নিকষ আঁধার পথে আলো হাতে এলো যাঁরা-৫

শারমিন জান্নাত ভুট্টো:

“Those who do not move, do not notice their chains” ঊনিশ শতকে রোজা লুক্সেমবার্গ এর এই উক্তিটি যেন আজো চিরন্তন সত্য আমাদের সমাজে। যেসব নারী তাদের চৌকাঠ পেরুতে পারেননি, বা ইচ্ছে করেই বের হননি, তারা বুঝবে কী করে আদতে তারা কীভাবে সমাজের শৃঙ্খলে আবদ্ধ!

উনিশ শতকের শেষে বা বিশ শতকের গোড়ার দিকে যখন মার্কসবাদী শ্রেণী সংগ্রামের দর্শন বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ঝড় তুলেছে, নব্য পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে তুলছে, সে সময়ে রোজা লুক্সেমবার্গ, ক্লারাসেৎকিনের মতো নারীদের আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্ব নারীমুক্তির ক্ষেত্রে বিশাল পদক্ষেপ।

পশ্চিমা ইউরোপীয়ান সমাজে নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতা তখন ছিল একেবারেই অকল্পনীয়। ইউরোপের অনেক দেশেই তখনও নারীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি আধুনিক বুর্জোয়া নারীবাদও বিকশিত হয়নি। সেখানে রোজার মতো নারীদের কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্রী আন্দোলনে ভূমিকা রাখা, বিশ্ব বিপ্লবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত নারীদের জন্য মাইলফলক হয়ে আছে।

রোজা লুক্সেমবার্গ কমিউনিস্ট আন্দোলনে শুধুমাত্র সক্রিয় কর্মীর ভূমিকাই পালন করেননি, তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন-এর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক-এর প্রধান নেতারা যখন সংশোধনবাদী হয়ে যায়, তখন রোজা সঠিক মার্কসবাদী লাইনের পক্ষে থেকে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালান। এবং বিপ্লবী নেতা-কর্মীদের নেতৃত্ব দেন।

তিনি ছিলেন একাধারে বিপ্লবী রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সমাজতাত্ত্বিক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের বিপ্লবী অংশের প্রধান ছিলেন তিনি।

নিম্ন মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ রোজা ১৮৭১ সালের ৫ মার্চ পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই রোজা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। ১৮৮৯ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে পালিয়ে যান। তখন পোল্যান্ড থেকে না পালালে রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য তাঁর নিশ্চিত কারাদণ্ড হতো। জুরিখে লুক্সেমবার্গ আইন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর পড়ালেখা এবং ১৮৯৮ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

রোজা নিজেকে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ বলে মনে করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একমাত্র সমাজতন্ত্রের মাধ্যমেই মানুষের সত্যিকারের মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার সম্ভব। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তাঁর পেশাজীবনে প্রবেশ ঘটলেও পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও বন্ধ থাকে না। খুব দ্রুতই তিনি পোল্যান্ড ও লুথিয়ানার সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান।

নিজের মতাদর্শ প্রকাশ করতে ১৮৯২ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত তিনি সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সাতশ’রও বেশি প্রবন্ধ লেখেন। স্বাধীনতাকে রোজা এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন, “Freedom is always the freedom of the dissenter”।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লুক্সেমবার্গ দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাবরণ করেন। সে সময় তিনি অক্টোবর বিপ্লবকে বিশ্ববিপ্লবের অগ্রদূত হিসেবে স্বাগত জানান। বিশ্ব ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে তিনি সমাজতন্ত্র অথবা বর্বরতার মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নিতে আহ্বান জানান।

১৮৮৯ সালের দিকে রোজা জার্মানীর বার্লিনে গিয়ে যোগদান করেন সেখানকার রাজনৈতিক সংগঠন ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি সেখানেও। ১৯০৪ সালে রোজাকে জেল খাটতে হয় তিনমাসের জন্য শুধুমাত্র তৎকালীন সম্রাটের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভাষণ দেয়ার খেসারত হিসেবে। তবুও দমে থাকেননি এই মহিয়সী নারী। তিনি বরঞ্চ জেলে গিয়েও সেখানকার বন্দীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে থাকেন মাকর্সবাদ তথা সমাজের শ্রেণী বৈষম্য, সংগ্রাম, নিপীড়ন আর জার্মান সরকারের ফ্যাসিজমের কথা। তাঁর ব্যাপক প্রচারণার ফলস্বরুপ অনেক হাজতী পরবর্তীতে মুক্তি পেয়ে যোগ দেয় জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে।

১৯০৫ সালে রাশিয়ার শ্রমিক বিপ্লবকে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন জানান রোজা এবং জার্মান সর্বহারা শ্রেণীকেও রুশ বিপ্লবে উজ্জীবিত হওয়ার আহবান জানান। তবে রুশ বিপ্লব জয়ের স্বাদ না পাওয়ায় রোজা ফিরে যান পোল্যান্ডের বিপ্লবে অংশ নিতে। ভাগ্য এবার সুপ্রসন্ন হয়নি রোজার আর তাই গ্রেফতার হন ওয়ারশে। পরে অবশ্য মুক্তি পেয়ে পাড়ি জমান বার্লিনে। সেখানে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯০৭ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত টানা ৭ বছর সেখানকার  সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি স্কুলে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রোজা ও কার্ল লিবনেখট ‘স্পার্টাসিস্ট নামে একটি নতুন বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। আর এ সংগঠনে তিনি ছিলেন বেশ সক্রিয় আর তার অসীম উদ্যোগের কারণেই এ সংগঠনটি পরবর্তীতে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টিতে রুপ লাভ করে, যা ছিল অনেকটাই দু:সাধ্য একটা বিষয়। কারণ জার্মানীতে বার্নস্টাইন সংশোধনবাদীদের সামনে নতুন কোনো বিদ্রোহী সংগঠন গড়ে তোলা ছিলো নিদারুণ সাহসিকতার বিষয়।

রোজার সংগ্রামী চরিত্র আর কার্ল লিবনেখটের সাথে সখ্যতা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি জার্মান ফ্যাসিস্ট সরকার। তারা রোজাদের সংগঠনটিকে ধ্বংস করতে সব ধরনের চেষ্টাই চালিয়ে যেতে থাকে। শাইডেমার সরকারের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন রোজা ১৯১৯ সালে। তবে সেই বিদ্রোহে ব্যর্থ হওয়ার কারণে জার্মান সরকার রোজা ও কার্ল লিবনেখটকে গ্রেফতার করে। জেলখানায় নেওয়ার সময় ১৫ কিংবা ১৬ জানুয়ারি রাতে তাঁকে জার্মানির ফ্রিকোর্পস সৈনিকরা খুন করে। তাঁর মৃতদেহ নালায় ফেলে দেওয়া হয় এবং পাঁচ মাস পর তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রোজা লুক্সেমবার্গ তার সাহসিকতা আর কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের যে ছাপ রেখে গেছেন তা অবশ্যই উনিশ কিংবা বিশ শতকে বিশাল এক পদক্ষেপ নারীমুক্তির ক্ষেত্রে। রোজা লুক্সেমবার্গ বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনেসহ বিশ্ববিপ্লবে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ঘোষক কমরেড ক্লারাসেৎকিনের সাথেও তিনি কাজ করেছেন জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে। নিপীড়িত নারীদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন রোজা লুক্সেমবার্গ তাঁর কাজের মাধ্যমে।

এই মহীয়সী নারী শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্মালেও সেটা তার জীবনে কোনো প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। উপরন্তু নিজের সবটুকু সামর্থ্য, জ্ঞান আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি পরবর্তীতে নারী জাগরণের ভিত রচে দিয়ে গেছেন। রোজা সম্পর্কে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির অনেক মন্তব্য আছে, তাঁর মেধা ও প্রজ্ঞা নিয়ে কারও দ্বিমত ছিল না, এখনও নেই। একজন রুশ লেখক যেমন লিখেছিলেন, ‘When a girl arms herself with Rosa’s name she is as powerful and as dangerous as an armed man- she is a warrior and no-one will dare touch her.’

একদিকে শ্রেণীসংগ্রাম, অন্যদিকে নারী হিসেবে রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তিনি আপামর রাজনীতিপ্রিয় নারীদের জন্য জ্বলজ্বলে উদাহরণ হিসেবে স্মর্তব্য হয়ে আছেন। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির উক্তিতেই উপলব্ধি হয় রোজা লুক্সেমবার্গ আসলে কোন উচ্চতার মানুষ ছিলেন।

রোজার একসময়ের নারীবাদী বন্ধু ক্লারা জেটকিন রোজা সম্পর্কে লিখেছিলেন, :“She gave herself completely to the cause of Socialism, not only in her tragic death, but throughout her whole life, daily and hourly, through the struggles of many years … She was the sharp sword, the living flame of revolution.”

রুশ বিপ্লবের মহান নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন রোজাকে নিয়ে বলেছিলেন, ““Rosa Luxemburg was mistaken …; she was mistaken …; she was mistaken …; she was mistaken …; she was mistaken … But in spite of her mistakes she was – and remains for us – an eagle.”

তথ্যসূত্র:

উইকিপিডিয়া এবং অনলাইন গণমাধ্যম

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.