কানাডায় রুমানার অন্য এক জীবন

romanaউইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক (১৩ জুলাই): স্বামীর অত্যাচারে দুচোখ হারানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুর এখন কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা। কানাডা সরকার তার পাশাপাশি তার বাবা-মা এবং কন্যাকেও গ্রহণ করেছে। কানাডাই এখন তার দেশ। সম্প্রতি মাস্টার্স ডিগ্রিও শেষ করেছেন ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে। তবুও রুমানা ফিরে যেতে চান বাংলাদেশেই। আইনি লড়াইয়ে দাঁড়াতে চান বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের পাশে। টরন্টোর বিভিন্ন মিডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি তার এই আকাংখার কথা তুলে ধরেছেন। একই সাথে কানাডার মূলধারার পত্রিকাগুলো তুলে ধরেছে কানাডায় রুমানার অন্য এক জীবনের ইতিবৃত্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুর উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় এসেছিলেন। ছুটিতে দেশে গিয়ে স্বামীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তার দু’টি চোখই অন্ধ হয়ে যায়। নাক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠার পর আবার ফেরত আসেন কানাডায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, কানাডা সরকার এবং বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতায় তিনি আবার নতুন জীবন ফিরে পান।

নিচু ভূমির দেশ হিসেবে এখন পরিচিত বাংলাদেশ। এই দেশের ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনের কি মারাত্মক প্রভাব পড়বে তার ওপর তিনি মাস্টার্সের থিসিস করেন। গত ২৮শে জুন সেই থিসিস জমা দেন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার একটি জমায়েতে। থিসিস জমা দিয়ে তিনি এর পক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন। ওই রুমে তখন উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন প্রফেসর, বন্ধু, পারিবারিক সদস্য ও অনুসারী শিক্ষার্থীরা। রুমানার বক্তব্য শেষ হতেই সবাই তাকে অভিনন্দিত করে। রুমানার কাছে অন্ধকারময় হতাশার ভিতরেও যেন সেই প্রশংসা ছিল বিদ্যুচ্চমকের মতো।

তার এ পথে চলা শুরু হয়েছিল জানুয়ারিতে। বলেছেন, আমি নিজেকে বোঝালাম। কিছুই বদলে যায়নি। কান্না কোনদিন কোন কিছু পরিবর্তন করে দিতে পারে না। তাই তোমাকে সামনে এগোতে হলে নিজেকে নিজের আসনে বসাতে হবে। সেই থেকে আমার নতুন যাত্রা শুরু। ফিরে পেতে চাইলাম আমার মুখের হাসি। জানুয়ারিতে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবো না। তাতে ভবিষ্যতে আমি সুখী বা অসুখী যা-ই থাকি না কেন।
কানাডার দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রুমানা বলেছেন, আমি কখনও ভাবিনি আজকের এই দিনটি আমার সামনে ফিরে আসবে। আগামী সেপ্টেম্বরে তিনি ইউনিভার্সিটি অব বৃটিশ কলাম্বিয়ায় আইন নিয়ে পড়াশোনা করবেন। সিএনআইবি থেকে তিনি সহায়তা পেয়েছেন কিভাবে নিজের বাড়ি চিনতে হবে। সম্প্রতি তিনি নিয়েছেন অ্যাক্রোবেটিক যোগ ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ। তিনি সফটওয়্যারের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখন অন্ধদের পড়ালেখার কৌশল ব্রেইল পদ্ধতি শিখছেন। রুমানা যা বলেন তা তার অনুসারী শিক্ষার্থীরা টেক্সট বইয়ে রেকর্ড করে, টাইপ করতে সহায়তা করে, সম্পাদনা করতে সহায়তা করে। রুমানা বলেছেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান। তবে খুব শিগগিরই নয়। বর্তমানে তিনি, তার মেয়ে আনুশেহ ও পিতামাতা কানাডার স্থায়ী অধিবাসী।
রুমানা বলেছেন, যখন আমি প্রথম কানাডায় আসি তখন এটা আমার কাছে ছিল একেবারে একটি নতুন দেশ। আমাকে তার ভিতর পড়াশোনা করতে হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময় সেটাই যখন সব সমপ্রদায়ের মানুষ আমাকে সহায়তা করেছে। এটা এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। রুমানার এখন চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তার তুলে নেয়া চোখে বসানো হয়েছে দু’টি কৃত্রিম চোখ। তা দিয়ে তিনি দেখতে পান না। তবে তা তাকে দিয়েছে এক স্বাভাবিক চেহারা। এ জন্য কেউ তার দিকে তাকালে তাকে অন্ধ বলে মনে হবে না। তার হাতে রয়েছে এমন একটি ঘড়ি যা তাকে সময় বলে দেয়।
(কানাডা থেকে প্রকাশিত অনলাইন পত্রিকা নতুন দেশ থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.