্ধে তার কুৎসিত অবস্থানই পরিষ্কার করেননি, পুরুষদেরও তার বিকৃত মানসিকতার অনুসারী হওয়ার প্ররোচনা দিয়েছেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, আরেক হেফাজতি-দর্শনধারী যুদ্ধাপরাধী সাঈদী একসময় তার বক্তৃতায় নারীকে কলার সঙ্গে তুলনা করে পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, স্ত্রী-কন্যাদের ঘরে আটকে রাখুন। পুরুষরা তার বক্তৃতা শুনেছেন। পাশাপাশি তাদের স্ত্রী ও কন্যাদের গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে পাঠিয়েছেন। পোশাক কলে পাঠিয়েছেন। ফসলের ক্ষেতে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করতে পাঠিয়েছেন।

আল্লামা শফী ও তার অনুসারীদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষ বাস্তবচিন্তারহিত ধর্মভীরু নয়। এ কথা মনে রাখতে হবে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেও। হেফাজতি সমাবেশে পানি সরবরাহ করে বা ইফতার খাইয়ে এই অন্ধকার যুগের সংগঠনটিকে কাছে টানা মানে নিজেদের ধ্বংসের পথ রচনা করা। নারীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারী হেফাজতিদের সঙ্গে যে দলই গাঁটছড়া বাঁধুক না কেন, লক্ষ-লক্ষ খেটে খাওয়া নারী-ভোটার সেই দলকে ‘না’ বলতে দ্বিধা করবেন না।
ধর্ষণের কারণ হিসেবে আল্লামা শফীর তত্ত্ব হল— নারীদের ‘বেপর্দা ঘোরাফেরা’। মাদ্রাসার ছাত্রী তো আপাদমস্তক ঢাকা থাকে। তারা কেন ধর্ষণের শিকার হয়? শুধু চলতি বছরেই মাদ্রাসার ওস্তাদরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রীধর্ষণ করেছেন বা ধর্ষণের চেষ্টা করেছেন। দুটি উদাহরণ— এ বছরের ২২ জানুয়ারি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার রায়কোট ইউনিয়নের দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আবু ইউসুফ ওই মাদ্রাসার এক ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালান। ৩ এপ্রিল শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার বাশারুখ উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক মাহমুদুল হক ধর্ষণ করেন সানুবিইয়্যাহ শ্রেণীর ছাত্রীকে।

এরা যে শুধু নারীধর্ষণ করে, তা নয়। ছেলেদেরও ধর্ষণ করে। কওমি মাদ্রাসার সমকামী হুজুরদের নিয়ে কিছুদিন আগেও পত্রিকায় খবর এসেছে। তারা একাধারে নারী ও পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে উত্সাহী। উভচর প্রাণীর উদাহরণ যদি ব্যাঙ হয়, উভকামী দলের নাম হেফাজত।

আল্লামা শফী নারীর বিরুদ্ধে যে সব বিষোদ্গার করেছেন তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানহানি, ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং নারীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের জন্য পুরুষদের উস্কানি দেওয়া। এটি স্পষ্টতই সংবিধান অবমাননা এবং আইন লঙ্ঘন। আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে মাননীয় আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করবেন, এমনই নারীদের প্রত্যাশা। আরও প্রত্যাশা, খয়রাতি টাকায় যারা হেফাজতি জমিদারি করেন, এনবিআর তাদের ব্যক্তি করের আওতায় আনবে।
বাকিটা নারীদের কাজ। করতে হবে নারীদেরই। যাকাত-ফিতরা আর কোরবানির পশুর চামড়ার জন্য ভিক্ষুকের মতো দরজায় দাঁড়ালে ‘লালা-ঝরা’ হেফাজতি মিসকিনদের দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিতে হবে।

(লেখক পরিচিতি: লেখক, কবি ও এনজিও কর্মী। লেখাটি দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকা থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  • 386
  •  
  •  
  •  
  •  
    386
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.