কন্যাকে লেখা খোলা চিঠি

ফারহানা আনন্দময়ী:

কন্যা, তুমি নারী হও, পরিপূর্ণ নারী হয়ে ওঠো। নারীকে যারা অনবরত ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে বলে তাদের সাথে আমার কোথাও একটা দ্বিমত আছে। নারী এবং পুরুষ তারা উভয়েই জৈবিকভাবেই মানুষ। পুরুষকে যদি আলাদাভাবে মানুষ হতে না হয়, ‘পুরুষ’ থেকেই মানুষের জীবনযাপন করতে পারে, নারীও পারবে।

কই, কখনো শুনেছো কোনো পুরুষকে বলা হচ্ছে, তুমি তোমার পৌরুষ বাদ দিয়ে কেবলই মানুষ হয়ে ওঠো। বলা হয় না এভাবে। তো, তুমিই বা কেন তোমার নারীত্বের সব গৌরব বাদ দিয়ে শুধুই মানুষ হবে? নারীত্বের সকল অহংকার আর গরিমা গায়ে জড়িয়েই  প্রবলভাবে মানববাদী হও বাইরে থাকুক কল্যাণী মূর্তি, ভেতরে উল্কার অগ্নিপিণ্ড

নারী হও, পরিপূর্ণ নারী, স্বাধীন নারী, স্বনির্ভর নারী… একজন পুরুষ ‘মানুষ’ হিসেবে যা কিছু স্বাধীনতা, সুবিধা উপভোগ করে জীবনযাপনে, তুমিও একজন নারী হয়ে ‘মানুষ’এর সকল স্বাধীনতা ও সুবিধা অর্জন করে নাও।

জানো তো, স্বাধীনতা কেউ কাউকে দু’হাত ভ’রে উপহার হিসেবে দেয় না, অন্ততঃ আমাদের সমাজে। এই সমাজ একজন পুরুষকে জন্মগতভাবে স্বাধীনভাবে পথচলার অধিকার দিয়ে দেয়। একজন নারীকে তা নিজ যোগ্যতায় অর্জন করে নিতে হয়। নিজ ইচ্ছেকে প্রতিষ্ঠিত করার অভ্যাসটা বেড়ে ওঠার বয়স থেকেই রপ্ত করে নিয়ো। মুক্তভাবে নিজের জীবন নিজেই যাপন করার ইচ্ছেটা প্রবল রেখো। নিজের ভার নিজে বহন করার শক্তিটুকু অর্জন কোরো। কখন ডানা মেলে উড়বে আর কখন দু’পায়ে জিরোবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটাই আসলে স্বাধীনতা। দু’পায়ে যে জিরোবে সেই পায়ের নীচের মাটিটাও তোমাকেই শক্ত ক’রে নিতে হবে। তার জন্যে চাই আত্মবিশ্বাস, তার জন্যে চাই সাহস, তার জন্যে চাই শ্রম। আর এই তিনটের জন্যেই চাই জীবনশিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো বটেই।  

একজন স্বাধীন স্বনির্ভর নারী স্বাভাবিকভাবেই তার ভাবনায় নারীবাদী হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, নারীবাদ মানে নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেই অধিকার আদায়ে নিজ নিজ পথে এগিয়ে চলাএই অধিকারের গন্তব্যে পৌঁছুতে সকলেরই পথ ভিন্ন, সকলের লড়াইও ভিন্ন। এও জেনো, নারীবাদী হতে হলে পুরুষবিদ্বেষী হতে হবে তা কিন্তু মোটেও নয়একজন নারীর জীবনে পুরুষ যখন বিরুদ্ধপক্ষ হয়ে সামনে দাঁড়ায়, সেই নারী জীবন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে। পুরুষ হয়ে উঠুক তোমার চলার পথের সহযাত্রী।

তুমি প্রকৃতিকে যেমন ভালবাসো, পুরুষকেও ভালবেসো, বন্ধু ভেবো। নারীর মতন ক’রে এমন কে আর ভালবাসতে পারে বলো? নারী ভালবাসায় এগোনো ব’লেই তো সন্তানধারণের মতন এমন ভালবাসাময় কাজটি প্রকৃতি পুরুষকে পেছনে সরিয়ে নারীকেই দিয়েছে।

তাই বলি, ঘৃণা নয়, বিদ্বেষ নয়, পুরুষকে ভালবেসো। ঘৃণা করবে ধর্ষক পুরুষকে, ঘৃণা করবে যৌনবিকৃতিমনস্ক পুরুষকে, ঘৃণা করবে প্রতারক পুরুষকে, সব পুরুষকে নয়। ভালবাসার ক্ষেত্রে শুধু প্রয়োজন সঠিক সঙ্গীকে খুঁজে নেওয়াএই খোঁজাখুঁজিতে জীবনের কিছু অপচয় হয়তো হয়, কিন্তু সেই অপচয়গুলোকে ‘রিসাইক্লিং’ পদ্ধতিতে সঠিক দর্শন ক’রে জীবনে যদি আবার কাজে লাগাতে পারো, বড় কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে নিজেকে তুমি বিরত রাখতে পারবে।

লেখক ও তাঁর মেয়ে অধরা মাধুরী

তবে নিজের জন্যে কিছুটা হাতে রেখে ভালবেসো। খুব আবেগী হয়ে তোমার সমস্ত সত্ত্বা, আমিত্ব যদি নিঃশর্ত সমর্পণ করো, তাহলে নিজের জীবনটাই একসময় অর্থহীন মনে হবে। তোমার ইচ্ছে-অনিচ্ছে, ভালো থাকা-মন্দ থাকার রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্র অন্যের হাতে কেন দেবে তুমি? নিজের জন্যে ততটুকুই হাতে রেখে দেবে, যতটুকু নিজের থাকলে ভালবাসার পুরুষটি তোমাকে ছেড়ে গেলেও নিজেকে কোনভাবেই নিঃস্ব মনে হবে না, জীবনকে ধ্বংস করার মতন নেতিবাচক চিন্তা ভাবনায় আসবে না।

তুমি তো জীবনের মূলমন্ত্রটা জানোই, “যে পথে যেতে হবে সে পথে তুমি একা, নয়নে আঁধার রবে ধেয়ানে আলোকরেখা।”

আর যে কথাটা তোমাকে বারেবারে বলি, তা হলো বিয়ের মতন প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কে নিজেকে তখনই জড়াবে যখন নিশ্চিত হবে এই সঙ্গী তোমার দাম্পত্যসঙ্গী শুধু হবে না, তোমার জীবনসঙ্গী হতে পারবে। খুব সহজ নয় কিন্তু, এই চিনে নেয়াটা। জানোই তো, নারীজন্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য কখনো বিয়ে কিংবা মাতৃত্ব হতে পারে না।  এই পৃথিবীতে জন্ম নেয়ার জন্যে এর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোনো কর্ম হয়তো প্রকৃতি তোমার জন্যে নির্ধারণ করে রেখেছে। আলোখানি ধরো হৃদয়ে, সঠিক বার্তাটি ঠিকই পড়তে পারবে তুমি। প্রকৃতিরও তো কিছু পাওনা আছে তোমার কাছে, তোমার কীর্তি দিয়ে কর্ম দিয়ে সেটাও তো তোমাকে শোধ করতে হবে।

ভালো থেকো। মুক্ত পৃথিবীর মুক্ত নারী হয়ে বাঁচো। পৃথিবীর বুকে বাঁচাটাকে অর্থপূর্ণ করে তোলো।   

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.