যখন নারীও নারীর উন্নয়নে প্রতিবন্ধক

রাহিমা আক্তার:

ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটাকে কেন্দ্র করে সারা দুনিয়ায় সাজ সাজ রব, আলোচনা, কর্মশালা, নানাবিধ কর্মসূচির পরিকল্পনা চলছে। কেউ কেউ আবার ৮ই মার্চকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ জাতিকে ধুয়ে দিচ্ছে। কারণ তাদের মতে, কেবল পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবই নারীর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। কিন্তু আমি কেবল ঐ পুরুষতান্ত্রিক পুরুষদের মধ্যেই সব অনুন্নয়নের কারণ খুঁজে পাইনা। আমার চারপাশে ছড়িয়ে আছে হাজারও নারী, যারা প্রতিনিয়ত নিজের অজ্ঞাতে বা সজ্ঞানে নারীদের পেছন ধরে রাখছে, প্রতিনিয়ত নারীর চলার পথকে কণ্টকিত করছে।

আবার এমন অনেক পুরুষ দেখেছি, যে নিজের অনেক কিছুর বিনিময়েও পাশের সহযাত্রীকে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করছে। আর এসব পুরুষরা অনেকের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

রাহিমা আক্তার

এই যে দেশে প্রতিনিয়ত গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু নির্যাতন হচ্ছে তার একটি বড় অংশ কে করছেন জানেন? হ্যাঁ, নারীরাই করছে। তাও আবার সেইসব নারীদের ৫০-৭০ শতাংশই পড়াশোনা করা, যাদের কিনা আমরা শিক্ষিত বলেই জানি। পুরুষদের একাংশের ভেতর লুকিয়ে আছে ভীষণ যৌনলিপ্সা (সবার না), যা সুযোগ পেলেই বিষধর সাপের মতো জেগে উঠে, আর সেই লিপ্সা ৫ বছরের শিশুকেও রেহাই দেয় না, তেমনি নারীদের ভেতরও লুকিয়ে আছে এক ধরনের ভীষণ নির্যাতক মনোভাব, যা অবস্থানভেদে আপন স্বরূপে বেরিয়ে আসে। সেই নির্যাতক স্বরূপও সাত-আট বছরের শিশুকে রেহাই দেয় না, যেই শিশু কিনা দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে তার আপনজনকে ছেড়ে এসেছে।

এবার আসা যাক যৌতুক ও নির্যাতনে। স্বামী যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করছে, স্ত্রীকে মেরে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছে, আর কে তাতে সাহায্য করছে জানেন? হ্যাঁ, মা-ভগ্নিরুপে (শাশুড়ি-ননদ-জা) আরও কয়েকজন নারী। কোনও শাশুরিকে কখনো এগিয়ে আসতে দেখেছেন এই বলে যে, হ্যাঁ, আমার ছেলে অন্যায় করেছে, যৌতুক চেয়ে বউ এর ওপর নির্যাতন করেছে, আমি ওর শাস্তি চাই? দেখেননি, আর দেখবেনও না। কারণ শত শত নারীর মাতৃপ্রেম সন্তানের কোনও অন্যায় জন্ম দেওয়ার পর থেকেই দেখেও দেখে না, আর ক্রমাগত প্রশ্রয় আশ্রয় অনেক পুরুষের অপরাধের শেকড় আরও শক্ত করে, যা পরবর্তিতে সমাজে মহীরুপ ধারণ করে অনাচারের বিস্তার ঘটায়।

একজন সন্তান সে ছেলে বা মেয়ে হোক, তার শৈশবকে আনন্দময় আর ভবিষ্যতকে উজ্জ্বল করতে মা-বাবার চেষ্টার ত্রুটি থাকে না। মা-বাবা চান তার মেয়ে যেন শ্বশুরবাড়ীতে রাজকন্যার মতন যত্নআত্তি পায়। কিন্তু সেই একই মা-বাবা তার ছেলের বউয়ের ক্ষেত্রে কেন বিরূপ আচরণ করেন, তার মনস্তত্ত্ব বোঝা সত্যি দায়।

অন্য পরিবার থেকে আসা একটা মেয়ে, যে কিনা তার আজন্ম চেনা পরিবার ছেড়ে এসে অচেনা একটি পরিবারকে আপনজন করে নিতে এসেছে, অজানা অচেনা মানুষগুলির মন জুগিয়ে চলতে চেষ্টা করছে, সেই পুত্রবধুর পান থেকে চুন খসতেই দোষ খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা শ্বশুরের চেয়ে শাশুড়ির মাঝে কেন এতো বেশি থাকে, কে জানে! নিজের মেয়ে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘুমালেও বউকে উঠতে হবে সকাল ৬ টায়।

কিন্তু সমাজে অনেক পুরুষ আছে, যারা ক্রমাগত পাশের নারী বা মেয়ে শিশুটির চলার পথকে সুগম করছে, নারীর পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীর উন্নয়নের জন্য লড়াই করছে, শিক্ষার জন্য আর তার অধিকারের জন্য।

ছবিটি প্রিমা নাজিয়া আন্দালিবের আঁকা

আসলে নারীবাদ কেউ জন্মগতভাবে পায় না, এটা একটা আদর্শ, যা নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে, আর যতক্ষণ এই আদর্শের মূলকথা নারী পুরুষ উভয়ই মেনে না নিচ্ছে, একসাথে হাত মিলিয়ে কাজ না করছে, ততক্ষণ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে যতোই লড়ে যান কাজ হবে না। কারণ আপনার পাশে যে নারী ঘাপটি মেরে আছে নিজের অজান্তে আরেক নারীর পথ অবরুদ্ধ করতে, তাকে জাগাতে হবে, সচেতন করতে হবে, তার বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। হ্যাঁ, আপনার পাশে থাকা নারীর অন্যায় আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলতে হবে, হোক না সে আপনার নিজের মা-বোন-আত্মীয়া-বান্ধবী। তা না হলে প্রদীপের পাদদেশের অন্ধকার ঘুচবে না। তাই আপনি সাহসী হোন পাশে থাকা মানুষটির অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে, তা সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন।

ভাবার কোনো কারণ নেই যে আমি পুরুষ সাঁড়াশিকে মেনে নিতে রাজি, পুরুষের করা অন্যায় মাথা পেতে নিতে রাজি- না মোটেও না। কথা হলো ঘরে বাইরে নারীর প্রতিকূলতায়, অনুন্নয়নে যদি নারী-পুরুষ উভয়ই দায়ী থাকে, তবে তাদের সবাইকেই সাহসিকতার সাথেই মোকাবেলা করতে হবে। হতে পারে পারিবারিক কাঠামো, অনেক নারী চিন্তা চেতনায় এখনো মধ্যযুগীয়, তারা সজ্ঞানে অজ্ঞানে চারপাশের এগিয়ে চলা নারীকে পেছনে টেনে ধরে, কিন্তু তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে নারী-পুরুষ উভয়েরই চেষ্টা করতে হবে। আর সেটা পরিবারের ভেতর আর বাইরে থেকেই।

ভুর্জবুর্গ, জার্মানি থেকে

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.