শিক্ষিত চাকরিজীবী নারীরাও যখন নির্যাতনের শিকার  

কেয়া তালুকদার:

গ্রাম ও শহরে কিছু নারী তুলনামূলকভাবে কম শিক্ষিত, এবং তারা গৃহস্থালির কাজ করে ৷ বাবা-মা বলে দেয়, স্বামী যা বলে তা শুনতে, অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে৷ যাতে সংসারটা ভেঙে না যায়৷ তাই নিজের জগতটাকে সঁপে দেয় স্বামী আর সন্তান লালন-পালনে। তাদের চাওয়া পাওয়াগুলো নির্ভর করে স্বামী আর সন্তানদের উপর ৷ ফলে নিজস্ব কোনো জগতে নিজের অধিকারে বিচরণ করতে পারে না৷

আদিম যুগ থেকে দেখে আসা ও শিখে আসা পারিবারিক জীবন আচরণগুলোকে পুঁজি করে দিনগুলো কেটে যায় ৷ সকাল থেকে রাত অবধি স্বামী সেবা ও তার ফরমায়েস খাটতে হয় ৷ একটু কাজের ভুল ত্রুটিতে গর্জে উঠেন স্বামীধন৷ সন্তানদেরও চোখ রাঙানী দেখতে হয়৷ যেন চুন থেকে পান খসার মতো অবস্থা৷ সব সর্বনাশ হয়ে গেছে৷ আমার চোখে দেখা মামী- চাচীদের দেখেছি সর্বদা হুকুম পালন করতেই দিন যায় ৷ সময়মতো সবকিছু না পেলে, তার জন্য গালাগালিও শুনতে হয়েছে৷

এসব নারী তাদের আত্মসম্মানবোধ, মর্যাদাবোধের দুয়ার থেকে অনেক দূরে ৷ দুবেলা দুমুঠো ভাত আর তেল সাবান পেলেই বছরের পর বছর দিব্যি চলে যায় ৷ প্রতিবাদ করে কথা বলার অধিকার এদের কখনোই থাকে না ৷ সেইসব নারী কখনো নিজের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থা এবং অবস্থান নিয়ে কখনো ভাবে না ৷ হয়তো তারা এটুকু অনুভব করে সংসারে তার মূল্য কতটুকু? না পেলেও সেভাবেই জীবনটা কাটিয়ে দেয় ৷ সন্তানদের লেখাপড়া, বিয়েশাদি সব কিছুর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হলেন বাড়ির পুরুষ কর্তারা ৷

সবার ধারণা, ক্ষমতা না থাকার কারণে নারীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ৷ আমার দেখা বাস্তবতার নিরিখে আমি বলতে চাই, শিক্ষিত ও চাকরিজীবী মেয়েরাও প্রগতিশীল হয়েও তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে দূরে নয়৷ তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এলেও সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদার বিষয়টি থেকে গেছে সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সমাজপতিদের হাতে৷ এদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেনি৷

কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এইসব নারীরা অফিস আদালতে কাজ করলেও সংসারটা ঠিকই নখদর্পণে রাখতে হয়৷ ফলে কাজের চাপটা আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যায়৷ কোনো সময় অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে অফিসের বস, সহকর্মি অথবা কোনো ঘনিষ্ট বন্ধুদের নিয়ে সন্দেহের দেয়াল তোলে৷ এতে নারীর মানসিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় মনে৷ অশান্তির একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয় পরিবারে৷ সেই আগুন জ্বলতে থাকে আমরণ৷ অনেক সময় মারামারির পর্যায়েও চলে যায়৷

চাকরির কারণে বাড়ির বাইরে রাত্রিযাপন করতে আপত্তি তোলে অনেক স্বামীরা৷ এছাড়াও কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে চাইলে হাজারটা কৈফিয়ত৷ তিনবেলা নতুন নতুন তরকারির আইটেম লাগবে৷ তা করতে না পারলে স্ত্রীকে শুনতে হয় তুমি অলস! তোমার কোনো গুণ নেই ৷ ডেভিড কার্ড, ফেসবুক, ইমেইল আর মোবাইলের পাসওয়ার্ড এখন স্বামীদের দিতে হয়৷ এসব নিয়মিত চেক করা প্রগতিশীল স্বামীদের কর্তব্য হয়ে গেছে৷ উপার্জনের টাকা অনেক সময় স্বামীরা চায় তাদের নিজের হাতে নিতে৷ এতে তার খরচ করার স্বাধীনতাও খর্ব হয়৷

স্ত্রীর চাকরির কারণে অনেক স্বামী দায়িত্ববোধ থেকে দূরে সরে আসে ৷ খুব কমসংখ্যক পুরুষ আছে যারা তাদের স্ত্রীকে টাকা খরচের স্বাধীনতা দেয়৷ স্ত্রীরা নিজের টাকা খরচ করে শখের জিনিস কিনলে স্বামীদের গালমন্দ করে৷ নিজেদের টাকা কোথায় কিভাবে খরচ করছে তার হিসেব দিতে চায় না৷ সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্বটা মায়ের৷ এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা করে স্ত্রীর সাথে৷ স্ত্রীর চাকরি না থাকলেও তাদের উপর সংসার চাপ দেয়৷ তাদের মনে লালন করা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ভূত যেন ঘাড় থেকে নামানোই যায় না৷ কথায় কাজে সবসময় তা স্মরণ করিয়ে দেয়৷

শিক্ষিত নারীরা ঘরের বাইরে ঠিকই বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু দাসত্বের সেই শিকল পায়ে পরানোই আছে ৷ কোনো মানবিক মূল্যবোধের মূল্যায়ন কি তারা পাচ্ছে? নাকি পাচ্ছে কোন মানসিক প্রশান্তি? সমাজের উচ্চ শ্রেণীর সঙ্গে এইসব নারীর ব্যাপ্তি ঘটেছে  ঠিকই, কিন্তু বাড়েনি তাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটা৷ কতো নারীকে দেখেছি রাতের আঁধারে চোখের পানি ফেলতে আর মনের মৃত্যু ঘটতে৷ এই সব নারীর স্বামী পর নারীর সাথে সম্পর্কেও জড়িয়ে যায় অনেক সময়৷

পাড়া পড়শি আর আত্মীয়স্বজনরা বলেন, চাকরি করার কারণে স্বামীকে সময় না দেওয়ায় এসব ঘটেছে ৷ এদের অনেকেই শারীরিক দিক দিয়েই তৃপ্ত থাকে না অনেক নারী৷ তবুও বাধ্য হয়ে পড়ে থাকেন স্বামীর সংসারে৷ সংসার ভাঙে না সন্তানদের কথা চিন্তা করে৷ কখনও আবার চাকরি ছাড়তে হয় সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য৷ অথচ পুরুষকে কখনো তা করতে হয় না৷ কখনো চাকরিতে পদোন্নতি হলেও জায়গা বদল হবে বলে তা গ্রহণ করতে পারে না ৷

শিক্ষিত ও অশিক্ষিত সবার মধ্যেই নারীদেরকে যৌতুকের বলি হতে হয়৷ আগুনে পুড়িয়ে মারে, কাউকে কাউকে খুন করে৷ কাউকে এসিড দগ্ধ করে ৷ কেউ বা আত্মহত্যাও করে। তবে অধিকাংশ ক্ষেতেই সমঝোতা করে চলতে হয় ৷ কলকাতার ‘প্রাক্তন’ ছবি শিখিয়ে দিলো সমঝোতা মানে হেরে যাওয়া নয়৷ এভাবেই নারীরা আত্মসম্মানের বলি দিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে আগামীর পথে৷ পথটা কন্টকময়, প্রতিটি ক্ষণকে পার করতে হয় যুদ্ধবিগ্রহ করে ৷

পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটলে কখনোই এই নারীরা নির্যাতনের হাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না ৷ এদেশের পুরুষরা  বাহিরে প্রগতিশীলতা দেখালেও অন্তরে সেই আদিম হয়েই থাকে৷

শেয়ার করুন:
  • 735
  •  
  •  
  •  
  •  
    735
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.