এন্টিলজিক অব “নারীর মন ভগবানও বোঝে না”    

তামান্না তাবাসসুম:  

যে কোনো মানুষের মনের কথা বোঝা অনেক কঠিন একটা বিষয়। প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা আলাদা ভাবে কমিউনিকেট করে। কেউই সবসময় মনে আর মুখে একই কথা বলে না, তা সে যে জেন্ডারেরই হোক না কেন।

একটি বহুল জনপ্রিয় আর বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ – নারীর মন নাকি ভগবানও বোঝে না।
এখন এই না বোঝায় যে বুঝে না তার যেমন জ্বালা, আবার যাকে বুঝলো না, তার জ্বালা তো আরও বেশি। কারণ এখানে আমি বুঝি না তুমি কী চাও, তাই তোমার চাহিদাও পূরণ করতে পারি না- এই বলে দায় এড়িয়ে যাবারও একটা ব্যাপার আছে।

তামান্না তাবাসসুম

এই না বোঝার জন্য আরেকটা প্রবাদকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা যায় – “মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না”। ঐ যে একটা গান আছে না – ভাবি যেন লাজুক লতা, ছলা কলা কিছুই বোঝে না, সে যে মনের কথা মনেই রাখে, মুখে আনে না।
তার মানে যে মনের কথা মনেই রেখে দেয় সেই হলো সবচেয়ে ভালো মেয়ে। এভাবেই মেয়েদের ছোটো বেলা থেকে গ্রুমআপ করা হয় যে লজ্জা নারীর ভূষণ। তারা তাদের বেসিক চাহিদার কথাগুলাও মুখ ফুটে বলতে পারবে না। তার সাথে যা যা অন্যায় হচ্ছে তা বলতে গেলেও সে বেয়াদব, বেহায়া!

এই বেচারিরা শিশু থেকেই মনে সংকোচের বীজ নিয়ে বড় হয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারে না, আবার সইতেও না পেরে পারে শুধু  অভিমান করতে। সেই অভিমানটুকুও আবার ন্যাকামি বলে ধরা হয়।

এখন কেউ তো আর অন্তর্যামী না যে মুখ দেখেই সব বুঝে ফেলবে। তাই মেয়েদের নিজেদের কথা সব সংকোচ ভেঙ্গে নিজেদেরই বলতে হবে, জানাতে হবে। মেয়েরা নিজেদের কথা নিজেরা বলে না দেখেই ছেলেরা মেয়েদের বিষয়ে তাদের মনগড়া কথা লিখে চালিয়ে দেয়। আর মানুষ তাই বিশ্বাস করে।

বেলা শেষেমুভিতে বাড়ির গৃহকর্ত্রী সারাজীবন অভিমান চেপে না রেখে, তার স্বামীর কাছে যদি তার ভালোলাগা মন্দলাগাগুলো প্রকাশ করতো, তাহলে শেষ বয়সে এমন দিন আসতো না। লোকটি স্টুপিডের মতো ভাবতেনও না যে ডিভোর্সেই তার ওয়াইফের জন্য স্বাবলম্বী হওয়ার একমাত্র পথ।

এদিকে শেকল ভেঙ্গে যারা নিজেদের কথা বলতে যায়, তারা আর হৃদয়ের কথা বলো বৈকি, যেখানে মৌলিক চাহিদাই পূরণ হয় না, তাই তাদের অধিকারের কথা (নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি) বলতে বলতেই দিন পার, আর তার ফলে নেমে আসা আরো দুর্বিষহ অবস্থা মোকাবেলা করতে করতেই জীবন শেষ।

মিডিয়া আমাদের সামনে যে নারী চরিত্র ফুটিয়ে তোলে, তার প্রায় সবই পুরুষের পারসপেকটিভ থেকে। তা সে সাবানের বিজ্ঞাপন হোক, সিনেমার নায়িকা হোক বা কবির কবিতায়। প্রেমিকার সুন্দর মন নিয়ে লিখা একটা কবিতা দেখান দেখি? মন দেখে নায়িকার প্রেমে পড়েছে এমন হিরো আছে? মনের কথা আছে তবে সেই মনের উপমা- পাষাণী, হৃদয়হীনা এসব।

ছলনাময়ী নারীকে নিয়ে তো গানের অভাব নাই, প্রতারক পুরুষকে নিয়ে নারী কন্ঠে তেমন কোনো গান আছে কি ( দুই একটা ফাইট্টা যায় মার্কা গান বাদে)?  

মেয়েরা শুধু নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন না দেখে ক্যামেরার পেছনেও সমান তালে এগিয়ে না আসলে এই দিন যাবে না। গীতিকার, ফিল্মমেকার, পরিচালক এগুলাতে আরো আরো নারী কর্মী দরকার আমাদের। সমাজই আমাদের মেয়েদের মাইন্ড সেট আপ এভাবে করে দেয়। সুন্দরীর দুটো ডানা জুড়ে দেয়, এদিকে এই ডানার শেকল কিন্তু থাকে পুঁজিবাদীদের পকেটে।  
আমি নিজে আমার এক বান্ধুবীকে দেখেছি যে ক্যামেরার পেছনে কাজ করতে চায়, কিন্তু তাকে নেয় না, বলে মেয়ে মানুষ রাত বিরাতে কাজ করতে পারবে না, পরিশ্রম করতে পারবে না, কিন্তু নায়িকাকে কিন্তু ঠিকই নিচ্ছে!

আমাদের সমাজে সম্পর্ক ভাঙার পর কষ্টে নিজের ঘরে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকা প্রেমিকার চেয়ে মদ খেয়ে মাতলামি করা প্রেমিকের শোকে সবাই বেশি কাতর হয়। মনের বিরুদ্ধে বিয়ের পিঁড়িতে বসা প্রেমিকার না বলা কথা আমরা জানতেও পারি না, অন্যের ঘরের কারাগারে সে কী আগুনে পুড়ছে! তা জানালে সমাজে যে আর তার জায়গা হবে না। প্রেমিক ভাবলো সে সুখে আছে, ভেবে আরো সব ঘৃণার রংচং দিয়ে লিখলো, সবাই জানালোও তা।
যতদিন পর্যন্ত না সিংহ লিখতে জানছে, ইতিহাস ততদিন শিকারীর সাফল্য গাথাই জানবে।

নারীর প্রতি পুরুষের প্রেমের গান, অনুভূতির গান আছে প্রচুর। কিন্তু পুরুষের প্রতি নারীর যেকটি গান আছে তার প্রায় সবি পুরুষের কথা ও সুরে।
নারী-পুরুষ নিয়ে কিছু পাল্টা পাল্টি গান হয় মাঝে মাঝে সিনেমায় (ব্যক্তিগতভাবে নারী-পুরুষকে একে অন্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়া আমার খুবই অপছন্দের)। ঐগুলোতে ছেলেদের পক্ষের পার্টও পুরুষ গীতিকার লেখেন, আবার মেয়েদের পার্টগুলাও ঐ একই গীতিকার লেখেন, তাই দেখা যায়, মেয়েদের পক্ষের লজিকগুলা অনেক স্টুপিড হয়।

এখানে বলে রাখা ভালো, লেখক মাত্রই অন্যের সাইকোলজি বুঝে লিখতে পারেন, সেটা নারী লেখক পুরুষ নিয়ে, আবার পরুষ লেখক নারী চরিত্রে। কিন্তু ব্যপারটা যখন গড়পড়তা হয়ে যায় তখন কিন্তু তার অথেনটিসিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

নারীর মন না বোঝার প্রবাদটা তো আরো পুরানো। খুব ধীরে হলেও দিন বদলাচ্ছে, অনেক নারী লেখিকা আসছে, বিশেষ করে ইন্টারনেটের বদৌলতে ঘরে বসেই মেয়েরা ই-কমার্স, ব্লগিং করতে পারছে। তাই এখন আর সেই কথা বলে ছাড় পাওয়ার উপায় নাই যে তোমরা মেয়েরা যে কী চাও, তার কিচ্ছু বুঝি না। আর এ যুগের স্মার্ট ছেলে সেকেলে কথা বলবেই বা কেন!

সেদিন একটা ট্রল দেখলাম ছেলেদের মন বুঝাতে উপায় নামে একটা পাতলা বই। আর মেয়েদের মন বুঝাতে উপায় “প্রথম খণ্ড” নামে বিশাল একটা বই। ট্রলটা মজার, কিন্তু মেয়ের মন নিয়ে আসলেই যদি তারা এতো কন্সার্ন থাকতো, তাহলে জানতো –
মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি বায়োলজিক্যাল চেইনঞ্জ ফেস করে থাকে।
এক মাসের মধ্যেই তারা অনেক হরমোনাল চেইনঞ্জ এর মধ্য দিয়ে যায়। এর ইফেক্ট শারীরিক, মানসিক দুই ভাবেই পড়ে। তাই অনেক মুড সুইং হয়। প্রেগন্যান্সির সময় প্রয়োজনীয় হরমোন ১০০ – ১০০০ গুণ (100- 10000 fold decrease) কমে যাওয়া এবং MAO – A হরমোনের হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, যা ব্রেইন সেলে বিষন্নতা উতপন্নকারী হরমোন বাড়িয়ে দেয়। যা বাচ্চা জন্মের দুই বছর পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে। বেবি ব্লুজবা প্রসব পরবর্তীকালীন বিষন্নতাঅনেক মা’ই ফেইস করেন, যে বিষয়ে সিংহভাগ বাবাই অজ্ঞ।

এসব সময় সামান্য কেয়ার আর একটু আন্ডারস্ট্যান্ডিং তাদের শরীর ও মনকে এ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে অনেক হেল্প করে।

পুরুষ নারীর মনকে যে জটিল বলে, আসলে তারা মনটাকে বুঝতে চায়ই বা কতোটুকু, প্রেমিকা বা বউ ঠিক করার সময় সেই নারীর মনটা কেমন এই ব্যাপারটায় গুরুত্বই বা দেয় কতটুক? কেউ প্রেমিকা বা পাত্রী খুঁজে দিতে বললে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, কেমন মেয়ে চান, তারা প্রথম কথাটাই বলবে সুন্দরী। তার পর গায়ের রং, উচ্চতা, চুল এসব কেমন চায় তার ডিটেলস। মনমানসিকতার প্রসঙ্গ তাদের মনে পরে রিলেশনের মাঝামাঝি যখন কিছুই মেলে না তখন। খুব কম মানুষকেই প্রেমিকা/পাত্রী বাছাইয়ে বলতে শুনেছি মন মানসিকতার কথা।

ছবিটি রাজেশ্বরী প্রিয়দর্শিনীর আঁকা

বলতে বলতে আরো একটা কমন জোক মনে পড়ে গেল – কারো নামে গসিপিং করার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হলো হাজবেন্ড, সে কারও কাছে ফাঁস করবে না, কারণ সে কখনও আপনার কথা মনোযোগ দিয়েই শুনবে না। এখন কেউ যদি কারও কথা খেয়াল করে নাই শুনে, তাহলে বুঝবে কীভাবে?

এটা আসলে মেয়েদের বোঝার ব্যপার না, এটা এমন একটা কালচার, এর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া বা বোঝার চেষ্টা করা, যার মধ্য দিয়ে আপনি কখনও যাননি, যে সমস্যা/ সামাজিক প্রেশারগুলো আপনাকে কখনো ফেস করতে হয় না। পুরুষের চাইতে নারীর মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামটাও দ্বিগুণ।

শুধু ছেলেদেরই না, মেয়েদেরও বুঝতে চেষ্টা করতে হবে ছেলেটার পারস্পেকটিভ থেকে। মুখে কিছু না বোঝালে সে এমনি এমনি সব বুঝে যাবে, এমনটা আশা করাও বোকামি।

আমি জানি এতোক্ষণ যে বিষয় নিয়ে এতো কথা বললাম তা ঠাট্টা করে বলা হয়, আমিও মজা করে কী উত্তর দেয়া যায় তাই ভাবছিলাম। বাট উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে নিজেও ভাবিনি। যাহোক, সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক, মনের মতো মন পাক সবাই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.