আড়ালের গল্প…  

নাহিদ খান:

কোথাও বেড়াতে গেলে আমার ভীষণ চোখে পড়ে বাংলাদেশের মেয়েগুলো এতো দু:খী, একা, উপেক্ষিত …

নীলগিরি, বিছানাকান্দি, সাজেক, শ্রীমঙ্গল, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন সব জায়গায় বেড়াতে গিয়ে সুন্দর সাজপোশাক পরা, হাসিমুখ মেয়েগুলোর ভেতরকার বিষাদ আমার চোখে পড়ে…।  

নাহিদ খান

একটু ব্যাখ্যা করি, ধরা যাক সাধারণ একটি মেয়ের কথা। বাংলাদেশের সমাজে হাতে গোনা ব্যতিক্রম ছাড়া মেয়েরা একটু বড় হওয়ার পর থেকে বাবার সাথে প্রত্যক্ষ কোন যোগাযোগ থাকে না, আদর, গল্প, আড্ডা কিচ্ছু না। কন্যা-পিতার চাহিদা-যোগানের সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী থাকেন মা।

ধরা যাক সেরকম সাধারণ একটি মেয়ের কৈশোরে, প্রথম তারুণ্যে খুব শখ হলো সমুদ্র দেখার। সে বার কয়েক মা’কে বলে, ‘মা’ বাবাকে বলো না আমাদের কক্সবাজার নিয়ে যেতে’। মা একদিন স্বামীকে সেটা জানান- ‘মেয়েটার কতো শখ সমুদ্র দেখবে’।

বাবা রেগে ওঠেন, ‘কারো খবর নেই আমি কীভাবে সংসার চালাই, মেয়ে বললো, আর তুমি নেচে উঠলে, ডাল-ভাত যোগাড় করতে পারি না, সমুদ্র’, ইত্যাদি ইত্যাদি। বাবা গ্রাম্য চাষীর উত্তরাধিকার, সমুদ্র দেখার সাধ তিনি বোঝেন না।  

অভিমানী, বিমর্ষ মেয়ের চুলে বিলি কাটতে কাটতে মা বলেন, থাক, বাবার ওপর রাগ করিস না। বিয়ের পর বরের সাথে ঘুরতে যাবি, কতো জায়গায় যাবি, কতো আনন্দ করবি। মেয়েটি দুঃখ ভুলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

সেই মেয়ের বিয়ে হয় একদিন। দিন যায়, মাস যায়, কই বর তো সমুদ্রে নিয়ে যাবার কথা বলে না!  বলবে কেনো, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সেও মনে করে, বউ মানে ধোয়া মোজা, শার্ট, টেবিলে তিন-চার পদ তরকারি, আর কী? বছর পেরিয়ে গেলে মেয়েটির আড়ষ্টতা একটু ভাঙ্গে, একদিন বলে ‘তুমি আমাকে কক্সবাজার নিয়ে যাবা’? স্বামী চেঁচিয়ে ওঠেন- ‘উফ সারাদিন খিটখিট ভাল্লাগে না, বাইরে কাজ, ঘরে অশান্তি, কক্সবাজার যেন চাইলেই যাওয়া যায়’ ইত্যাদি ইত্যাদি। হতভম্ব মেয়েটি বাথরুমে গিয়ে লুকায়, দেড় বছর পর একবার মোটে কোথাও বেড়াতে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করাটা ‘সারাদিন খিটখিট’?!

বছর গড়ায়, সংসারে সন্তান আসে, একজন, দুজন। দু’চার বছর পর কীভাবে যেন স্বামীপ্রবর এর একবার সাধ হয় পরিবার নিয়ে সমুদ্র দর্শনে যাবেন। বউকে তো কোনো কথা সুন্দর করে বলার নিয়ম নেই, তাই তিনি যথারীতি খেঁকিয়ে ওঠে বলেন, ‘সারাদিন তো মাথা নষ্ট করে ফেলো, চলো কক্সবাজার ঘুরিয়ে আনি’। বোকা মেয়েটা সব ভুলে পুলকিত হয়ে ওঠে, বাবুদের লাল জামার সাথে লাল জুতো কেনে, নিজের নীল চুড়ির সাথে নীল টিপ।

তারপর একদিন তারা সত্যি সত্যি ঘর থেকে বেরোয় সমুদ্রের উদ্দেশে। অবশ্য, তার আগে মেয়েটিকে ব্যাগ, বাসার সব গোছাতে হয়, ভোররাতে ওঠে সকালের নাস্তা, তবু তো যাচ্ছে সে সমুদ্রে।  

সৈকতে একটা শিশু এদিকে ছুটে তো, স্বামী খেঁকিয়ে ওঠেন, অ্যাই, বাবুকে ধরো। আরেকজন বলে পানি খাবে, মেয়েটা অপরাধীর মতো বলে, ‘ইশ পানি তো আনিনি’। স্বামী আবার খ্যাক খ্যাক করে উঠেন, ‘তা আনবে কেনো, নিজের সাজগোজ করতে করতেই তো শেষ’।

মেয়েটির ইচ্ছে হয়, সবাই মিলে একটা ছবি তোলার, স্বামীকে ডাকে, ‘এ্যাই বাবুর বাবা’। বাবুর বাবা, যিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন বউ এর সাথে স্বাভাবিক গলায় কথা বলতে হয় না, আবার চেঁচান ‘কী হয়েছে, এখানে এসেও শান্তি দেবে না’?  

মেয়েটি ক্ষীণস্বরে বলে, ‘আসো একটা ছবি তুলি’।

পৃথিবীর বিশ্রীতম কাজ করছেন এমন ভঙ্গিতে স্ত্রী-সন্তানের সাথে ছবি তুলে তিনি আবার হনহন করে দৃশ্য দেখতে এগিয়ে যান।

আমি একবার দেখেছিলাম ছেঁড়াদ্বীপে একটা মেয়ে শাড়ি আর উঁচু জুতো পরে প্রবালের ওপর হাঁটতে পারছিল না। অদূরে তার স্বামী, মেয়েটি হাত বাড়িয়ে ডাকছে, ‘এ্যাই, আমাকে ধরো তো’… স্বামী ঘুরে ষাঁড়ের মতো চেঁচালেন, ‘হিল জুতা পইরা আসছে, ব্যাক্কল মেয়েমানুষ’। আমার ইচ্ছে করছিল একটা বড়সড় প্রবাল তুলে ঐ হারামজাদার মাথা বরাবর মারি। ইতর, অসভ্য তুই নিজে তো দিব্যি সুন্দর একটা স্নিকার্স পরেছিস, এইরকম আরেক জোড়া বউকে কিনে দিয়ে বলতে পারিসনি, সেন্টমার্টিনে এরকম জুতো লাগবে?

কিছুক্ষণ পরে দেখি দুজন সেলফি তুলছে…।  

আরো কিছু বিষণ্ণ মেয়েকে দেখবেন, পানিতে পা ডুবিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করে একা একা হাঁটছে। মাথা উঁচু, কারণ, নিচু করলে চোখের জল টপ করে গড়িয়ে পড়বে। তাদের পুরুষেরা হোটেলের লবিতে বসে স্মার্টফোনে গেমস খেলেন, কফি খান, ফেসবুকিং করেন, কীসব সিলি সূর্যাস্ত টুর্যাস্ত… আয়েশ করে সিগারেট খেয়ে একবার গিয়ে হাজির হন স্ত্রীর পাশে, মেয়েমানুষ ছবি-টবি তুলুক, তার নিজের সিগারেট খাওয়াটা জরুরি। তারপর পেছন থেকে গিয়ে কোন একসময় একটা ছবি তুললেই হলো, সেটাই যথেষ্ট!

এই ছবিগুলো দেখেই আপনারা মাশাল্লা, নাইস কাপল, হ্যাপি ফ্যামিলি ইত্যাদি কমেন্ট দেন। আমি ছবিগুলোর পেছনের গল্প দেখি, দুঃখী বিষণ্ণ উপেক্ষিত মেয়েগুলোর গল্পগুলো দেখি…   

এদেশের স্বামীরা হয় স্ত্রীদের সামনে হনহন করে চলেন, একটু পরপর তাদের ‘এ্যাই, এ্যাই’ বলে ডাকতে হয়, তারা যারপরনাই বিরক্ত হন। অথবা তারা পেছন থেকে কোনো একসময় এসে যোগ দিয়ে আবার চলে যান নিজের জগতে।

তারা স্ত্রীদের পাশাপাশি হাঁটেন না…।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.