মেধাবীর সংজ্ঞা ও আমিসহ আমাদের সবার ‘ফকিন্নির পুত’ মানসিকতা

adity falguli
অদিতি ফাল্গুনী

অদিতি ফাল্গুনী (১‌৩ জুলাই): একটা কথা বললে সবাই আমাকে মারতে আসবে জানি। ব্লগার এন্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক বা বোয়ানের পাতায় জনৈক কাওসার আহমেদের শেয়ার করা ‘হ আমরা ফকিন্নির পুত’ সংক্রান্ত একটি লেখা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তার লেখার প্রতিবাদে ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠাটাও অমূলক নয়। কিন্তু কাওসার আহমেদের লেখার প্রতিবাদে একটি বড় লেখা যেটা শেয়ার হচ্ছে, সেখানে যে কথাটা বলা হচ্ছে যে কত কমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়েরা খায় বা থাকে এবং মধ্যবিত্তের ছেলে-মেয়ের কত দারিদ্র্য ইত্যাদি ইত্যাদি…এ বিষয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে।

বছর দুই আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই সম্ভবত: আবাসিক হলে ছাত্র-ছাত্রীদের সিটের দাম মাসিক মাথা পিছু আট থেকে দশ টাকা বাড়ানোর কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিবাদে-সঙ্ঘর্ষে-বিক্ষোভে উত্তাল ও ভাঙচুর হয়েছিল। কিন্তু এই যে ছাত্র-ছাত্রীরা এই সামান্য সিট ভাড়া বাড়ায় নিশ্চিত অগ্নিঝরা শ্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধুয়ে-মুছে একাকার করেছে, জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর করেছে তাদের প্রত্যেকেরই হয়তো আছে দুই বা ততোধিক মোবাইল সেট। রবি, গ্রামীণ বা সিটিসেল। নব্বইয়ের দশকে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তখনো আমাদের সব ছাত্র-ছাত্রীর হাতে মোবাইল বা কম্পিউটারের কথা ভাবাই যেত না। এখন প্রতিটি হল বা হোস্টেলে প্রায় সব ছাত্র-ছাত্রীরই কম্পিউটার বা ল্যাপটপ আছে। ইন্টারনেট কানেকশন যুক্ত মোবাইল আছে। প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে এই ছাত্র-ছাত্রীরা ভ্যালেন্টাইনস ডে, নববর্ষ বা পহেলা ফাল্গুনে কম পানাহার বা খরচ করে না। করবে নাই বা কেন? এখন রিক্সাওয়ালাও এদেশে মোবাইল ব্যবহার করতে পারে। এটা আমাদের গর্ব। দেশে দারিদ্র্য অর্দ্ধেক হ্রাস পেয়েছে। না খেয়ে মরে না গ্রামের বর্গাচাষীও। মধ্যবিত্তের যে ছেলে বা মেয়েটি ঢাকা বা বড় কোন শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে, তাকে তার বাবা-মা টাকা দেয়। বড় ভাই-বোন দেয় হাত খরচ। টিউশনিতেও এখন ভাল আয় হয়। দু’জন ইংলিশ মিডিয়ামের বাচ্চা পড়ালে ন্যূনতম ছয় হাজার টাকা পাওয়া যায়। চারুকলার ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইন্টেরিয়র ডিজাইন থেকে নানা কাজে, সাংবাদিকতার ছাত্ররা সেকেন্ড ইয়ার থেকে টিভি চ্যানেলে, কমার্স বিভাগের ছাত্ররা নানা প্রাইভেট ফার্মে কাজ পায়। ছাত্রজীবনেই অনেকে দিব্যি চাকরি শুরু করে দেয়।

‘ফকিন্নির পুত’ আমরা কেউই নই। কিন্তু আমাদের মানসিকতায় একটু ‘ফকিন্নির পুত’ ব্যাপার আছে। আমরা মেয়ে বা বোনের বিয়েতে লাখ টাকার সোনার গয়না দিতে পারি, এক বছরের শিশুর জন্মদিনে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করতে পারি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন টাকা বাস ভাড়া বাড়ালে প্রতিবাদে উত্তাল হই। যান না আমেরিকা ইংল্যাণ্ড সহ পৃথিবীর যে কোন দেশে! ৬৬০ টাকায় ছয় বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা-খাওয়া-পড়া বের হয়ে যাবে! আমি এই দরিদ্র দেশে শিক্ষার বাণিজ্যকরণের কথা বলছি না। কিন্তু আমি দামি জামা-কাপড়, জুতা-ঘড়ি বা অন্যান্য বিলাস দ্রব্য ব্যবহার করতে পারলে কেন পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের হারে সাবসিডি চাইব? এজন্যই আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাবসিডি দিতে দিতে অচল হয়ে পড়ছে। কিছু বামপন্থী ছাত্র সংগঠনও এই অদ্ভুত সব দাবির জন্য রক্ত দানে উস্কায়! তারাও এমন কিছু বিপ্লবী নয়। পাশ করার পর সরকারি চাকরি, এনজিও বা ডিভি ফর্ম পূরণ করে আমেরিকা যাবার লাইনে দাঁড়ায়।

পিএসসির এত কোটা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু কোন্ সরকারি চাকরির জন্য এত পাগল হয়ে উঠছি আমরা? যে বেতনে ঘুষ না খেলে হাড়-মাংস অক্ষুন্ন রেখে বাঁচা সম্ভব নয়? ইদানিং পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর যারা ঘুষ খেতে পারে না তারা উর্দ্ধতনদের সাথে যোগাযোগ রেখে বছরের পর বছর বিদেশে জাতিসঙ্ঘ মিশনে থেকে লাখ লাখ ডলার আয়ের ব্যবস্থা করছে। দেশে তার সেবা পাচ্ছে না দেশবাসী। এই যে পিএসসি অফিসাররা…আপনাদের মফস্বলে পোস্টিং হলে সেটা ঢাকায় বদলির জন্য কত তব্দির করেন আপনারা? মফস্বলে সরকারি ডাক্তাররা কাজ না করে ছুটির পর ছুটি নিয়ে ঢাকায় প্রাইভেট প্র্যাক্টিস বা ঢাকার বেসরকারী ক্লিনিক-হাসপাতালে মোটা বেতনের চাকরি করেন না? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও খ্যাপ মারে প্রাইভেটে নয়তো করেন দেশী-বিদেশী এনজিওর কনসালটেন্সি। প্রাইভেটের মোটা বেতনও চাই আবার সরকারি ছাপাও চাই। গাছেরও খাবো, তলারও খাবো। বরং স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড অনেকেই ঘুষ যারা খেতে পারবে না তারা সরাসরি বেসরকারি ভাল বেতনের কাজে ঢুকে পড়ছে। বেসরকারি কাজের নানা অনিশ্চয়তাও পাশাপাশি আলিঙ্গন করছে। এই কোটার আন্দোলন সরকারি চাকরির জন্য না ঘুষের জন্য? কনফিউজড…আমি খুব কনফিউজড্…!

বাঙালীকে কিছু বলাও মুশকিল। মেধা মানেই স্কুল-কলেজে নোটবই আর কোচিং গুলে কিছু নম্বর। মানে মানে অনার্স- মাস্টার্স করে বিসিএস গাইড কিনে ‘পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম পাখির নাম কি?’ জাতীয় আবোল-তাবোল প্রশ্ন করে একটি সরকারী চাকরি জুটিয়ে বারো হাজার টাকার চাকরি পেয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে কয়েক লক্ষ টাকার যৌতুকে বিয়ে করে বাকি জীবন ঘুষের টাকায় সংসার! কুৎসিত শোনাচ্ছে? বাস্তবতা! হায় মেধা! তারা নারী, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী কাউকে ছাড় দেবে না। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের গালে জুতা মারবে। আবার তারাই ডিভি-১ এর লাইনে দাঁড়াবে। এদের ‘ফকিন্নির পুত’ বলা খুব কি অপরাধ? কাওসার আহমেদ তার মনের জ্বালাটা হয়তো ভুলভাবে প্রকাশ করে ফেলেছেন। কিন্তু আমাদের সবার…আমাকে নিয়েই বলি…‘ফকিন্নির পুত’ মানসিকতা আছে! টু সাম এক্সটেন্ট!

পরিশেষে বলবো ‘মেধা’ অত সহজ বৃত্ত নয়। মেধাবী মানুষকে সংবেদী হতে হয়। হুইল চেয়ার বন্দী মুক্তিযোদ্ধার ছেলে-মেয়ের জন্য শুধু নয়, বাগানের একটি পা ভাঙ্গা শালিক পাখির জন্যও প্রকৃত মেধাবী কাঁদে। মেধাবী মানুষ স্বপ্নচারী। নোটবই মুখস্তকারী নয়। মেধাবী হলেন বিল গেটস বা স্টিভ জবস। মেধাবী স্টিফেন হকিন্স। মেধাবী হলেন স্কুল না ডিঙ্গানো রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল। চাকরি জীবনে লাগাতার অকৃতকার্য জীবনানন্দ দাশ। মেধার অমন কোন মসৃণ সংজ্ঞা নেই বা দিতে পারছি না বলে আমি সত্যিই দু:খিত।

লেখক পরিচিতি: লেখক ও সাংবাদিক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.