নিকষ আঁধার পথে আলো হাতে এলো যাঁরা-৩

মলি জেনান:

নারী অধিকার, নারী মুক্তি ও নারী আন্দোলনের কথা এলেই সবার আগে যার নাম আসে তিনি হলেন জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন। আর পাঁচটা সাধারণ তারিখের মতো ক্যালেন্ডারের পাতায় ঝুলে থাকা ৮ মার্চ যার হাত ধরে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তিনিই ক্লারা জেটকিন।

১৮৫৭ সাল। কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা, মজুরি বৈষম্য এবং কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় দলে দলে নেমে এসেছিলো সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা। সরকার বাহিনীর দমন-পীড়ন এই আন্দোলনকে আরো উত্তাল করে তুলে।

নারী আন্দোলনের এই সালেরই ৫ জুলাই জার্মানির ওয়াইডোরায়ুর সাক্সোনি প্রদেশে ক্লারা জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশবে তার নাম ছিল ক্লারা আইজেনার। বাবার নাম ছিল গর্টফ্রেড আইজেনার আর মায়ের নাম জসপিন ভিটেইল। শিক্ষক হওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছিল ক্লারা জেটকিনের, ছোট থেকেই ঠিক সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সফল নেত্রী।

মা জসপিন ভিটেইলের হাত ধরেই ক্লারা জেটকিনের প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনার সূচনা হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই ক্লারা জেটকিন তার মায়ের সঙ্গে জার্মান মেয়েদের লীগ সভায় যাওয়া শুরু করেন। এখানেই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন প্যারি কমিউন নামক এক নতুন সমাজ ব্যবস্থার সাথে। যে সমাজ ব্যবস্থা ক্লারা জেটকিনকে সমাজ বির্বতনের এক নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে গড়ে উঠতে সহযোগিতা করেছিল।

তিনি ১৮৭৪ সালের দিকে জার্মানির নারী আন্দোলন ও শ্রম আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মাত্র একুশ বছর বয়সেই ১৮৭৮ সালে সভ্য হন ‘জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’র; এ সময়ই তার পরিচয় হয় রাশিয়ান বিপ্লবী ওসিপ জেটকিনের সঙ্গে। পরবর্তীতে এই দুইজন সমাজ বদলের একনিষ্ঠ কর্মী বিয়েও করেন এবং ক্লারা নিজের নামের শেষে জেটকিন উপাধি যোগ করেন। ওই বছরই সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। চরম দমন-পীড়নের মধ্যে ওসিপ জেটকিন গ্রেফতার হন আর ক্লারা প্যারিসে চলে যান।

এতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি পার্টির পত্রিকা প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে গভীর বিশ্লেষণী এবং প্রচণ্ড সাহসী ক্লারা একটি সমাজতান্ত্রিক সমতার সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন। শুধু স্বপ্ন দেখেই ক্ষান্ত হননি। সকল ভাবনাকে প্রতিনিয়ত কাজের মধ্য দিয়ে বিকশিত রুপান্তরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিষ্ঠার সাথে কর্মমগ্ন থাকেন। উপলব্ধি করেন নারী মুক্তির কথা না ভেবে সত্যিকার অর্থে সাম্যবাদের ভাবনা এগুবে না।

আর এ সময়ই তিনি ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন রোজা লুক্সেমবার্গ ও কার্ল মার্কসের মেয়ে লরা এবং তার সহযোদ্ধা জীবনসঙ্গী পল লাফাগ্রের সঙ্গে। এদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ক্লারাকে আরো উজ্জীবিত করেছিল। তিনি অনুধাবন করেন যে, নারীমুক্তি সাম্যবাদের পূর্বশর্ত।

ক্লারার ‘ইকুয়েলিটি’ চিন্তা শুধুমাত্র নারীর সমসাময়িক কিছু ন্যায্য অধিকার বা সমবেতনের মাপকাঠিতেই অগ্রসর হয়নি। আরো গভীরতা দিয়ে তিনি নারীর মুক্তির কথা ভেবেছেন; শুধু শ্রেণি বৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, জেন্ডার সমতার ভিত্তিতে এবং তাদের সেই সংগ্রামে সচেতন করে গড়ে তোলার জন্য তিনি একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। এখানেই ক্লারা জেটকিন অনন্য হয়ে ওঠেন।

১৯০৭ সালে সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনের সাথেই নারী সমাজতন্ত্রীদের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৫টি দেশের ৫৯ জন নারী প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক নারী সংঘ গড়ে তোলেন। ক্লারা এই বিভাগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯১০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কর্মজীবী নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কোপেনহেগেন শহরে। এই সভায় ১৭টি দেশের শতাধিক নারী-প্রতিনিধি যোগদান করেন। এই সম্মেলনে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক দলের নারী-কার্যালয়ের (Women’s Office) নেত্রী হিসাবে তিনি যোগদান করেন ক্লারা এবং ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস করার প্রস্তাব পেশ করেন। কংগ্রেস ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। একই সাথে তিনি ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে নিজে পালন করেন।

সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ থেকে প্রতিবছর  ৮মার্চ এই দিবস পালিত হবে। পরবর্তিতে ১৯১৪ সালে বিশ্বের বেশকয়েকটি দেশে একযোগে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়।

১৯১৫ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারীদের নিয়ে যুদ্ধবিরোধী সম্মেলন করেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন-

‘নারীদের বাড়ির চার দেয়ালে আটকে রাখার অর্থ হলো তাদের জীবনকে নিছক সন্তান ধারণ ও ঘরের কাজের দাসত্বে বেঁধে রাখা।’তবে এ বক্তৃতায় তিনি আরও একটি কথা বলেছিলেন, যেহেতু ধনতন্ত্র নারী পুরুষকে সমানভাবে শোষণ করে চলেছে, তাই নারীর জন্য আলাদাভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা চাওয়া অপ্রয়োজনীয়’।

পরে তার সে ভাবনা বদলিয়ে বলেছিলেন-

‘শ্রমজীবী নারীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে দু’রকম শোষণ চলতে থাকে। ঘরের হাড়ভাঙা খাটুনি ও কারখানায় অক্লান্ত পরিশ্রম। আবার পুরুষের তুলনায় কম মজুরি গ্রহণ করা।’

অসম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধেও তিনি ভোটাধিকারকে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আজ সারা পৃথিবীজুড়ে যে নারী অধিকারের কথা, নারীর ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা এবং ইকুয়েল জেন্ডার থিংকিং এগিয়েছে, তার পেছনে  ক্লারা জেটকিনের একটি বিপ্লবী ভূমিকা রয়েছে। তিনি নারীমুক্তি ও সমাজতন্ত্রকে একত্রিত এক সংগ্রাম হিসেবে দেখেই সারাজীবন লড়াই করে গেছেন।

১৯১৭ সালে জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল বা SPD ভেঙে Independent Social Democratic Party of Germany বা সংক্ষেপে USPD গঠিত হলে এটিরও তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি বা Communist Party of Germany বা সংক্ষেপে KPD প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত রাইখস্ট্যগে ( Reichstag) এই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯২০ সালে তিনি লেনিনের একটি সাক্ষাৎকার নেন। এই সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ছিলো – The Women’s Question.[ ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসের সদস্য ছিলেন।

১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯২১ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিন্টার্নের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য পদে ছিলেন।

১৯৩৩ সালের ২০ জুন ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই মহান নারীবাদী বিপ্লবী। 

আমাদের দেশে ১৯৭১ সাল থেকে পালিত হচ্ছে। তবে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে এটা পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

তথ্যসূত্র:

১. ইস্টিশন, জন কার্টারের ব্লগ।

২. যায়যায়দিন।

৩. উইকিপিডিয়া।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.