সন্তানের মায়ের পরিচয় কেন গ্রহণযোগ্য নয়?

মাহমুদা রিদিয়া রশ্মি:

“আফা, আমি ইট ভাঙার কাজ কইরতাম। ইট ভাঙার কাজ দেখাশোনা কইরত মাঝবয়সী একজন পুরুষ। সুযোগ পাইলে আমার সাথে কথা কইত। বাজার সদাই কিনে দিত। আমি নিতে চাইতাম না। আমার গা ঘেষার চেষ্টা করত। একদিন ভদ্রলোক কইল আমারে ভালবাসে। আমার সাথে সম্পর্ক করতে চায়। এতে আমার মা রাজি না। ভদ্রলোক কইল আমরা পালায়ে বিয়া করমু। আমি রাজি হই। আমরা দু’জন এক বাড়িতে যাই। বাড়িটিতে একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা থাকে। ভদ্রমহিলা আমাকে একটা রুমে বসাইয়া রাখে। রুমটিতে কোন মানুষ ছিল না। উনি আমারে কইল এটা কাজী অফিস। এইখানে আমাদের বিয়া হইবো। অনেকক্ষণ একা বইসা থাকার পর ভদ্রলোক কইল আমাদের নাকি বিয়া হইয়া গেছে। এখন থেইক্যা আমরা জামাই-বউ। আমরা একরুম ভাড়া নিয়া সংসার শুরু করি। আট মাস পর জানতে পারি আমার স্বামীর বউ-বাচ্চা আছে। আমার পেটে তিন মাসের সন্তান রাইখ্যা স্বামী প্রথম বউয়ের কাছে চইল্যা গেছে। স্বামীর সাথে কোন যোগাযোগ নাই। এখন আমার সন্তানের বয়স এক বছর। আমার সন্তানের জন্মনিবন্ধন করাতে চাই। জন্মনিবন্ধনে ওর বাবার নাম বসাতে চাই”।

মাহমুদা রিদিয়া রশ্মি

কথাগুলো বলছিলেন রাবেয়া নামে হালকা গড়নের একজন মেয়ে। বয়স আনুমানিক ১৫/১৬ বছর। বস্তিতে থাকে। মলিন চেহারার মেয়েটির চোখে অসহায়ত্ব দেখলাম।

ঘটনাটি শোনার পর জিজ্ঞেস করলাম, ওই লোকের নাম কী? উত্তরে যা জানালো তাতে আমার ভ্রু কুচকে চোখ উল্টে যাবার মত অবস্থা। স্বামীর নাম মুখে আনা নাকি নিষেধ। পাপ।

ভাবছিলাম বিষয়টি নিয়ে কিছু লিখবো। কিন্তু এতোটাই মর্মাহত ছিলাম এই ভেবে যে নারীরা আজও কতোটা সরল। স্বামীহীন রাবেয়া এতোটাই বোকা, বিয়ের প্রথায় যে “কবুল” শব্দটি উচ্চারণ করতে হয়, সেটা হয়তো বা তার জানা ছিল না। জনমানবহীন কক্ষে কিছুটা সময় বসে থাকা মানেই বিয়ে হওয়া, আর এটাকে বিশ্বাস করে একজন প্রতারক পুরুষের সাথে জীবনযাপন করার ফলাফল পিতৃপরিচয়হীন শিশু পেটে ধরা।

তাই সমাজে পিতৃপরিচয়ে শিশুটিকে বড় করার জন্যই জন্মনিবন্ধন নামক দলিলের প্রয়োজন রাবেয়ার। মা ও শিশুকে সমাজে টিকে থাকার একমাত্র রিকোয়ারমেন্ট হলো জন্মনিবন্ধন নামক দলিলে মোটা অক্ষরে একজন পুরুষের নাম স্পষ্ট থাকতে হবে যা মেয়েটির স্বামী ও শিশুটির পিতৃপরিচয় বহন করে।

একটা বিষয় আমার অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে- “সমাজে সন্তানদের মাতৃপরিচয় কেন গৌণ হবে”! সমাজ সৃষ্ট কুসংস্কার বা প্রথা থেকে নারীমুক্তি কবে আসবে? সন্তানের পরিচয় কেন শুধু পিতৃপ্রধান হবে? পিতৃতান্ত্রিক সমাজের জন্যই কি এমনটি হয়? মাতৃতান্ত্রিক সমাজ হলে কী সন্তানের মাতৃপরিচয় মুখ্য হতো? যদিও বা আধুনিক পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মাতৃপরিচয় একটু হলেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

মুসলিম বিবাহ মতে- রেজিস্ট্রেশন বা কাবিননামা ছাড়া রাবেয়ার দাম্পত্য সম্পর্ক অবৈধ। সন্তানের পিতৃপরিচয়  বানোয়াট হলেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, ১০ মাস ১০ দিন পাথর সম ওজন ও পাহাড় সম কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখিয়েছেন তিনি।

বাদ দিলাম বিবাহ আইন, বৈধ-অবৈধ বিষয়। সোজা কথায় আসি। নারী -পুরুষের সমান ইচ্ছা ও অনুভূতিতে পারস্পারিক সুখের মুহূর্তের উপহার হচ্ছে তাদের সন্তান। তাই যদি হয়, তবে সন্তানের পরিচয়ে কেনইবা বৈষম্য থাকবে। শুধু স্পার্ম ডোনেট করলেই কী একটি শিশুর অভিভাবক হওয়া যায়? আর মা? যিনি ভ্রুণ বহন থেকে শুরু করে একটি শিশুর পৃথিবীর আলোর মুখ দেখানো পর্যন্ত প্রতিনিয়ত নিজের সাথে এবং প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করছে, নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে তার সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছে কোনো প্রতিদানের আশায় অবশ্যই নয়। সন্তানের  ভালো থাকাটাই মায়েদের বড় পাওনা।

জানি পুরুষের বিরুদ্ধে কলম ধরলে, উচিত কথা বললে সমাজ কলম  যোদ্ধাদের নারীবাদী আখ্যা দেন। সেটা নেতিবাচক অর্থে বৈকি! আরে ভাই আমার কথা একটু শোনেন। আমি বলছি না যে পিতৃপরিচয় মুখ্য থাকবে না। অবশ্যই থাকবে। তবে পিতা- মাতা দুজনের পরিচয়ই থাকতে হবে, থাকা উচিত।

সন্তানের যে কোনো সিদ্ধান্তে দুজনের মতামত সমান গুরুত্ব পাবে। তবে একটা কথা থেকে যায়- স্পার্ম ডোনেট করা নিরুদ্দেশ পিতা যিনি কোনো যোগাযোগ রাখে নাই, অথচ সন্তানের বাসস্থান, খাদ্য, বস্ত্রের চাহিদা মেটাতে গিয়ে মাকেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে, সেই সন্তানের পরিচয়ে নিরুদ্দেশ পিতা মুখ্য হবে, নাকি মা?

প্রশ্নটি সমাজের কাছে। জাতির কাছে। জাতির উত্তর নিয়ে আমার দ্বিধা থাকলেও সমাজের উত্তর আমার স্পষ্ট।

পিতা সন্তানের ভরণপোষণ দিক বা না দিক, যোগাযোগ রাখুক বা না রাখুক, পিতৃতান্ত্রিক বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলেই পিতৃপরিচয় আজ প্রধান হয়। কারণ পিতা ভ্রুণের অংশীদার। তাহলে মা কী? আমার এমন উদ্ভট প্রশ্নে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ অবশ্যই চটবে এবং আমার মতো কলম যোদ্ধাকে হুমকি দিয়ে বলবে, যেন লাগামহীন কথা না বলি। কারণ সন্তান জন্ম দেয়া ও লালন পালন করা তো একজন নারীর প্রাকৃতিক দায়িত্ব। সুতরাং নারীদের তো কষ্ট করতেই হবে। আর সামাজিকভাবে সন্তানের পরিচয় বহন করবে পিতা।

অন্ধ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অনুভব করার মন নেই যা দিয়ে তারা পরিমাপ করবে সন্তান জন্ম দেয়ার মতো প্রাকৃতিক দায়িত্বটি একজন নারীর জন্য কতোটা চ্যালেঞ্জের, কতোটা ঝুঁকির। যদি থাকতো তবে অবশ্যই নারীরা যথোপযুক্ত মূল্যায়ন পেত।

শেয়ার করুন:
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.