মানসিকতার মিলটাই মূলকথা

মনিজা রহমান:

‘আপু, আমি তো ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেন্টারে থাকি। স্ট্যাটেন আইল্যান্ড থেকে আপনার বাসায় আসলাম।’ বাসায় ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে কথাটা বলল মেয়েটি। ‘ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেন্টার’ শব্দটা শুনে হঠাৎ যেন ধাক্কা খেলাম। আমার স্কুল বান্ধবীর ছোট বোন ও। বয়সে আমাদের চেয়ে দশ বছরের ছোট হবে। বলতে গেলে হতে দেখেছি। সেই মেয়েটির এই দশা মানতে পারছিলাম না।

আমি বললাম, ‘তুমি না উডসাইডে ছিলে! ওখানে কবে গেছ?’ আমার জ্যাকসন হাইটসের বাসা থেকে কাছেই উডসাইড। আর স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে যেতে হলে প্রথমে ট্রেনে ম্যানহাটান যেতে হয়। সেখান থেকে ফেরি দিয়ে নদী পার হয়ে তারপর আবার ট্রেন বা বাস নিতে হয়।

ও খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে এরপর বলে গেল, ‘উডসাইডে আমার সাবেক স্বামীর বাসায় ছিলাম। ওর সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন আমি স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে একা থাকি।’

মনিজা রহমান

পারিবারিক নির্যাতনের স্বীকার নারীদের নিউইয়র্ক সিটির পক্ষ থেকে ওখানে বিভিন্ন বাসায় রাখা হয়। বাসা ভাড়া হিসেবে ১২০০ ডলার দেয়া হয়। আর খাওয়ার খরচের জন্য ৬০০ ডলারের ফুডস্ট্যাম্প।

আমার বান্ধবীর ছোট বোনের সঙ্গে কথায় কথায় অনেক কিছু জানলাম। ওর গ্লানিময় দিনরাতের কথা। ওর শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কথা। এক সময় বললাম, ‘লোকটা (ভদ্রলোক বলতে ইচ্ছে হল না) তো নিউইয়র্কে বেশ দামী এক পেশায় কর্মরত। আবার নিশ্চয়ই এখানে কিংবা বাংলাদেশে অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করবে। আবারো তাকে একইভাবে পীড়ন করবে।’

কথার প্রতিক্রিয়ায় মেয়েটি যে উত্তর দিল আমার খুব ভালো লাগলো। ও বলল, ‘আপু, কাউকে জাজ করতে চাই না। বলতে চাই না কে ভালো, কে মন্দ। নিশ্চয়ই সে তার মতো। যেটা আমি ছিলাম না। কিন্তু নিশ্চয়ই কেউ আছে যে ওই লোকের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে। বিয়ের পরে বাবা-মায়ের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখা যাবে না, বাইরে কাজ করা যাবে না- এই ধরনের সব শর্ত আগে জানিয়ে তারপর বিয়ে করা উচিত। যার যেমন মানসিকতা তার সেই মানসিকতার কাউকে পছন্দ করাটাই ভালো বলে আমি মনে করি।’

কথাটা আমার খুব মনে ধরল। এই পৃথিবীতে কোন মানুষের মানসিকতা আরেকজনের সঙ্গে মেলে না। তবু আমরা কিছুটা ছাড় দিয়ে দাম্পত্য জীবন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। বাঙ্গালী সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ এখনো অত্যন্ত অনাঙ্খিত বিষয়। স্বামী বা স্ত্রী কারো পরিবারই এটা স্বাভাবিক নিতে পারে না। নিজেকে নানাভাবে প্রবোধ দিয়ে, ছোট-বড় ত্যাগ করে একটা জীবন পার করে দিতে চায় বেশীরভাগ বাঙ্গালী নারী ও পুরুষ।

পুরো আমেরিকায় এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শ্বেতাঙ্গ নারীরা এই দেশে সবচেয়ে বেশী পারিবারিক নির্যাতনের স্বীকার হয়। আর এশিয়ানরা সবচেয়ে কম। এই পরিসংখ্যান প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন নয়। শ্বেতাঙ্গ নারীরা শিক্ষিত ও সচেতন বলে তারা পুলিশের কাছে রিপোর্ট করে। কিন্তু এশিয়ান নারীরা সেটা করেনা। একান্তই যখন কেউ করে, বুঝতে হবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তার। আমার বান্ধবীর ছোটবোনেরও তেমন হয়েছিল। কারণ ও জানতো বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনায় ওর বাবা-মা কত কষ্ট পাবে! কষ্ট পাবে ওর ভাই-বোনেরা। দূর থেকে তারা কিছু করতেও পারবে না। শুধু চোখের জল ফেলা ছাড়া।

পরিবারে শুধু নারীরাই নয়, পুরুষরাও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে গিয়ে দেখেছি, আমার পরিচিত অনেক ভাইয়েরা কাজে যাবার কথা বলে স্ত্রীদের না জানিয়ে সংগঠনে আসেন। এজন্য হয়ত তারা কোন ছবি তোলেন না। কারণ সেই ছবি কেউ ফেসবুকে দিলে স্ত্রী জেনে যাবে সে কোথায় গেছে!

আমি বিশ বছরের বেশী সময় ঢাকায় কণ্ঠশীলন নামের একটি সংগঠনে ছিলাম। সেখানে এক ভাই ছিলেন, এই সংগঠন ছিল যার ধ্যান-জ্ঞান। বিয়ের পরে তার স্ত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসে দেখল, এই সংগঠনে অনেক মেয়েরা আছে, ছেলে-মেয়েরা এক সাথে রিহার্সেল করে, পারফরমেন্স করে। এসব দেখে সে ক্ষেপে গেল। স্বামীকে জানিয়ে দিল- হয় কণ্ঠশীলন, নয়ত স্ত্রী- যে কোন একটা তাকে বেছে নিতে হবে। স্ত্রীর ইচ্ছার কাছে বলি হয়ে ওই ভাই দীর্ঘ দশ বছর কণ্ঠশীলন থেকে বাইরে ছিলেন। কিন্তু এক সময় ওনার স্ত্রীর ভুল ভেঙ্গেছিল।

পুরুষদের প্রায় সবারই বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্যদের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ব থাকে। সেটাও বিয়ের আগে সঙ্গীনিকে স্পষ্ট করে নেয়া ভালো। মোদ্দা কথা, যার যেমন মানসিকতা, তার তেমন মানুষকেই জীবনসঙ্গী করা উচিত। প্রেমের মোহে পড়ে বাস্তবতা ভুলে গেলে সারাজীবন পস্তাতে হয়।

কেউ অর্থ-ক্যারিয়ার চাইলে সেই রকম জীবনসঙ্গী খোঁজা উচিত। কেউ ধার্মিক-পরহেজগার চাইলে তেমন কেউ। কেউ মঞ্চ নাটক করতে চাইলে, তাকেও সেইরকম উদারমনা-প্রগতিশীল কাউকে বেছে নিতে হবে। একজন নারী বা পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনের মিলটাই আসল। মানসিকতার মিলটাই মূল কথা। আর কিছু নয়! এটা আপেক্ষিক সত্য না। চিরন্তন সত্য।

৩ মার্চ শুক্রবার ২০১৭। নিউইয়র্ক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.